
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদীর সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক বৈঠক ইঙ্গিত দেয় যে, বর্তমান স্থবিরতা কাটিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মেরামতের একটি ভাবনা দিল্লির অন্দরে শুরু হয়েছে। তবে প্রতীকী পদক্ষেপ বা দীর্ঘসূত্রতার নীতি পরিহার করে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই সম্পর্কের টানাপড়েন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। শুধুমাত্র প্রথাগত আনুগত্য নয়, বাংলাদেশের বিষয়ে ভারতের নতুন মূল্যায়ন প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর এবং শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নতুন দিল্লির সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছে, তা এখন একটি মোড় পরিবর্তনের মুখে রয়েছে।
ঢাকার নতুন পররাষ্ট্রনীতি : সমতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন
ঐতিহ্যগতভাবে ছোট প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ভারত যে ধরনের অনুগত ও একপেশে মনোভাব আশা করত, বর্তমান ঢাকা সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। নতুন সরকার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক সমতার ভিত্তিতে বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করছে। চীন ও পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক পুনঃমূল্যায়ন এবং তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নতুন করে পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত ভারতের নীতিনির্ধারকদের চিন্তায় ফেলেছে।
হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের দাবি একটি বিশেষ স্পর্শকাতর ও বিরোধপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে দুই দেশের মধ্যে বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও, হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য নতুন বিএনপি সরকার এবং এর আগের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বারবার করা অনুরোধ ভারত উপেক্ষা করে এসেছে। ওই চুক্তির শর্তাবলি (অনুচ্ছেদ ৬) অনুযায়ী, অপরাধটি যদি রাজনৈতিক প্রকৃতির হয়, তবে কোনো দেশই অভিযুক্তকে প্রত্যর্পণে অস্বীকৃতি জানাতে পারে।
মোদি ও ত্রিবেদীর সর্বশেষ বৈঠকে দিল্লি ঢাকার মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণকে ঢাকা উপেক্ষা করে এসেছে। বস্তুত, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে বলেন, ভারতে রহমানের সফরের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ‘প্রধান চ্যালেঞ্জ’ হলো হাসিনা- যাকে তিনি “সন্ত্রাসী” হিসেবে অভিহিত করেছেন- এবং সেখানে অবস্থানরত তার দলের সদস্যদের কার্যকলাপ। ত্রিবেদীর বক্তব্য হয়তো ঢাকার প্রতি নয়া দিল্লির নীতিতে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নয়া দিল্লি তার প্রাক্তন মিত্রকে বিসর্জন দিতে অনিচ্ছুক হলেও, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতার কারণে পূর্ববর্তী প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের পথটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে; কিন্তু এমন পদক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় অনুকূল পরিবেশ তৈরির পথে নয়াদিল্লি অগ্রসর হয়নি। বরং এর বিপরীতে, ভারতের কার্যকলাপ বাংলাদেশের মনে খুব একটা আস্থার সঞ্চার করতে পারেনি।
প্রথমত, ঢাকার আপত্তি সত্ত্বেও ভারত মাঝেমধ্যে শেখ হাসিনাকে বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে বিবৃতি দেয়ার সুযোগ দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভারত জোরপূর্বক ‘অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীদের’ ফেরত পাঠানো অব্যাহত রেখেছে। এই প্রক্রিয়ার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে রাতের অন্ধকারে এসব মানুষকে জোর করে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেয়া, যেখানে এ ধরনের কার্যক্রম নিয়ে ঢাকার আপত্তিকে উপেক্ষা করা হয়। তৃতীয়ত, ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি বাড়লেও, উভয় দেশের আরোপিত কঠোর বাণিজ্য বিধিনিষেধের কারণে ভারতে বাংলাদেশের রফতানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। চতুর্থত, বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় মিশনগুলো থেকে ইস্যুকৃত ভিসার সংখ্যা- যার বেশির ভাগই ভারতের সাশ্রয়ী বেসরকারি চিকিৎসা সেবা গ্রহণের উদ্দেশ্যে যাওয়া রোগীদের জন্য- ব্যাপকভাবে কমেছে। পঞ্চমত, ভারতে পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিজের পছন্দের ব্যক্তির নাম দিল্লিকে জানানোর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও ভারত সেই নিয়োগ অনুমোদন করেনি। এটিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে একটি ‘চাপ প্রয়োগের কৌশল’ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
নয়াদিল্লির অস্বস্তির কারণ হয়ে ঢাকা ভারতের সাথে সম্পর্ক পরিচালনার জন্য একটি নতুন কাঠামো গড়ে তুলছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারত সাধারণত ছোট প্রতিবেশীদের কাছ থেকে অনুগত ও বশংবদ আচরণ পেতে অভ্যস্ত। হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে প্রায় ১৫ বছর ধরে নয়াদিল্লির জন্য এই পদ্ধতি কার্যকর থাকলেও, বর্তমান তারেক রহমান সরকার ভারতের সাথে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে দু’টি মূল স্তম্ভের ওপর জোর দিচ্ছে : কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং সমতার নীতি। কারণ, তারা নিজেদের একটি উদীয়মান মধ্যম শক্তির দেশ এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের একটি প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদার করার ক্ষেত্রে সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের গুরুত্বের ওপর জোর দিচ্ছেন। একই সাথে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় অগ্রাধিকার- যেমন জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিনিয়োগ এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কথা বলছেন। এর অর্থ হলো ঢাকা চীন ও পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশের সাথে তার সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করছে, যা নয়াদিল্লির মধ্যে এমন এক বৈরী প্রতিবেশীবলয়ে ঘেরাও হয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে- যা কি না সেই একই ভুল হিসাব-নিকাশ, যার ফলে ইন্দিরা গান্ধীর আমলে শ্রীলঙ্কার সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল।
ঢাকার এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ফলে তারা ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’-তে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারক মহলে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এর অর্থ দাঁড়ায়- গঙ্গা ও তিস্তার মতো নদীগুলোর পানি বণ্টনের বিষয়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের আলোচনা নতুন করে শুরু হবে; বিদ্যমান চুক্তিগুলোর মেয়াদ কেবল বাড়িয়ে নেয়া হবে না, কারণ ঢাকা এখন সেগুলোকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে মনে করে।
তাই আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপথ কেমন হবে, তা অনুমান করা বেশ কঠিন। নয়াদিল্লি এখন এক উভয়সঙ্কটের মুখে : একদিকে দীর্ঘদিনের মিত্রকে হাতছাড়া করার অনিচ্ছা, অন্য দিকে নিষ্ক্রিয়তার কারণে ক্রমেই বেড়ে চলা মাশুল বা ক্ষতির বিষয়টি উপলব্ধি করা। অন্য দিকে ঢাকাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ভারতের স্বাচ্ছন্দ্য বা সন্তুষ্টির বিষয়টিকে তারা আর নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য করবে না। ভারত যদি কেবল প্রতীকী পদক্ষেপ ও অস্পষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে বিদ্যমান মূল সমস্যাগুলোর সমাধানে এগিয়ে না আসে, তবে ত্রিবেদীর মন্তব্যে সম্পর্কের যে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, তার বদলে বরং দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা সৃষ্টির ঝুঁকিই থেকে যাবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








