
মকবুল সাহেবের ইদানীং বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে, এই পৃথিবীটা দিন দিন বড্ড বেশি নোংরা হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন সকালে বারান্দায় বসে খবরের কাগজটা যখন চোখের সামনে ধরেন, তার মনে হয় হরফগুলো একে অপরের ওপর দিয়ে কুস্তি লড়ছে। তিনি বিরক্ত হয়ে চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আনেন। তারপর গজগজ করতে থাকেন, ধুর! আজকালকার নিউজপেপারগুলোও ছাইপাশ ছাপায়, সব ঝাপসা! মনে হয় কালি বাঁচাতে গিয়ে পাঠকদের চোখের বারোটা বাজাচ্ছে।
শহরটা মকবুল সাহেবের কাছে এক টুকরো ধূসর ক্যানভাস। ল্যাম্পপোস্টের আলো তার কাছে মনে হয় হলদেটে এক দলা ধোঁয়া। মানুষজন যখন পাশ দিয়ে যায়, তার মনে হয় কোনো এক ছায়ামানব নিঃশব্দে হেঁটে গেল। তিনি রিকশায় চড়লে চালককে ধমক দেন, আরে ভাই, সামনে দেখে চালাও। ওটা কি মানুষ নাকি খাম্বা? কিছুই তো স্পষ্ট না!
মকবুল সাহেবের সাথে তার চশমাটার দীর্ঘদিনের আদা-কাঁচকলা সম্পর্ক। নাকের ওপর বসা চশমাটা যেন সবসময় তার সাথে মশকরা করে। মাঝে মধ্যে তিনি চশমাটা হাত দিয়ে একটু সরিয়ে ঝাড়ি দেন, ব্যাটা পাজি! টাকা দিয়ে কিনলাম তোরে সেবা করার জন্য, আর তুই আমারেই দুনিয়াটা উল্টাপাল্টা দেখাস? তোরে দিয়া আর কাজ হবে না।
একদিন বিকেলে পার্কে বেঞ্চিতে বসে তিনি একা একাই দুনিয়া উদ্ধার করছিলেন। পাশে থাকা এক অপরিচিত ভদ্রলোককে লক্ষ করে বললেন, দেখুন তো ভাই, ওই যে দূরে একটা কিছু দেখা যাচ্ছে, ওটা কি আসলেই একটা মানুষ নাকি কোনো গাছ? সব ঝাপসা, সব ছাই! পৃথিবীটা আসলে এক্কেবারে মরে গেছে বুঝলেন?
ভদ্রলোক মকবুল সাহেবের চশমার কাচের দিকে একবার তাকিয়ে মিটিমিটি হাসলেন। কাচ দুটোয় এত দিনের অবহেলায় আঙুলের ছাপ আর তেলের স্তর জমে পুরু হয়ে আছে। কিন্তু তিনি কিছু বললেন না।
এমন সময় পাঁচ-ছয় বছরের এক পুঁচকে বাচ্চা বল নিয়ে খেলতে খেলতে মকবুল সাহেবের সামনে এসে দাঁড়াল। মকবুল সাহেব চশমার ওপর দিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাতে চাইলেন; কিন্তু তার কাছে মনে হলো সামনে কোনো একটা গোলগাল রঙিন ফুটবল দাঁড়িয়ে আছে। তিনি কর্কশ গলায় বললেন, এই খোকা! তুমি কি মানুষ নাকি কোনো চলন্ত রামধনু? সামনে থেকে সরো, আমার চোখে ধোঁয়া লাগছে!
বাচ্চাটা ভয় পাওয়ার বদলে খিলখিল করে হেসে উঠল। সে মকবুল সাহেবের বিরক্তি মাখানো মুখের তোয়াক্কা না করে এক ঝটকায় তার নাকের ওপর থেকে চশমাটা কেড়ে নিলো। মকবুল সাহেব আকাশ থেকে পড়লেন, আরে! আরে! করো কী? ওটা ছাড়া তো আমি এক্কেবারে অন্ধ!
বাচ্চাটা কথা না বলে তার টি-শার্টের এককোণ দিয়ে বেশ ঘষে ঘষে চশমার কাচ দুটো মুছতে শুরু করল। মকবুল সাহেব তখন হাত বাড়িয়ে মরিয়া হয়ে বলছেন, দাও বলছি! ওটা তো তোমার খেলনা না! ভেঙে ফেললে তো বিপদ!
বাচ্চাটা চশমাটা বেশ চকচকে করে মকবুল সাহেবের নাকে আবার আলত করে পরিয়ে দিলো। মকবুল সাহেব চোখ মেললেন। মুহূর্তেই যেন জাদুকর তার লাঠি ঘুরিয়ে দিলো! পুকুরটা বিকালের রোদে হীরের কুচির মতো ঝিলমিল করছে। পার্কের কৃষ্ণচূড়া গাছটার পাতাগুলো এত সজীব যে মনে হচ্ছে যেন এখনই সেখান থেকে প্রাণের স্পন্দন পাওয়া যাবে। এমনকি দূরে এক বুড়ো মানুষ একা বসে হাসছে- সেটিও মকবুল সাহেবের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
মকবুল সাহেব স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। চশমার কাচটা এত স্বচ্ছ যে তার মনে হলো পৃথিবীটা যেন এইমাত্র দীর্ঘ ঘুম থেকে জেগে আড়মোড়া ভেঙে সামনে দাঁড়িয়েছে। তিনি বাচ্চাটার মাথায় হাত রেখে একটা শুকনো অথচ গভীর হাসি হাসলেন। বাচ্চাটা বল নিয়ে দৌড়ে চলে গেল। মকবুল সাহেব চশমাটা একবার খুলে হাতের তালুতে নিলেন। তারপর বিড়বিড় করে বললেন, আসলে জঞ্জালটা তো পৃথিবীর ছিল না রে খোকা, জঞ্জালটা ছিল আমার চশমার কাচের ধুলোয়। আর চশমার এই কাচের ধুলো মোছা তো খুব সহজ; কিন্তু মানুষের মনের ধুলো ঝেড়ে ফেলা বড় কঠিন।
তিনি পার্কের বেঞ্চিতে বসে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার মনে হলো, মানুষের মনটাও এই চশমার কাচের মতো। আমরা যখন কাউকে অপছন্দ করি বা কোনো কিছু নিয়ে বিরক্ত বোধ করি, তখন আমাদের মনের ওপর এক ধরনের সূক্ষ্ম অভিমানের ধুলো জমে যায়। আমরা তখন সত্যটা দেখি না, আমাদের চশমায় যা ধুলো জমে থাকে তাই দেখি। মকবুল সাহেব এবার খুব মমতা নিয়ে নিজের পকেট থেকে পরিষ্কার রুমালটা বের করে কাচদুটো আবার মুছতে শুরু করলেন। তিনি বুঝলেন, জগতটা আসলে বদলায়নি, বদলে গিয়েছিল তার দেখার ইচ্ছাটা। তিনি চশমাটা আবার নাকে পরলেন এবং দেখলেন দূরে শিশু-কিশোররা হাত ধরে হাঁটছে। আগে হলে তিনি হয়তো অন্যরকম মন্তব্য করতেন। কিন্তু আজ তার কাছে মনে হলো- পৃথিবীটা তো এমন নির্মল শিশুকিশোরদের ভালোবাসারই জায়গা।
তিনি আজ হাঁটছেন অন্যভাবে। কারণ তিনি জেনে গেছেন- কাচের ধুলো পরিষ্কার করা সহজ; কিন্তু মনের ধুলো পরিষ্কার করা বড় কঠিন। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা নির্ভর করে আমাদের মনের ওপর। কাচের ধুলো আমাদের দৃষ্টিকে ঝাপসা করে; কিন্তু মনের ধুলো আমাদের বিচারবুদ্ধিকে অন্ধ করে দেয়। প্রকৃত মানুষ তারাই, যারা প্রতিনিয়ত নিজেদের মনের কালিমা বা ধুলো ঝেড়ে পৃথিবীটাকে তার আপন সৌন্দর্যে দেখতে শেখে। ম
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








