
সংসদ প্রতিবেদক
সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের এখতিয়ার সাংবিধানিকভাবে নির্ধারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের প্রক্রিয়া স্পষ্ট করা এবং সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয় মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতিতে নমনীয়তা ও স্থিতিশীলতার ভারসাম্য রক্ষা এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা আরো স্পষ্ট করার বিষয়েও তারা মত দিয়েছেন। তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়নি।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সপ্তম বৈঠকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞরা এসব মতামত তুলে ধরেন। বৈঠক শেষে সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের আলোচনার বিষয়বস্তু জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, সংবিধানের বিভিন্ন অংশে কী কী বিষয় প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন, তা নিয়ে বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, অথচ জাতির দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন- এমন বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
সংশোধন পদ্ধতি ও মৌলিক কাঠামো নিয়ে মত
সংবিধান সংশোধনের বর্তমান বিধান, ভবিষ্যতে সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নমনীয়তা এবং সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন শিক্ষাবিদরা। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাইরে বিকল্প কোনো পদ্ধতি রাখা সম্ভব কি না, সে প্রশ্নও ওঠে।
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিলুপ্ত মৌলিক কাঠামোসংক্রান্ত বিধান নিয়েও মতামত দেন আলোচকরা। সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোন ধরনের সাংবিধানিক সীমা থাকা প্রয়োজন, সে বিষয়টি তাদের আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
বিচার বিভাগের এখতিয়ার স্পষ্ট করার প্রস্তাব
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংবিধানের ব্যাখ্যা ও মৌলিক কাঠামো রক্ষার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের এখতিয়ার সাংবিধানিকভাবে নির্ধারণের ওপর জোর দিয়েছেন আলোচকরা।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ যাতে অন্য অঙ্গের ওপর অযাচিত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রেখে তার এখতিয়ার স্পষ্ট করতে হবে, যাতে সংবিধানের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে জনআকাক্সক্ষা উপেক্ষিত না হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে একাধিক আলোচক লিখিত মতামত দেবেন বলে জানিয়েছেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়নি।
কমিটির সভাপতি জানান, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বাদ দেয়ার বিষয়ে তখন ঐকমত্য হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। আগের বিকল্পগুলোতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হলে শেষ বিকল্প হিসেবে বিচার বিভাগের ভূমিকা রাখার বিষয়েও আলোচকদের মতামত পাওয়া গেছে।
উচ্চকক্ষে কারা প্রতিনিধিত্ব করবেন
সংসদের উচ্চকক্ষের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়েও বিভিন্ন মতামত এসেছে। সেখানে কোন কোন শ্রেণী ও পেশার প্রতিনিধিত্ব থাকবে, প্রতিনিধিরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন, জেলাভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা থাকবে কি না এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতি অনুসরণ করা যায় কি না- এসব প্রশ্ন আলোচনায় উঠে আসে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দেশ। এ কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে আলোচকরা বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন। লিখিত মতামত পাওয়ার পর সেগুলো পর্যালোচনা করে কমিটিতে আলোচনা করা হবে।
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয় রাষ্ট্রের সামর্থ্য অনুযায়ী মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, সে বিষয়েও মতামত দেন শিক্ষাবিদরা। এ ছাড়া সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি আরো সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রস্তাব এসেছে।
বিরোধী দলকে অংশ নেয়ার আহ্বান
সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকা নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার মধ্য দিয়েই জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়েছে। সরকার ওই সনদ বাস্তবায়নের জন্যই কাজ করছে।
তিনি বলেন, বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধিদের নাম দেয়ার জন্য বিরোধী দলের নেতাদের আহ্বান জানানো হয়েছে। এখনো তারা নাম দেননি। নাম দেয়া হলে তাদের স্বাগত জানানো হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কমিটির প্রতিটি বৈঠক এবং জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিরোধী দলকে অংশ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকার চায়, সরকারি ও বিরোধী দলের সমঝোতার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধন হোক। তবে বিরোধী দল অংশ না নিলেও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে হবে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সরকারের অঙ্গীকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিরোধী দল চাইলে লিখিত মতামত দিতে পারে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, কমিটির প্রতিবেদন তৈরির পর সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপিত হলে বিরোধী দল তাতে অংশ নেবে। তার মতে, জুলাই জাতীয় সনদে সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তাই নির্বাচনি ইশতেহার ও জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয়ও সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা দরকার।
বিরোধী দল কমিটিতে অংশ না নিলে সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিতর্কের সুযোগ থাকবে। তবে বিরোধী দলকে আলোচনায় যুক্ত হওয়ার আহ্বান অব্যাহত থাকবে। তারা দায়িত্ব পালন না করলে জনগণ তা দেখবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
লিখিত প্রস্তাব জমার সময় দুই সপ্তাহ
বৈঠকে অংশ নেয়া আলোচকদের অনেকে ইতোমধ্যে লিখিত মতামত জমা দিয়েছেন। অন্যদের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রস্তাব জমা দিতে অনুরোধ জানিয়েছে কমিটি। এসব মতামত পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে সংশোধনসংক্রান্ত সুপারিশ প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নেয়া হবে।
আগামী ২৪ অক্টোবর শনিবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সাথে দিনব্যাপী আলোচনার প্রাথমিক পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি। তিনি বলেন, অল্প সময়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য বিস্তারিতভাবে শোনা ও রেকর্ড করা কঠিন। এ কারণে দিনব্যাপী আলোচনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বৈঠকে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুবুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন, অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কে এইচ লুৎফুল এলাহী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক একরামুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম ও অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মো: মাহবুবুর রহমান ও অধ্যাপক মোহাম্মদ একরামুল হক এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক নেসার ইউ আহমেদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো: জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো: নূরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন ও মো: মাহমুদুল হক রুবেল অংশ নেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








