অন্তত একডজন সঙ্কটের মুখোমুখি মোদি

 নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

ক্ষমতায় ১৫ বছর পূর্ণ করার মুহূর্তে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একগুচ্ছ সঙ্কটের মুখোমুখি। এক ভয়াবহ পরিস্থিতির ঝড় ঘনিয়ে আসছে। মোদির সেই ‘তিন-দফা কৌশল’ কঠোর ও হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ, ন্যূনতম জটিলতা বা অপচয় রোধ করে দক্ষতার সাথে জনকল্যাণমূলক  সুবিধা প্রদান ও তার ক্রমাগত সম্প্রসারণ এবং দৃশ্যমান ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ। এসবই এখন সবচেয়ে বড় চাপের মুখে। মন্ত্রিসভা এক দিকে মোদির প্রশংসা করে একটি প্রস্তাব পাস করেছে, অন্য দিকে সমালোচকরা তার পঁচিশ বছরের জনজীবনকে ব্যবচ্ছেদ করছেন- শল্যচিকিৎসকের সূক্ষ্ম ছুরি দিয়ে নয়, বরং কাস্তে দিয়ে (অর্থাৎ অত্যন্ত কঠোর ও নির্মমভাবে)।
তবে মোদির তৃতীয় মেয়াদের তৃতীয় বছরটি অন্য সব চ্যালেঞ্জে জর্জরিত। তার ক্লান্ত ও অসম্পূর্ণ মন্ত্রিসভা ধুঁকছে। যোগী আদিত্যনাথ, দেবেন্দ্র ফড়নবিশ এবং হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ছাড়া তার দলের অন্য মুখ্যমন্ত্রীরা নানাবিধ চ্যালেঞ্জ সামাল দেওয়ার মতো যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারছেন না।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতার মারাত্মক ক্ষতি এবং এর ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সংশয় দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সর্বোচ্চ বিচার বিভাগ হয় নির্বাহী বিভাগের (সরকারের) দিকে সরাসরি তাকানোর সাহস পায় না, অথবা অস্পষ্ট ও দুর্বল আদেশ দেয়। আরো খারাপ বিষয় হলো, তাদের কথায় দ্বিমুখী ভাব বা অসংলগ্নতা দেখা যায়। কৌতূহলজনকভাবে, উভয় পক্ষই এই ধারণার সাথে একমত।
মুদ্রাস্ফীতি গত প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে চলেছে; অন্য দিকে, ভারতীয় ব্যাংকগুলোর বিশ্ববাজার থেকে বিপুল ব্যয়ে সফলভাবে তহবিল সংগ্রহের পরেও টাকার মান ধরে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
অত্যন্ত আস্থাভাজন দুই আমলা- অর্থাৎ দুই নির্বাচন কমিশনার- প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সিদ্ধান্তের প্রতি নিজেদের দ্বিমত নথিবদ্ধ করে বা ‘কাগজ-কলমে প্রমাণ’ রেখে নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত করেছেন।
বিরোধী দলের- বিশেষ করে রাহুল গান্ধীর- রাজধানীকে কেন্দ্র করে সরব হওয়ার সক্ষমতা; যেখানে ইংরেজি টিভি চ্যানেল এবং হিন্দি সংবাদপত্রগুলো- এমনকি সরকারের ‘সবচেয়ে আস্থাভাজন’ বলে পরিচিত গণমাধ্যমগুলোও- তাদের কর্মকাণ্ডকে ব্যাপক প্রচার দিচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে তরুণ প্রজন্মের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের শিকার হওয়া এবং এর বিপরীতে তাঁর ‘ডানপন্থী’ সমর্থকদের পক্ষ থেকে কেবল অকার্যকর বা দুর্বল প্রতিক্রিয়া আসা; পাশাপাশি ‘সিজেপি’-এর মতো রাতারাতি উঠে আসা কোনো সংগঠনের ‘নিট’ পরীক্ষা থেকে শুরু করে সরকারি স্কুলের দুরবস্থা- বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়া।
চিরাগ পাসওয়ানের মতো ছোট শরিক দলের নেতার বিহার সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করা; এবং আরো ছোট শরিক ওম প্রকাশ রাজভরের প্রকাশ্যে এমন দাবি করা যে, উত্তর প্রদেশকে একাধিক রাজ্যে বিভক্ত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার কথা হয়েছে- যে প্রস্তাবের ঘোর বিরোধী যোগী আদিত্যনাথ।
মোদি সরকারের ‘দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী’ ভাবমূর্তির বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ী সিদ্ধান্তহীনতা- যেমন নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন) প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া হবে কি না, কিংবা অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি হওয়ার দুই মাস পরেও যে সংসদ অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত  করা হয়নি, তা নিয়ে কী করা হবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, বিজেপি যেসব সাংবিধানিক সংশোধনী সত্যিই আনতে চায়, তার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার সমর্থন জোগাড় করার ব্যাপারে তাদের আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে। মন্ত্রিসভায় রদবদল- অথবা অন্তত শূন্য পদগুলো পূরণ- করার ক্ষেত্রে অক্ষমতা বা দীর্ঘসূত্রতা। এমন অনেক পদই খালি পড়ে আছে, যার মধ্যে শিক্ষা দফতরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রও অন্তর্ভুক্ত।
মোদির তৃতীয় মেয়াদেও শেয়ার বাজারে ক্রমাগত সম্পদের অবমূল্যায়ন ঘটেছে; অথচ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন এমনকি পাকিস্তান- বিশ্বের প্রায় সব দেশের বাজারেই বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে। এই চ্যালেঞ্জটিকে স্বীকার না করার প্রবণতা আসলে আত্মঘাতী এক পলায়নবাদী মানসিকতারই পরিচয় দেয়- বিশেষ করে যখন মধ্যবিত্ত শ্রেণির লাখ লাখ মানুষ তাদের সঞ্চয় এসআইপি-তে বিনিয়োগ করছে এবং সরকার তাদের এই পদক্ষেপের জন্য প্রশংসাও করছে। এর ফলে কার্যত ভারত থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত বিদেশী পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের এক ধরনের ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’ বা সুবিধাজনক বিদায়ই উপহার দেয়া হচ্ছে।
সবশেষে রয়েছে ভারতের জন্য এমন এক বৈশ্বিক পরিস্থিতি, যার নজির গত কয়েক দশকেও দেখা যায়নি। ট্রাম্প অনেক ক্ষেত্রেই ভারতের কৌশলগত পরিসর সঙ্কুচিত করে দিয়েছেন। পাশাপাশি, প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো উসকানিমূলক আচরণের মাধ্যমে তিনি ভারতের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর দাবির প্রতিও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন। ট্রাম্পের বিষয়টি ছাড়াও রয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ায় বিরাজমান অস্থিরতা, টালমাটাল জ্বালানি বাজার এবং পাকিস্তানের সামনে কৌশলগত সুবিধা আদায়ের নতুন এক সুযোগ বা ‘স্ট্র্যাটেজিক-রেন্টিয়ার’ পরিস্থিতির উদ্ভব।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে অপর্যাপ্ত মৌসুমি বৃষ্টিপাত বা বর্ষার ঘাটতি- যা কোনো সরকারেরই নিয়ন্ত্রণে নেই। তবে কৃষির জন্য একটি মন্দ বছরের প্রেক্ষাপটে এই চাপা অসন্তোষগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। অবশ্য বৃহত্তর সমস্যাগুলো নিহিত রয়েছে সেই তিনটি মৌলিক বিষয়ের মধ্যে, যা গত কয়েক দশকে ভারতকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করে তুলেছে। বিষয়গুলো হলো : সংবিধানের প্রতি আস্থা এবং এই বিশ্বাস যে কেউ তা কেড়ে নিতে পারবে না; সর্বোচ্চ বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা; এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা। বর্তমানে এই তিনটি বিষয়ই চাপের মুখে রয়েছে।
২০২৪ সালে দলের মাঝারি সারির কিছু নেতা এবং অযোধ্যার প্রার্থীর ছড়ানো একটি গুজব- যে সংবিধান পরিবর্তনের জন্য দলের ৪০০ আসন প্রয়োজন- বিজেপির কতটা ক্ষতি করেছিল, তা তাদের বিরোধীদের চেয়ে দলটির নিজেরই ভালো জানা। অধিকাংশ ভারতীয় হয়তো সংবিধান বা এতে এ পর্যন্ত আনা ১০৬টি সংশোধনী পড়েননি; কিন্তু তারা সংবিধানকে প্রায় কোনো দেবতা বা পবিত্র ধর্মগ্রন্থের মতো শ্রদ্ধা করেন। তাঁদের কাছে এটি ন্যায়পরায়ণ ও ধর্মনিরপেক্ষ এক দলিল, যাতে থাকা অধিকারের সুরক্ষা তারা কোনোভাবেই ক্ষুণœ হতে দেবেন না। সংসদের বিশেষ অধিবেশন নিয়ে ক্রমাগত আলোচনা সেই পুরোনো সন্দেহগুলোকে আবার উসকে দিয়েছে।
দুর্ভাগ্যবশত, সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত বদলানো, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গড়িমসি এবং লিখিত রায়ের চেয়ে মৌখিক মন্তব্যে বেশি মনোযোগ দেওয়ার মতো বিষয়গুলোর জন্য এমন এক ভাবমর্যাদা তৈরি করেছে যা তাদের জন্য মোটেও সুখকর নয়। ‘এসআইআর’ সংক্রান্ত বিষয়ে আদালতের ভূমিকাও এর ব্যতিক্রম নয়। নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার থেকে শুরু করে রাজধানীতে প্রতিবাদের অধিকারের বিষয়ে অবস্থান নেয়া- একাধিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার সময় আদালত এখন নিবিড় পর্যবেক্ষণের মুখে রয়েছে।
সবশেষে, নির্বাচন কমিশন। প্রায় আট দশকের যাত্রাপথে এই প্রতিষ্ঠানটি ভালো-মন্দ ও সাধারণ-সব ধরনের সময়ের মধ্য দিয়েই গেছে। তবে বর্তমানের মতো এমন ভঙ্গুর অবস্থায় এটি আগে কখনো ছিল না। ‘যার যার স্বার্থই বড়’-এমন মানসিকতার ফাঁদে আটকা পড়া নির্বাচন কমিশনের পক্ষে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। এটি ভারতের জন্যে একটি জাতীয় সংকট। মোদি এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হলে ২০২৯ সালের গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত আড়াই বছরের মধ্যে তার জন্য একটি বড় ধরনের সঙ্কট অপেক্ষা করছে।