পদ্মা গিলে খাচ্ছে বছরে ২ হাজার বিঘা জমি
পদ্মা গিলে খাচ্ছে বছরে ২ হাজার বিঘা জমি।

আ ফ ম নুরুল কাদের, কুষ্টিয়া
একসময় যে জমিতে সবুজ পানপাতায় ভরে থাকত বরজ, সেই জমি এখন পদ্মার পেটে। কারো কয়েক বিঘা আবাদি জমি, আবার কারো সাজানো পানের বরজ- সবই কেড়ে নিয়েছে সর্বনাশা নদী। নিঃস্ব হয়ে কেউ দিন কাটাচ্ছেন চরম অনিশ্চয়তায়, আবার কেউবা জীবিকার তাগিদে ছেড়ে যাচ্ছেন বাপ-দাদার ভিটেমাটি। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে এভাবেই সর্বস্ব হারাচ্ছেন শত শত কৃষক। গত দুই মাসেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে প্রায় ৫০০ বিঘা ফসলি জমি। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলমান এই ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এলাকার পানচাষিরা। এর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘কুচিয়ামোড়া পানবাজার’।
স্থানীয় কৃষকদের দেয়া তথ্যানুযায়ী, গত এক বছরে ভেড়ামারা উপজেলার বাহাদুরপুর ও জুনিয়াদহ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দুই হাজার বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব জমির অধিকাংশেই হতো পানের আবাদ। আবাদি জমির পাশাপাশি পানের বরজ হারিয়ে এখন দিশেহারা কয়েক শ’ কৃষক পরিবার।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বাহাদুরপুর ইউনিয়নের মাধবপুর, লিসেনদিয়া, রায়টা ও আরকান্দি এলাকায় পদ্মার তীব্র ভাঙন চলছে। নদীর পানি কমার পর ভাঙনের তীব্রতা আরো বেড়েছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, বারবার আবেদন ও তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও ভাঙন ঠেকাতে পাউবো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। কুচিয়ামোড়ার বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন প্রায় ৯ থেকে ১০ বিঘা জমি নদীতে বিলীন হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। বারবার আকুতি জানিয়েও মেলেনি প্রতিকার। উপজেলা প্রশাসন সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত ৩২০ জন পানচাষির একটি তালিকা তৈরি করেছে। গত এক বছরে কেবল এই চাষিরাই হারিয়েছেন প্রায় ৩০ হাজার পিলি পানবরজ। এত বড় ক্ষতির কাক্সিক্ষত ক্ষতিপূরণ পাওয়া সহজ নয় বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা।
রায়টা এলাকার পানচাষি নাসিম হোসেন বলেন, কয়েক দিন আগেই আমার চার বিঘা জমি ও ২২০ পিলি পানবরজ পদ্মায় তলিয়ে গেছে। সর্বস্ব হারিয়ে এখন অসহায়ভাবে দিন কাটছে। এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে ছোট ভাই কাজের খোঁজে বিদেশে চলে গেছে। মাধবপুর এলাকার আরেক পানচাষি আব্দুল জলিল বলেন, পদ্মার পাড়ে আমাদের সাত বিঘা জমি ছিল। ভাঙতে ভাঙতে এখন মাত্র চার কাঠা অবশিষ্ট আছে।
এই পানের আবাদকে কেন্দ্র করেই ভেড়ামারায় গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী কুচিয়ামোড়া পানবাজার। এই বাজারের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে হাজারো কৃষক ও ব্যবসায়ীর জীবিকা। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাহমুদা সুলতানা জানান, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত দুই ইউনিয়নের ৩২০ জন কৃষকের তালিকা তৈরি করে জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তাদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আসফাউদ্দৌলা বলেন, এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার জুড়েই ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে তিন কিলোমিটার অংশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সাময়িক জরুরি ব্যবস্থা নিয়ে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোখা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে স্থায়ী প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে টেকসই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভেড়ামারা ইউএনও মো: আমিরুল আরাফাত বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে ভুক্তভোগীদের তালিকা করা হয়েছে। নদীভাঙন রোধে দ্রুত কাজ করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে তাগাদা দেয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

Advertisement