
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন কয়েক দিন আগে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডকে ইরানে আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে বলে দাবি করেছে অ্যাক্সিওস। এই নির্দেশনায় হামলা চালানোর কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচির উল্লেখ ছিল না এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে মার্কিন ও ইসরাইলি সূত্রগুলো জানাচ্ছে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই এবং সম্ভবত ইসরাইলি নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে এ হামলা চালানো হতে পারে।
আগামী তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে আবার যুদ্ধ শুরু হলে তা মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ যুদ্ধের প্রভাবে তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে। পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেন, প্রতিরক্ষা দফতরের কাজ হলো প্রেসিডেন্টের কাছে সামরিক বিকল্প তৈরি ও তা উপস্থাপন করা।
হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের কাছে সব ধরনের পথ খোলা রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে তিনি সেগুলোর প্রয়োগ করতে পারেন। ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। ইরানের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় থাকায় যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ইরান ধ্বংস হয়ে গেছে, এখন দু’টি উপায়ের যেকোনো একটির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে- সহজ পথ অথবা কঠিন পথ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতেই সব কার্ড রয়েছে এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যা ভালো, সেটাই করবেন।
সংবাদমাধ্যম দ্য আটলান্টিক বুধবার এক খবরে জানিয়েছিল, ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ইরানে হামলা চালানোর বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। খবরে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দল যুদ্ধ এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে কয়েক ঘণ্টা ধরে বৈঠক করেছে। একজন ইসরাইলি কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন, বৈঠকের একটি অংশে ইরানে আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর সম্ভাব্য বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, এতে ‘দীর্ঘমেয়াদি’ পররাষ্ট্রনীতি পরিকল্পনার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি। কাতারি মধ্যস্থতাকারীরা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা প্রস্তাবের বিষয়ে ইরানি জবাবের অপেক্ষায় রয়েছেন। ওই প্রস্তাবে পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেয়ার দাবি অন্তর্ভুক্ত ছিল। দ্বিতীয় একজন ইসরাইলি কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরানে আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। নির্বাচনের আগে হামলা চালানোর সম্ভাবনা খুব বেশি নেই, তবে আমরা তা উড়িয়ে দিচ্ছি না। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হামলার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে কথা বলেছেন। টানা কয়েক সপ্তাহ কথা না হওয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যে তাদের এটি দ্বিতীয় ফোনালাপ। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ‘৭ অক্টোবরের গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা’ নিয়ে কথা বলেছেন। প্রথম ইসরাইলি কর্মকর্তা জানান, নেতানিয়াহু ইরান ইস্যুতে তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের সাথে বৈঠক করার পরেই ট্রাম্পের সাথে তার ফোনে আলাপ হয়। যুদ্ধবাজ ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গত সোমবার মার্কো রুবিওর সাথে কথা বলেছিলেন।
ইরানে যদি আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে করবে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এতে অংশ নেবে। দুই ইসরাইলি কর্মকর্তা দাবি করেন, ইরানি শাসকগোষ্ঠী বর্তমানে চরম হতাশ ও আতঙ্কে রয়েছে, যার ফলে তারা আগে হামলা চালিয়ে বসতে পারে। ইসরাইলি কর্মকর্তারা জানান, ইরানিরা ইতোমধ্যে দু’টি আকস্মিক হামলার শিকার হয়েছে। তারা তৃতীয় কোনো আকস্মিক হামলার মুখোমুখি হতে চায় না। যুদ্ধ আবার শুরু হলে তা ইসরাইলি নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ প্রতিশোধ হিসেবে ইরান দেশটিতে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। নতুন করে এই উত্তেজনা বৃদ্ধি কিংবা কেবল টান টান উত্তেজনা বা জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটাও রাজনৈতিকভাবে নেতানিয়াহুকে সুবিধা দিতে পারে। নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে তাকে ঘিরে বিরোধীদের আক্রমণ কমে যেতে পারে।
চুক্তিতে আগ্রহী নন ট্রাম্প
ইরানের সাথে সম্ভাব্য একটি চুক্তি নিয়ে কাজ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তিনি ‘খুব ভালো করছেন’ বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ইরানের সাথে চুক্তি করাকে তিনি নিজের পছন্দের ফলাফল হিসেবে দেখছেন না বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন। খবর আল জাজিরার।
টেক্সাসের সান আন্তোনিওতে এক নির্বাচনী সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি (উইটকফ) ইরানের সাথে চুক্তি নিয়ে কাজ করছেন এবং খুব ভালো করছেন। আমি মনে করি, চুক্তি আসলে এমন কিছু নয়, যা আমি করতে চাই। তবে তারা যুদ্ধ বন্ধ করতে আমাদের যেকোনো কিছু দিতে রাজি।’
ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হবে না’। এ সময় তিনি উইটকফের প্রশংসা করে তাকে ‘দারুণ একজন আলোচক’ বলে উল্লেখ করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আশা করছেন, শিগগিরই যুদ্ধের অবসান হবে। তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধ শেষ হবে- খুব শিগগিরই। এটা খুব শিগগিরই শেষ হতে হবে।’ ইরানকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে বর্ণনা করে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘দেশটির সামান্য লড়াকু মনোভাব এখনো আছে, তবে খুব বেশি নয়।’
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরোক্ষ আলোচনা
কবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলতি মাসে নিউ ইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক এক কর্মকর্তা এবং ইরানের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে। খবর আল জাজিরার। খবরে বলা হয়েছে, ইরানের সাথে যেকোনো চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ও অমীমাংসিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্যতম। এনবিসি নিউজ আরো জানিয়েছে, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে শুধু হরমুজ প্রণালী নিয়ে আরেকটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক করতে আগ্রহী নয় ওয়াশিংটন। এর আগে ইরান সাত দিনের একটি সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিল। এর আওতায় হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের আটকে থাকা অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া শুরু করবে। পরে আলাদাভাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করার প্রস্তাব দিয়েছিল তেহরান। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েক দিনের মধ্যে জবাব দেবে ইরান
ইরান কয়েক দিনের মধ্যে শান্তি প্রস্তাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে জবাব দেবে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ‘আলোচনা প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করা হচ্ছে’। ইরানের আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা তাসনিমের খবর অনুযায়ী, আরাকচি সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আমাদের প্রস্তাব উপস্থাপন করেছি এবং সেই সাথে মার্কিন পক্ষের মতামতও শুনেছি। প্রস্তাবটিকে আমরা ‘সাত দিনের পরিকল্পনা’ হিসেবে অভিহিত করেছি। তিনি আরো বলেন, আমরা বর্তমানে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি পর্যালোচনা করছি এবং আমার বিশ্বাস, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা আমাদের জবাব জানিয়ে দেবো।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতির আসল পরিমাণ প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘গত মে মাসে মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস বলেছিল, ইরানের সশস্ত্রবাহিনী ৪২টি মার্কিন সামরিক বিমান ধ্বংস করেছে। এখন এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১টিতে।’
আরাকচি বলেন, প্রমাণ? মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) কংগ্রেসের একজন সিনেটরকেও এমন সব ঘাঁটি পরিদর্শন করার অনুমতি দিচ্ছে না, যে ঘাঁটিগুলো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় আছে বলে তারা দাবি করছে। পোস্টে তিনি আরো লিখেছেন, এই বিষয়ে মানুষকে চিরকাল ‘ধোঁয়াশা বা প্রতারণার মাঝে’ রাখা যাবে না।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








