
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের জবাবকে ‘অপর্যাপ্ত’ বলেছে ইরান। দেশটি জানিয়েছে, তারা এখন আর ওয়াশিংটনকে উত্তর দেয়ার প্রক্রিয়ায় নেই। আগে যেসব বিষয় অস্পষ্ট রয়েছে, সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রকেই পরিষ্কার করতে হবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দেশটির নিরাপত্তা প্রধান মোহসেন রেজায়ির এ বক্তব্য প্রকাশ করেছে। তিনি দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে ইরান প্রস্তাবটি দিয়েছিল। এতে বলা হয়, নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়া সম্ভব। একই সময়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচলও ফিরিয়ে আনা যাবে। পরে কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওই প্রস্তাবের জবাব দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
রেজায়ি বলেন, ‘আমরা আমেরিকানদের সাতটি শর্ত দিয়েছি। স্পষ্ট করে জানিয়েছি, এসব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য হরমুজ প্রণালী খোলা হবে না। কোনো আলোচনাও হবে না।’ মার্কিন জবাবের বিষয়ে তিনি আরো বলেন, তারা আমাদের কিছু শর্ত মেনে নিয়েছে। তবে অন্য কিছু বিষয় এখনো অস্পষ্ট। তেহরানের কাছে অস্পষ্ট থাকা বিষয়গুলো ওয়াশিংটনকে ব্যাখ্যা করতে হবে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউজের সাথে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এর আগে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তেহরান জানিয়েছিল, উপসাগরীয় অঞ্চলে ভেঙে পড়া যুদ্ধবিরতি পুনরুজ্জীবিত করার সর্বশেষ প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের জবাব পেয়েছে তারা। এর কয়েক দিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। সঙ্ঘাতের অবসান ও হরমুজ প্রণালী খুলতে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে সহায়তা করছে কাতারসহ অন্য মধ্যস্থতাকারীরা। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের আগে বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হতো হরমুজ প্রণালী দিয়ে।
ইরানের সাত দফা প্রস্তাবে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড়ের দাবি রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মতবিরোধের প্রধান বিষয় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা। ওয়াশিংটন শুরুতেই এ বিষয়ে আলোচনা চায়, আর তেহরান প্রথমে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও আবার চালুর বিষয়টি সমাধানের দাবি জানাচ্ছে।
হরমুজে তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন
অনুমোদিত পথ এড়িয়ে চলার সময় সামুদ্রিক মাইনে ধাক্কা লেগে হরমুজ প্রণালীতে আরো একটি তেল ট্যাংকারে ভয়াবহ আগুন ধরে গেছে। গতকাল সোমবার তাসনিম নিউজের এক খবরে ইসলামী রেভল্যুশারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সামুদ্রিক শাখার বরাতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
আইআরজিসি নেভির জনসংযোগ অফিস জানিয়েছে, সাড়ে সাত লাখ ব্যারেল ক্রুড অয়েল বহনকারী একটি শাটল প্রকৃতির তেল ট্যাংকার রোববার বিকেলে সব সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে একটি অননুমোদিত পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। এ সময়ে জাহাজটি একটি সমুদ্র মাইনের সংস্পর্শে এলে বিস্ফোরণ ঘটে এবং ট্যাংকারটিতে মারাত্মক আগুন ধরে যায়। এর আগে শনিবার অন্য একটি বৃহৎ আকৃতির তেল ট্যাংকারও একই কায়দায় অননুমোদিত পথে প্রণালী পার হওয়ার সময় মাইনে ধাক্কা খেয়ে ভস্মীভূত হয়েছিল। সেই জাহাজটিও দুর্ঘটনার আগে তাদের নেভিগেশন ও পজিশনিং সিস্টেম বা অবস্থান শনাক্তকরণ যন্ত্র বন্ধ রেখেছিল এবং উপকূলের বাসিন্দারা তার বিশাল অগ্নিশিখা দেখতে পেয়েছিলেন।
আইআরজিসি নেভি নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা বিধিমালা অমান্য করে যেসব জলযান তাদের নেভিগেশন ও আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম বন্ধ রাখবে, সেগুলোকে শত্রুভাবাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হবে এবং কঠোরভাবে দমন করা হবে। প্রণালীর নিয়মকানুন না মানলে তেল ট্যাংকারগুলোকে এ ধরনের পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে বলে তারা হুঁশিয়ার করেছে। হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তাহীনতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে দায়ী করে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন- নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র জলপথ ও অঞ্চলকে অনিরাপদ করে তুলছে। তার দাবি, হরমুজে ইরানের পদক্ষেপ কোনো প্রভাব বিস্তারের কৌশল নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ ফল। এ ছাড়াও হরমুজ প্রণালীতে তেল পাচার কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান রেজাই। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভিকে তিনি বলেন, গত দুই-তিন মাসে পাচারকারী জাহাজগুলোতে প্রতি রাতে গড়ে পাঁচটি হামলা চালানো হয়েছে। তার দাবি, এসব কার্যক্রমের তদারকিতে রয়েছেন সেন্টকমের কমান্ডার এবং এতে আমিরাতের সামরিক সদস্যরা সহায়তা করছেন।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বাড়লেও সেগুলোকে নিরাপদে বের করে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে বহন করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি। তার ভাষ্য, জাহাজ চলাচল আগের তুলনায় বেড়েছে, কিন্তু এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল সম্পদ ব্যয় করতে হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট পারসি সতর্ক করে বলেন, চলাচল বৃদ্ধি মানেই সঙ্কটের অবসান নয়। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিকে যুদ্ধের স্থিতাবস্থা বা বিরতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি বড় ধরনের উত্তেজনার আগের সাময়িক শান্তিও হতে পারে।
মার্কিন ‘ডাটা সেন্টার ও এআই স্থাপনায়’ হামলার হুমকি
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আবারো যুদ্ধ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রযুক্তি অবকাঠামো, ডাটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) স্থাপনা ও যোগাযোগের তারে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে ইরান। দেশটির নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি সম্পদগুলো সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হতে পারে। খবর আলজাজিরার। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভিতে প্রকাশিত ৩০ মিনিটের এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনীতি, হরমুজ প্রণালী এবং নতুন করে সঙ্ঘাত শুরু হলে ইরানের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ও উঠে আসে।
মোহসেন রেজাই বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হরমুজ প্রণালীর আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল মূল্যের সম্পদ রয়েছে। এখন পর্যন্ত এসব স্থাপনাকে ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে যুদ্ধ শুরু হলে এসব অঞ্চলের অনেক যোগাযোগের তার, ডাটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্থাপনা এবং অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস করা হতে পারে। তিনি এসব প্রযুক্তি অবকাঠামোকে ওই অঞ্চলে মার্কিন অর্থনীতির ‘স্পন্দন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার দাবি, এসব সম্পদের মূল্য দুই লাখ কোটি ডলারেরও বেশি। ইরানের এই নিরাপত্তা কর্মকর্তা আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারো হামলা চালালে নতুন সামরিক সক্ষমতা ব্যবহারের জন্য তার দেশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। রেজাইয়ের ভাষ্য, সঙ্ঘাতের প্রথম সপ্তাহেই ইরান তাদের সব সামরিক সক্ষমতা প্রকাশ করেনি। শুরুতেই সব সক্ষমতা ব্যবহার করা হলে পরবর্তী সময়ে কাজে লাগানোর মতো পর্যাপ্ত সামর্থ্য অবশিষ্ট থাকত না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আবার সঙ্ঘাত শুরু হলে আরো বিস্তৃত ও ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করবে ইরান।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








