
- শিক্ষকতায় অতিরিক্ত চাপ ও পর্যাপ্ত বাজেটের সঙ্কট
- দুর্বল গবেষণা-পরিবেশ ও নীতিগত সীমাবদ্ধতায় পিছিয়ে দেশের উচ্চশিক্ষা
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। এটি নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কেন্দ্র। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আন্তর্জাতিক র্যাংকিং অনুযায়ী গবেষণাপত্র প্রকাশ, গবেষণায় অর্থায়ন এবং উদ্ভাবনের জন্য পর্যাপ্ত লজিস্টিকসের ক্ষেত্রে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নানাবিধ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যার ফলে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশের পিছিয়ে আছে। গবেষণায় কম বিনিয়োগ, শিক্ষকদের অতিরিক্ত পাঠদান, প্রয়োজনীয় গবেষণাগারের অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং গবেষণার ফল কাজে লাগানোর দুর্বল ব্যবস্থা এর কারণ। এসব সীমাবদ্ধতা কাটাতে হলে গবেষণাকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখতে হবে বলছেন খাত সংশ্লিষ্টরা ।
গবেষণায় পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ অর্থের সঙ্কট। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ৮০২ কোটি ২১ লাখ টাকা। তার মধ্যে গবেষণায় বরাদ্দ ছিল ১৯০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা (যা মোট বাজেটের ১.৪৪ শতাংশ)। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় ২২৬ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানিয়েছে ইউজিসি। আগের অর্থবছরগুলোর তুলনায় এ বরাদ্দ প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। তবে অর্থ বরাদ্দ বাড়লেও গবেষণার প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্ন এখনো বিদ্যমান।
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটেও গবেষণার অর্থসঙ্কটের চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণার জন্য ২১ কোটি তিন লাখ টাকা চেয়েছিল। কিন্তু অনুমোদিত বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য সরাসরি গবেষণা বরাদ্দ রাখা হয়নি। পরে ইউজিসি জানায়, গবেষণার অর্থ বন্ধ হয়নি; বরাদ্দ দেয়ার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। গবেষণার অর্থ ইউজিসির মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষকদের আশঙ্কা, এতে অর্থ ছাড়ে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়তে পারে। ইউজিসি বলছে, নতুন পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং একই ধরনের গবেষণায় বারবার অর্থ দেয়া ঠেকানো যাবে। তবে অর্থ দ্রুত ছাড় এবং গবেষণার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষকদের গবেষণা করার সময় কম
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাজ শুধু গবেষণাপত্র লেখা নয়। তাদের নিয়মিত ক্লাস নিতে হয়। পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি, খাতা মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধান এবং প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হয়। ফলে অনেক শিক্ষক গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময় পান না। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গবেষণার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং ফলাফল যাচাই করতে হয়। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় প্রয়োজন হয় পরীক্ষাগার ও বিশেষ যন্ত্রপাতি। সামাজিক বিজ্ঞানের গবেষণায় প্রয়োজন হয় মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের অর্থ। পর্যাপ্ত সময় ও সহায়তা না থাকলে এসব কাজ বাধাগ্রস্ত হয়।
গবেষকরা জানান, গবেষণায় অর্থের অভাব, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ গবেষণার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে গবেষণার মানকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। শুধু পদোন্নতির জন্য প্রকাশনা বাড়ানোর প্রবণতা ঠেকাতে হবে। গবেষণার মৌলিকত্ব, পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে হবে। তাহলে গবেষণার প্রতি শিক্ষকদের আগ্রহ তৈরি হবে।
গবেষণার পরিবেশ ও উপকরণের ঘাটতি
মানসম্মত গবেষণার জন্য আধুনিক পরীক্ষাগার, বই, আন্তর্জাতিক সাময়িকী, তথ্যভাণ্ডার এবং দক্ষ গবেষণা সহকারী প্রয়োজন। অনেক প্রতিষ্ঠানে এসব সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। ফলে গবেষকেরা প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে বাধার মুখে পড়েন। বাংলাদেশের গবেষকেরা ২০২৫ সালে স্কোপাস-সূচিভুক্ত প্রকাশনা বাড়ালেও আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে প্রবেশাধিকার এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশের সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক গবেষকদের এসব সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, আরেকটি হলো গবেষণার অর্থ ব্যবহারের হিসাব ও ফলাফল মূল্যায়নের দুর্বলতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন গবেষক নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, গত ১৬ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার অর্থ কিভাবে ব্যয় করেছে এবং সেসব অর্থে কী ফল পাওয়া গেছে, তা অনুসরণের জন্য ইউজিসি একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। অবশ্য ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ জানিয়েছেন, আগের বরাদ্দ ও গবেষণার ফলাফলের সমন্বিত তথ্য সংস্থাটির কাছে ছিল না। এতে বোঝা যায়, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং তা থেকে কী ফল পাওয়া যাচ্ছে- সেটিও নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।
গবেষণাপত্র বাড়লেও ভারত-পাকিস্তানের তুলনায় পিছিয়ে
বাংলাদেশে গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যা বাড়ছে। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তুলনা করলে ব্যবধান স্পষ্ট হয়। স্কোপাসের তথ্যভিত্তিক সায়েন্টিফিক বাংলাদেশ-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গবেষণাপত্র ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ৬১৩। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৪১৩। অর্থাৎ, এক বছরে প্রকাশনা বেড়েছে প্রায় ২০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। একই সময়ে ভারতে প্রকাশনা বেড়ে তিন লাখ ৬৪ হাজার ৭৮২ এবং পাকিস্তানে ৪৫ হাজার ২৬০টিতে পৌঁছায়। ভারতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ০১ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বেশি হলেও মোট প্রকাশনার সংখ্যায় দেশটি দুই প্রতিবেশীর পেছনে রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধক্ষ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, গবেষণার মানের একমাত্র মাপকাঠি নয়। গবেষণার প্রভাব, উদ্ধৃতি, মৌলিকত্ব ও বাস্তব প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যবধানের পেছনে অর্থনীতি ও গবেষণা অবকাঠামোর পার্থক্যও রয়েছে। ভারতের বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার বিস্তৃত পরিসর রয়েছে। পাকিস্তানেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবস্থান তৈরি করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে তুলনা
কিউএসের ২০২৬ সালের দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক র্যাংকিংয়ে ভারতের আইআইটি দিল্লি প্রথম এবং পাকিস্তানের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের সাতটিই ভারতের। এ চিত্র দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শক্ত অবস্থান তুলে ধরে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গবেষণায় অবদান রাখছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ বাড়ছে। তবে সামগ্রিক গবেষণা উৎপাদন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
ইউনেসকোর সায়েন্স রিপোর্ট বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গবেষণা ও উন্নয়নে দীর্ঘ দিনের কম বিনিয়োগ একটি বড় সমস্যা। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও অর্থের ঘাটতি রয়েছে। বিশ্লেষকদের মন্তব্য, বাংলাদেশের সমস্যা এককভাবে বিচ্ছিন্ন নয়। তবে গবেষণার অর্থের কার্যকর ব্যবহার, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় দেশভেদে পার্থক্য রয়েছে।
করণীয় কী
অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বাড়াতে প্রথমেই নিয়মিত ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণার জন্য অর্থায়নকে স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। শিক্ষকদের গবেষণার জন্য নির্দিষ্ট সময় দিতে হবে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার, আন্তর্জাতিক সাময়িকীর সাবস্ক্রিপশন এবং গবেষণা সহকারীর সুযোগ বাড়াতে হবে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের গবেষণায় যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, একই সাথে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে গবেষণার মানকে গুরুত্ব দিতে হবে। গবেষণার অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি গবেষণা সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। কৃষি, স্বাস্থ্য, জলবায়ু, জ্বালানি ও প্রযুক্তির মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন।
গবেষণা সঙ্কট নিরসনের উপায় নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার জানান, আমাদের প্রবাসী ও আন্তর্জাতিকভাবে কর্মরত বাংলাদেশী গবেষকদের সাথে সংযোগ স্থাপন, জ্ঞানবিনিময় এবং দেশে ফিরে বা দূরবর্তীভাবে গবেষণায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরির ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, আমাদের একটি শক্তিশালী রিসার্চ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে- যেখানে বেসিক ও অ্যাপ্লাইড সাইন্সের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকবে। এর জন্য সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রাইভেট সেক্টরের মধ্যে সমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ জরুরি। গবেষণার ফলাফল শুধু প্রকাশনায় সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, সেগুলো বাস্তবসম্মত সমাধানে রূপ দিতে হবে। নলেজ-বেইজড ইকোনমি গড়ে তোলার এখনই সময়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








