
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে দলটির নেতারা বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে। শনিবার দিল্লিতে বিক্ষোভ ঠেকাতে ব্যাপক পুলিশি অভিযান ও হাজার হাজার মানুষকে আটক করার ঘটনার পর রোববার নেতারা মুক্তি পেয়ে নতুন করে আন্দোলনের ঘোষণা দেন। রয়টার্স, এপি ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ।
সিজেপির সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা গতকাল রোববার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘লড়াই সবে শুরু হয়েছে। জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এই বিক্ষোভ থামবে না।’ দলের নেতা সৌরভ দাসও শুধু দিল্লিতে নয়, ভারতের বিভিন্ন শহরে আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা দেন। তাদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার এবং ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে।
তবে ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। তাদের বক্তব্য, তালিকা সংশোধনের সময় মৃত, স্থানান্তরিত কিংবা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না- এমন ভোটারদের নাম বাদ পড়তে পারে। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শুধু নাম বাদ দেয়ার সংখ্যা নয়, বরং সংশোধনের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও যাচাইযোগ্য ছিল, সেই প্রশ্নও।
দিল্লিতে নজিরবিহীন ধরপাকড়
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। কিন্তু সমাবেশে যোগ দিতে রাজধানীতে পৌঁছানোর আগেই বিভিন্ন স্থান থেকে আন্দোলনকারী, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষার্থী, আইনজীবী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত ব্যক্তিদের আটক করে পুলিশ। রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিক্ষোভকারীদের যন্তর মন্তরে পৌঁছানোও বাধাগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আটকের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নতা রয়েছে। প্রথম দিকের প্রতিবেদনে দুই হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আটকের কথা বলা হলেও পরে দিল্লি পুলিশের অভিযানে আটক ব্যক্তির সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়েছে বলে একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানায়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাস। বিরোধী রাজনীতিক, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী এবং ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও আটক হন। পরে অধিকাংশ বিক্ষোভকারীকে ছেড়ে দেয়া হয়।
সিজেপির তিন শীর্ষ নেতাকে মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর উড়োজাহাজ থেকেই আটক করা হয় বলে দলটির অভিযোগ। রোববার তাদের দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এক বছরের জন্য শান্তি ভঙ্গ না করার শর্তে তাদের মুক্তি দেয়া হয়েছে।
তবে আটকের ঘটনাকে ‘অপহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন আশুতোষ রাঙ্কা। দলটির দাবি, নেতারা ভবিষ্যতে বিক্ষোভ না করার কোনো মুচলেকায় স্বাক্ষর করেননি। তাদের বক্তব্য, শান্তি বজায় রাখার শর্তকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, বিক্ষোভ থেকে সরে আসার কোনো অঙ্গীকার তারা করেননি। মুক্তির পর তিনি পারিবারিক শোকের কারণে মহারাষ্ট্রের নিজ শহরের উদ্দেশে রওনা হন বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে এত বিতর্ক কেন
সিজেপির আন্দোলনের মূল কারণ নির্বাচন কমিশনের পরিচালিত বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় ভোটারদের পরিচয় ও যোগ্যতা যাচাই করে তালিকা হালনাগাদ করা হয়। নির্বাচন কমিশনের যুক্তি, নির্ভুল ভোটার তালিকা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ব্যাপকভাবে নাম বাদ দেয়া এবং যাচাইপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ঘাটতি প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
রয়টার্স ও এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে যোগ্য নাগরিক থাকলে তারা নির্বাচনে অংশ নেয়ার অধিকার হারাতে পারেন। তবে নাম বাদ পড়ার প্রতিটি ঘটনা যে বেআইনি কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা প্রমাণিত নয়। নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের স্বাধীন যাচাই এ বিতর্ক নিষ্পত্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে সিজেপির দাবি, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নামের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ, সংশোধনপ্রক্রিয়ার স্বাধীন পর্যালোচনা এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছে দলটি।
বিতর্কটি ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় ভুল হলে তার প্রতিকার কিভাবে হবে এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর থাকবে?
জরুরি অবস্থার সাথে তুলনা
দিল্লিতে সাম্প্রতিক ধরপাকড় ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ভারতের ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থার সাথে তুলনা করেছেন সিজেপি নেতারা। তাদের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীদের রাজধানীতে প্রবেশ ও নির্ধারিত সমাবেশস্থলে পৌঁছাতে বাধা দিয়ে সরকার ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার সঙ্কুচিত করছে।
সিজেপির আইনি সহায়তা বিভাগের প্রধান রতœা সিংয়ের অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের পরিবারের সদস্যদেরও চাপ দেয়া হয়েছে এবং কয়েকজনের চলাফেরার ওপর নজরদারি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বিরোধী রাজনীতিক ও জনপ্রিয় অনলাইন নির্মাতাদের উপস্থিতি ঘটনাটিকে আরো আলোচনায় এনেছে। বিরোধী নেতাদের মতে, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ গণতান্ত্রিক অধিকার; সরকার ও প্রশাসনের উচিত আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির পথ খোলা রাখা।
অন্যদিকে, বড় সমাবেশ ঘিরে নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বও প্রশাসনের রয়েছে। তবে সেই দায়িত্ব পালনের নামে নির্বিচারে আটক, অযৌক্তিক বাধা কিংবা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বন্ধ করা হলে তা নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের পদক্ষেপের আইনগত ভিত্তি, আটকের কারণ এবং আটক ব্যক্তিদের মুক্তির শর্তের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ।
বিজেপির পাল্টা আক্রমণ
সিজেপির আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেছে বিজেপি। দলটির সভাপতি নীতিন নবীনের অভিযোগ, বিদেশী শক্তির নির্দেশে পরিচালিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সিজেপি ভারতের ক্ষতি করতে চাইছে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত আন্দোলনকারীদের কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও আম আদমি পার্টির (আপ) প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ‘বি-টিম’ বলে মন্তব্য করেছেন।
কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলোর একটি অংশও ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে সিজেপির আন্দোলন কেবল একটি সংগঠনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বৃহত্তর বিরোধী রাজনীতি ও নির্বাচনব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে চলমান বিতর্কের সাথে যুক্ত হয়েছে।
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, গণতন্ত্রে প্রত্যেকের ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। তবে নৈরাজ্য ছড়ানোর অধিকার কারও নেই। সরকারের পক্ষের এ অবস্থান থেকে স্পষ্ট, প্রতিবাদের অধিকার ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে।
সামনে কী
দিল্লির ঘটনার পর সিজেপি দেশজুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দলটির নেতারা যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলে যেতে বাধা দেয়া হলে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণœ হয়।
এখন আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সিজেপি ও বিরোধী দলগুলো কতটা সংগঠিতভাবে কর্মসূচি চালাতে পারে, প্রশাসন কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে এবং নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর কতটা স্বচ্ছ জবাব দেয়, তার ওপর।
ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার- তিনটিই গণতান্ত্রিক বৈধতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে তথ্য প্রকাশ, স্বাধীন যাচাই এবং কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা না গেলে বিতর্ক আরো বিস্তৃত হতে পারে। সিজেপির ‘লড়াই সবে শুরু’ ঘোষণা তাই শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে নতুন এক সঙ্ঘাতের ইঙ্গিতও দিচ্ছে।
জাতিসঙ্ঘের উদ্বেগ
দিল্লিতে বিক্ষোভের আগে ও চলাকালে আন্দোলনকর্মী, রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের সদস্যদের গণহারে আটকের খবরে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দফতর (ওএইচসিএইচআর)। সংস্থাটির মুখপাত্র থামিন আল-খিতান ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার পুরোপুরি সম্মান ও নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তবে ভারতের বক্তব্য, দেশটির সংবিধান শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করেছে এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও মুক্ত গণমাধ্যম এ অধিকার সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। একই সাথে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইন অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তেমনি দিল্লিতে সাধারণ নাগরিক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর পুলিশি দমন-পীড়ন এবং গণহারে আটকের নিন্দা জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির ভারত শাখার প্রধান আকার প্যাটেল বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার প্রয়োগের কারণে আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া উচিত। মানবাধিকার রক্ষায় সংযম দেখানো এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করতেও তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








