ইয়েমেনের রাজধানীতে ব্যাপক হামলার প্রস্তুতি সৌদি জোটের

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

ইয়েমেনের রাজধানী সানায় ব্যাপক বিমান হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। হাউছিবিদ্রোহীদের দখলে থাকা এই শহর থেকে সাধারণ মানুষকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে জোট। গতকাল মঙ্গলবার জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, সানায় ‘বিশেষ অভিযান’ চালানো হবে। সে কারণেই বেসামরিকদের আগেভাগে সরে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি এক্স-এ একটি ম্যাপ প্রকাশ করে সরে যাওয়ার নির্দেশনা জারি করেন। ম্যাপে দেখানো হয়েছে সানার ইয়েমেনি তেল কোম্পানি বা আল-সাবাহ কেন্দ্রীয় স্টেশন। মুখপাত্র বলেন, নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে সাধারণ মানুষ যেন দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যান। খবর আলজাজিরার। 
এই ঘোষণার পরপরই পাল্টা হুমকি দিয়েছে হাউছিরা। তাদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে বলেন, সানায় কোনো হামলা হলে সৌদি রাজধানী রিয়াদে কঠোর ও বেদনাদায়ক জবাব দেয়া হবে। এরপরই সৌদি আরবের তিন স্থাপনা থেকে সবাইকে তাৎক্ষণিকভাবে সরে যাওয়ার পাল্টা নির্দেশনা দিয়েছে হাউছিবিদ্রোহীরা। 
দুই পক্ষের মধ্যে গত কয়েকদিন ধরেই উত্তেজনা চরমে। গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে হাউছিদের মিসাইল হামলায় ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। এরপর থেকেই সৌদি পক্ষ হাউছিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনের রাজধানী সানার একটি তেল স্থাপনাতে বিমান হামলা চালাতে যাচ্ছে। এরইমধ্যে সেখানকার মানুষকে সরে যেতে বলেছেন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল মালিকি।
মঙ্গলবার হাউছিরা বলেছে, যদি সৌদি আরব পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সানায় বিমান হামলা চালায় তাহলে সৌদির দাম্মামের আরামকোর সদর দফতর, রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দর এবং রিয়াদের আরামকোর তেল পরিশোধনাগারে হামলা চালানো হবে। ফলে এ মুহূর্তে সাধারণ মানুষকে এসব স্থাপনা থেকে সরে যাওয়া এবং দূরে থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
গত কয়েকদিন ধরেই হাউছি ও সৌদির মধ্যে সরাসরি সংঘাত চলছে। এর মধ্যে গত শনিবার রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরে ভয়াবহ মিসাইল হামলায় ১২ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। এরপর থেকেই সৌদি হাউছিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। এর মধ্যে তারা সানায় ঘোষণা দিয়ে বিমান হামলা চালাতে যাচ্ছে। তবে হাউছিরাও পাল্টা ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে গতকালও রিয়াদে ড্রোন ছুড়েছে হাউছিরা। যেগুলো ভূপাতিত করার দাবি করেছে সৌদি জোট। তবে এগুলো কোন স্থাপনাকে টার্গেট করার জন্য ছোড়া হয়েছে বা কোথা থেকে ছোড়া হয়েছে সেটি স্পষ্ট করেননি সৌদি জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল মালিকি।
এদিকে ইয়েমেনের হাউছিবাহিনীর অব্যাহত হামলার পর সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আগামী ১৭ শনিবার অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছে, যার ফলে দেশটিজুড়ে শত শত ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেছে। সূত্র: এয়ার ডেটা নিউজ।
গতকাল মঙ্গলবার এয়ার ডেটা নিউজের এক খবরে জানা গেছে, বিমানবন্দরটিতে পরিদর্শন ও ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনার কাজ চলায় জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশন (জিসিএএ) সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিতের এই সময়সীমা বৃদ্ধি করেছে। তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের উপাত্ত অনুযায়ী, সোমবার সৌদি আরবের এক হাজার ৪৮টি নির্ধারিত ফ্লাইটের মধ্যে ৪৮৬টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে, যা তাদের দৈনিক সূচির প্রায় ৪৬ শতাংশ। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রিয়াদ বিমানবন্দরে রোববারের প্রায় সব ফ্লাইট এবং সোমবারের আনুমানিক ৭৮ শতাংশ সেবা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে বিমান সংস্থাগুলো। উদ্ভুত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিমান সংস্থাগুলো তাদের ফ্লাইট স্থগিতের মেয়াদ আরো বাড়িয়েছে। লুফথানসা গ্রুপ ১৬ অক্টোবর এবং এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত রিয়াদগামী পরিষেবা বন্ধ রেখেছে। 
এ ছাড়া ফিলিপাইন এয়ারলাইন্স ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত, ইন্ডিগো ও এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এবং ফ্লাইদুবাই ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদ ও দাম্মামে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা এয়ারলাইন্স আগামী ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত তাদের আটলান্টা-রিয়াদ পথ চালুর সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিয়েছে।
কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত ১০ অক্টোবরের হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হন এবং পরদিন টার্মিনাল ৪-এ অপর এক প্রক্ষেপকের আঘাতে এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত ও ১১ জন আহত হন। সৌদিয়ার একটি এয়ারবাস এ৩২০ বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে মারাত্মক সঙ্কট দেখা দেয়।
আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ব্রিটেনের পররাষ্ট্র দফতর (এফসিডিইউ) তাদের নাগরিকদের বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা জর্দান হয়ে সড়কপথে দেশ ত্যাগের পরামর্শ দিয়েছে। একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফএএ এবং ইউরোপের ইএএসএ বেসামরিক বিমান চলাচলে ঝুঁকির বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে নিষ্ক্রিয় ছিল সতর্কীকরণ ব্যবস্থা
রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার কয়েক দিন আগে থেকেই নাগরিকদের সম্ভাব্য হামলার আগাম সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা বন্ধ ছিল। গত এক সপ্তাহে রাজধানী রিয়াদে হওয়া চারটি হামলার আগে সাধারণ মানুষকে কেন কোনো আগাম সতর্কবার্তা দেয়া হয়নি, সে বিষয়ে সৌদি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। রয়টার্স লিখেছে, তারা এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করলেও দেশটির সিভিল ডিফেন্স বা সরকারি তথ্য দফতর কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে পশ্চিমা ও আরব কর্মকর্তাদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হাউছি বিদ্রোহীদের সাথে সংঘাতের মধ্যেও দেশে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে- বিশ্বের কাছে এমন ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছিল রিয়াদ। হামলার আগে একটি মিত্র পশ্চিমা দেশের কর্মকর্তারা সতর্কবার্তা বন্ধের কারণ জানতে চাইলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, এসব অ্যালার্ট জনজীবনে অতিরিক্ত ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিল এবং গভীর রাতে ফোনের সতর্কবার্তায় ঘুম ভেঙে যাওয়া নিয়ে অনেক নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। গত মে মাস থেকে জাতীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থা ‘সিভিল ডিফেন্স’-এর মাধ্যমে মোবাইল ফোনে আগাম সতর্কবার্তা পাঠানো শুরু হলেও ২৯ সেপ্টেম্বরের পর থেকে সামরিক হামলার বিষয়ে ব্যবস্থাটি পুরোপুরি নীরব ছিল। তবে এই সময়েও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও বৃষ্টির সতর্কতা নিয়মিত দিয়ে আসছিল সংস্থাটি। সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‌্যাটনি বলেন, হাউছি হামলার মুখে জনজীবনে আতঙ্ক বা বিঘœ না ঘটানোর যে চেষ্টা সৌদি আরব করেছিল, আগাম সতর্কতা বন্ধ রাখায় তা উল্টো ভয় ও অনিশ্চয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘ নীরবতার পর সোমবার রিয়াদ ও দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরগুলোর জন্য ফের সম্ভাব্য হামলার সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে দেশটির সিভিল ডিফেন্স। তবে বিমানবন্দর হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই বার্তা  ফের চালু করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।  
সৌদি আরবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠিয়েছে ব্রিটেন
ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের হামলা মোকাবেলায় সৌদি আরবে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী একটি সামরিক বিমান পাঠিয়েছে ব্রিটেন। সোমবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। শাফাক নিউজের খবর অনুযায়ী, পার্লামেন্টে বক্তব্য দেয়ার সময় বার্নহাম বলেন, সৌদি আরবে মোতায়েন করা ‘ভয়েজার’ নামের বিমানটি ইতঃমধ্যে ১৪টি সামরিক অভিযান সম্পন্ন করেছে। বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এ সহায়তা প্রয়োজন।
সঙ্কট মোকাবেলার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ
রিয়াদে এক জ্বালানি সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান আল সৌদ বলেন, গত এক সপ্তাহে বিমানবন্দরগুলোতে হামলার ঘটনা দেশটির সঙ্কট মোকাবেলার সক্ষমতার পরীক্ষা নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর ঘটনাগুলো গুরুতর। আমাদের প্রতিক্রিয়াও সমানভাবে গুরুতর হতে হবে।’ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন জ্বালানিমন্ত্রী। এ পরিকল্পনার লক্ষ্য দেশটির অর্থনীতিকে বহুমুখী করা এবং তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো। তার ভাষায়, ‘বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রকে হাউছিদের হুঁশিয়ারি
হাউছিদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। হাউছিদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কী করবে- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘হাউছিরা খুব খারাপ আচরণ করছে। এটা মোটেও ভালো নয়।’ অন্য দিকে, ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করলে পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হাউছিদের রাজনৈতিক শাখার সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি। বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে অংশ নেয়, তাহলে আমরা পাল্টা জবাব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করব না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও এ অঞ্চলে দেশটির সব স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত ও যন্ত্রণাদায়ক আঘাত হানা হবে।’ সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে কর্মরত ব্যক্তিদেরও সতর্ক করেছেন আল-বুখাইতি। তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এসব স্থাপনা থেকে দূরে থাকতে সতর্ক করছি। কারণ, এগুলো এখন বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।’