
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন ইরানে তিন দিনব্যাপী একটি তীব্র সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা তৈরি করেছে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ওয়াশিংটন কোনো হামলা চালাবে না। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক খবরে জানানো হয়েছে, ট্রাম্পের নির্দেশেই পেন্টাগন এই পরিকল্পনা সাজিয়েছে। গত শুক্রবার ক্যাম্প ডেবিডে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এটি নিয়ে আলোচনা করেন।
এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভাণ্ডার, যা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) যুদ্ধের পর থেকে আবার গুছিয়ে নিয়েছে। এছাড়া ইরানের জ্বালানি কেন্দ্র, সামরিক সদর দফতর এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও সম্ভাব্য লক্ষ্যের তালিকায় রয়েছে। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, পেন্টাগন এরই মধ্যে সেন্ট্রাল কমান্ডকে (সেন্টকম) ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের লড়াইয়ের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। তবে এতে কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। চলমান এই সামরিক প্রস্তুতির মাঝেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে জানিয়েছেন যে তেহরানের সাথে তাদের ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ চলছে এবং নির্বাচনের আগে কোনো আক্রমণ করা হবে না। এই শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে আগামী সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন থাকার কথা রয়েছে।
হরমুজে গ্যাসবাহী ট্যাংকারে হামলা
হরমুজ প্রণালীর দক্ষিণে ‘অবৈধ পথে’ চলাচলের চেষ্টা করায় এনভি সানশাইন নামের একটি বিশাল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসবাহী (এলপিজি) ট্যাংকারে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এতে জাহাজটির ইঞ্জিনকক্ষ ও চালনা ব্যবস্থায় ভয়াবহ আগুন ধরে যায় বলে জানিয়েছে বাহিনীটি। আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ পরিচালনার দায়িত্ব তাদের নৌবাহিনীর। এ অঞ্চলে ‘আগ্রাসী বাহিনীর’ উপস্থিতি মেনে নেয়া হবে না বলেও বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল জাজিরা এলাকার ১৩ নটিক্যাল মাইল পশ্চিমে একটি জাহাজ অজ্ঞাত বস্তু বা অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে আইআরজিসির দাবি করা ট্যাংকারে হামলা এবং যুক্তরাজ্যের সংস্থার জানানো ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে নিয়ম অমান্যকারী জাহাজের বিরুদ্ধে প্রতি রাতেই অভিযান চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাহিনীর রাজনৈতিক উপপ্রধান আলী মোহাম্মাদি। ইরানের সংবাদমাধ্যম ফার্সকে তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই প্রণালীতে ‘সম্পূর্ণ ও নিরঙ্কুশ’ নজরদারি বজায় রেখেছে আইআরজিসি নৌবাহিনী। আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক অভিযানও অব্যাহত থাকবে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে দৈনিক ৩০ লাখ থেকে ৮০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের যে হিসাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করেন মোহাম্মাদি। তার দাবি, এসব হিসাব ভুল এবং তেলের দাম কমানো ও বাজারকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে করা ‘গণমাধ্যমের জল্পনা’। তিনি আরো বলেন, নিয়ম লঙ্ঘনকারী হিসেবে বিবেচিত জাহাজের বিরুদ্ধে হরমুজ প্রণালীর যেকোনো স্থানে নিজেদের অবস্থান কার্যকর করতে সক্ষম আইআরজিসি নৌবাহিনী। একই সাথে উপসাগরীয় অঞ্চল ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন তিনি।
‘ প্রস্তুত ইরানের সশস্ত্রবাহিনী ’ : ইরানের সশস্ত্রবাহিনী শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে সম্পূর্ণ সজ্জিত ও প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে বলে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। খবর পাকিস্তানের গণমাধ্যম ডনের। বৃহস্পতিবার এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালাই-নিক জানান, সরঞ্জাম, অস্ত্র এবং টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থার বিচারে ‘সশস্ত্রবাহিনীর হাত সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ রয়েছে এবং শত্রুর মোকাবেলায় তাদের কোনো ধরনের ঘাটতি নেই। তিনি বলেন, ৪০ দিনের চাপিয়ে দেয়া আগ্রাসী যুদ্ধের পরবর্তী সাত মাসে ইরানের অস্ত্র উৎপাদন যুদ্ধপূর্ব সমপরিমাণ সময়ের তুলনায় ২.৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
‘হুমকি নয়, পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে শান্তি চায় ইরান’ : যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার সাফল্য নির্ভর করছে চাপ ও হুমকিমুক্ত পরিবেশের ওপর বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। গতকাল শুক্রবার তুর্কমেনিস্তানে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর কমনওয়েলথের (সিআইএস) সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। ইরানের সংবাদমাধ্যম ফার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরান ক্লান্তিকর প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতা, একতরফা নির্ভরতার পরিবর্তে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং হুমকির পরিবর্তে আস্থা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে নিরাপত্তা চায়। তিনি বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, অঞ্চলটি জ্বালানি বাজারে একে অপরকে হটিয়ে দেয়ার প্রতিযোগিতার বদলে জ্বালানি উৎপাদন, পরিবহন ও বিনিময়ের একটি নেটওয়ার্কে পরিণত হতে পারে। পেজেশকিয়ান আরো বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অঞ্চলের দেশগুলোকে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
ইরানের নতুন প্রস্তাব : এদিকে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে বৈঠকের পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন বলেছেন, চলমান সঙ্ঘাত বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বিভিন্ন দেশ। এ সঙ্কট সমাধানে রাশিয়াও কূটনৈতিক পথে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। বৃহস্পতিবার তুর্কমেনিস্তানের তুর্কমেনবাশিতে কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্ট স্টেটসের (সিআইএস) শীর্ষ সম্মেলন এবং কাস্পিয়ান সাগরবিষয়ক পরিবেশ সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতার বৈঠক হয়। ইরানের সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বৈঠকে পুতিন বলেন, বর্তমান আঞ্চলিক সঙ্কটের সমাধানই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই সঙ্কট শুরুর পেছনে ইরানের কোনো ভূমিকা ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সঙ্ঘাত বন্ধে বিভিন্ন দেশ কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানও যুদ্ধের অবসান ঘটাতে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, এ সঙ্কট সমাধানে রাশিয়ার অবস্থান স্পষ্ট। কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সঙ্ঘাতের অবসান ঘটাতে মস্কো সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা সত্ত্বেও আলোচনার পথ থেকে সরে না আসার কথা জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার সময়ও বারবার হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে তেহরানকে। এরপরও আলোচনার টেবিল ছাড়বে না ইরান। পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিভিন্ন প্রস্তাব বিনিময় হয়েছে এবং সেগুলো সংশোধনও করা হয়েছে। প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত হলে সংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারীদের সাথে বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করবে তেহরান। তিনি বলেন, সঙ্ঘাতের অবসান ঘটানো এবং আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে ইরানের জনগণের অধিকার নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য। তবে যুক্তরাষ্ট্র একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার নীতি অব্যাহত রাখলে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করে পেজেশকিয়ান আরো বলেন, বিশ্ব ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন। কোনো একটি দেশের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি অন্য দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়। একতরফা আধিপত্য বিস্তারের বিরোধিতা করায় তিনি রাশিয়ার প্রশংসাও করেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








