
ক্রীড়া প্রতিবেদক
আবুধাবি টেস্টের শেষ ওভার। আফগানিস্তানকে হারাতে হলে আরো দুই উইকেট প্রয়োজন বাংলাদেশের। উইকেটের চারপাশে সাতজনকে নিয়ে ক্লোজ ফিল্ডিং সাজালেন স্পিনার তাইজুল ইসলাম। কিন্তু আফগান ব্যাটারদের দৃঢ়তায় হতাশ হতে হলো এই বাঁহাতি লিগ স্পিনারকে। সেই হতাশায় পুড়তে হয়েছে গোটা বাংলাদেশকে। আর তাতেই দুই দলের টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবার ম্যাচ শেষ হলো অমীমাংসিতভাবে। এই ড্র’তে আফগানদের আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, জয়ের চেয়ে বেশি কিছু পেয়েছে তারা। অন্যদিকে জয়ের খুব কাছে গিয়েও রহমত শাহদের হারাতে না পেরে হতাশায় পুড়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ। ক্যাচ মিস, রান আউটের সুযোগ হাত ছাড়া এবং উইকেট নেয়ার মতো বিধ্বংসী বোলিংয়ের অভাবেই ম্যাচটি জিততে পারেনি শান্ত বাহিনী।
বাংলাদেশের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে দুর্দান্ত ব্যাটিং করল আফগানিস্তান। সাথে যোগ হলো পঞ্চম দিনের টাইগারদের হতাশাজনক ফিল্ডিং। সেই খেসারত দিয়ে জয়ের খুব কাছে গিয়েও টেস্ট ড্র করেছে টাইগাররা। বাংলাদেশের ছুঁড়ে দেয়া ৪৭৯ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে প্রতিরোধ গড়ে তোলে আফগানিস্তান। শেষ দিনে সেদিকউল্লাহ আতালের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে ম্যাচের উত্তেজনা বাড়লেও জয় নিশ্চিত করতে পারেনি বাংলাদেশ। তাতে পঞ্চম দিন শেষে আট উইকেট হারিয়ে ৩৪৬ রান করে রহমত শাহর দল।
আবুধাবির শেখ জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাঁচ দিনের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে তানজিদ হাসান তামিম ও শাদমান ইসলাম ভালো সূচনা এনে দিয়েছিল বাংলাদেশকে। তানজিদ ৮৩ এবং শাদমান ৬৭ রান করেন। লিটন দাসের ৫৩ রানের ইনিংসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শেষ দিকে নাঈম হাসানের অপরাজিত ৩৫ রানের সুবাদে প্রথম ইনিংসে ৩৪৬ রান সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ।
জবাবে প্রথম ইনিংসে আফগানিস্তানের ব্যাটিংয়ে প্রতিরোধ গড়েন অধিনায়কত্বের দায়িত্বে থাকা রহমত শাহ। তিনি অপরাজিত ১০৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলে দলের স্কোরকে এগিয়ে নেন। তবে বাংলাদেশের পেসার হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে হ্যাটট্রিকসহ পাঁচ উইকেট এবং এবাদত হোসেনের চার উইকেটের সুবাদে বেশিদূর এগুতে পারেনি আফগানরা। প্রথম ইনিংস তাদের থামতে হয়েছিল ২৪০ রানে। এতে ১০৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড পায় বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় ইনিংসে বড় ব্যবধানে এগিয়ে থেকে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতে লিড সামনে এগিয়ে নেয়ার পথে নেতৃত্ব দেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও অভিজ্ঞ ব্যাটার মুশফিকুর রহীম। শান্তর ৮২ এবং মুশফিকের ৮১ রানের ইনিংস দলকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়। এরপর ম্যাচের চিত্র আরো বদলে দেয় লিটন দাসের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি। ১১৭ বলে ১০২ রান করেন এই উইকেটরক্ষক ব্যাটার। তার ইনিংসে ছিল ১৪টি চার। অন্য প্রান্তে ৫২ রানে অপরাজিত ছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। সপ্তম উইকেটে লিটন ও মিরাজের ১৪৯ রানের জুটি বাংলাদেশের বড় সংগ্রহ গড়ার পথ তৈরি করে। সাত উইকেটে ৩৭২ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। দুই ইনিংস মিলে ৪৭৮ রানের লিড পাওয়ায় আফগানিস্তানের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪৭৯ রান।
চতুর্থ ইনিংসে বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই চাপে পড়ে আফগানিস্তান। বল হাতে নিয়মিত উইকেট তুলে নিয়ে টাইগারদের জয়ের আশা জাগান পেসার এবাদত হোসেন ও হাসান মাহমুদ। চতুর্থ দিন শেষে আফগানিস্তানের সংগ্রহ ছিল তিন উইকেটে ১৩২ রান। শেষ দিনে জয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল সাত উইকেট। তবে পঞ্চম দিনে সেদিকউল্লাহ আতাল ও সতীর্থরা ব্যাট হাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। আতাল নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে আফগানিস্তানের আশা বাঁচিয়ে রাখেন। ৩৩২ বল মোকাবেলায় ৯টি চার ও তিনটি ছক্কার সাহায্যে ১১১ রান করেন তিনি। তার ধৈর্যশীল ব্যাটিং বাংলাদেশের বোলারদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় রাখে।
শেষ দিন তৃতীয় সেশনে আতালকে ফেরান তাইজুল। এতে আবার জয়ের সম্ভাবনা জাগে বাংলাদেশের। তবে শেষ দিকে ব্যাট হাতে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন ইয়ামিন আহমদজাই ও কায়েস আহমেদ। ব্যক্তিগত ১৯ রানে মিরাজের বলে মুমিনুলের তালুবন্দী হয়ে আহমদজাই ফিরলেও বাংলাদেশের জয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান কায়েস। ৪৯ রানে অপরাজিত থাকেন এই ব্যাটার। শেষের দিকে ব্যাটারদের এই প্রতিরোধ প্রতিরোধ এবং সময়ের সীমাবদ্ধতায় শেষ পর্যন্ত অমীমাংসিতভাবেই শেষ হয় একমাত্র টেস্ট।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে চট্টগ্রামে টেস্ট ইতিহাসে আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলেছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে রশিদ খানের অসাধারণ বোলিংয়ে স্বাগতিকদের ২২৪ রানে হারিয়েছিল সফরকারীরা। দুই ইনিংসে ১১ উইকেট নেয়ার পাশাপাশি ব্যাট হাতেও অবদান রেখেছিলেন রশিদ। এরপর ২০২৩ সালে মিরপুরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৫৪৬ রানের বিশাল জয় পায় বাংলাদেশ। সেটি ছিল দুই দলের মধ্যকার দ্বিতীয় টেস্ট। ওই ম্যাচে নিজেদের ব্যাটিং ও বোলিং শক্তির প্রমাণ দিয়েছিল টাইগাররা। আর সবশেষ গতকাল আবুধাবি টেস্ট ড্র। ফলে তিন ম্যাচের মুখোমুখি টেস্ট ইতিহাসে দুই দলের জয়সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকল।
সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস : ৩৪৬ ও দ্বিতীয় ইনিংস ৩৭২/৭ ডিক্লেয়ার।
আফগানিস্তান প্রথম ইনিংস : ২৪০ ও দ্বিতীয় ইনিংস : ৩৪৬/৮। (আগের দিনের ১৩২/৩) (আতাল ১১১, শাহিদি ৩৬, আলিখিল ৩৩, ইসমত আলম ৪, ইয়ামিন ১৯, কায়েস আহমেদ ৪৯*, জিয়া-উর-রহমান ০*; এবাদত ৩/৫০, মিরাজ ৩/৭৩, তাইজুল ১/১১২, হাসান মাহমুদ ১/৬৬।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ : লিটন দাস।
ফলাফল : একমাত্র টেস্ট ড্র।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








