গাজা যুদ্ধ ভারতকে ইসরাইলের আরো কাছাকাছি এনেছে

  নয়া দিগন্ত

Advertisement

যেখানে পশ্চিমা ঐতিহ্যবাহী মিত্র দেশগুলোও গাজায় সামরিক আগ্রাসন এবং চরমপন্থী মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ডে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে, ঠিক সেই সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ইসরাইলের আরো কাছাকাছি চলে গেছে। সম্প্রতি আলজাজিরার একটি প্রতিবেদনে এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে।
কূটনৈতিক দূরত্ব বনাম বন্ধুত্বের উষ্ণতা
গাজায় চলমান সামরিক অভিযানের কারণে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ ইসরাইলি উগ্রপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভীরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেও, ভারত তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্মোট্রিচ ভারত সফর করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এ ছাড়া, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েও মোদি ইসরাইল সফর করেন।
ভারতের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন
১৯৪৭ সালের পর থেকে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী অবস্থানের কারণে ভারত দীর্ঘদিন ফিলিস্তিনের জোরালো সমর্থক ছিল। কিন্তু ১৯৯২ সালে ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর সম্পর্ক ধীরে ধীরে এগোলেও, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সম্পূর্ণ প্রকাশ্য ও গভীর রূপ নেয়। বর্তমানে ভারত 
ইসরাইলের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্রক্রেতা। 
দেশীয় রাজনীতি ও আদর্শিক সংযোগ
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই ইসরাইল প্রীতির পেছনে রয়েছে গভীর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব। মোদির দল ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সাথে জায়নবাদের আদর্শগত মিল রয়েছে। এ ছাড়া, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ইসরাইলের ওপর হামাসের হামলাকে ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর সাথে যুক্ত করে তা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি বর্ধিতাংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কূটনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন
পশ্চিমা দেশগুলোর মতো ভারত গাজার সহিংসতা, বসতি স্থাপন কিংবা ইরানে হামলার প্রকাশ্যে সমালোচনা করা থেকে বিরত রয়েছে। ফিলিস্তিনের বিষয়ে ঐতিহ্যগত দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা মুখে বললেও, ইসরাইলের সাথে রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির বর্তমান বোঝাপড়া আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়। 
ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভারতের ঐতিহাসিক ও নীতিগত অবস্থান থেকে সরে এসে মোদি সরকারের এই ইসরাইলমুখী কূটনীতি কেবল আন্তর্জাতিক কৌশলগত বাস্তববাদ নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে একটি স্পষ্ট অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও আদর্শিক সমীকরণ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার এবং তার কট্টর-ডানপন্থী সহকর্মী ইতামার বেন-গভিরের বিরুদ্ধে জোটগত নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা করছিল- তখনই স্মোট্রিচকে ভারতে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয় এবং তাকে নিয়ে একাধিক শহরে সফরের আয়োজন করা হয়। নয়াদিল্লিতে তিনি একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেন; মুম্বাইতে স্টক এক্সচেঞ্জ পরিদর্শন করেন; এবং গুজরাটে একটি নতুন বিনিয়োগ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সেই সময় ইসরাইল গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধ চালাচ্ছিল এবং তার ভারত সফরের দিনগুলোতেই বোমাবর্ষণ ও বহু মানুষকে হত্যা করছিল, তখন নয়াদিল্লি ইসরাইলের সাথে অভূতপূর্ব মাত্রায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। 
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মোদি ইসরাইল সফর করেন; ঠিক সেই সময়েই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতানিয়াহু ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েছিলেন- যাঁর বিরুদ্ধে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। ইসরাইলি পার্লামেন্টে ভাষণ দেয়ার সময় নেতানিয়াহু মোদিকে বলেছিলেন, ‘আপনি ইসরাইলের এক মহান বন্ধু। আপনি বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু। আপনি একজন ভাই।’ 
ইসরাইলের তিন বছরের হামলায় অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ২১ হাজার শিশু। এই সংখ্যাটি যুদ্ধ-পূর্ববর্তী জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ বা প্রতি ৩০ জনের মধ্যে একজনের সমান।
আলজাজিরা ও অন্যান্য গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, গাজায় চলমান এই গণহত্যাতুল্য যুদ্ধের সময় নয়াদিল্লি ইসরাইলে অস্ত্র রফতানি করেছে। পাশাপাশি, মোদির শাসনামলে ভারত ইসরাইলের অস্ত্রের বৃহত্তম ক্রেতায় পরিণত হয়েছে। প্রাক্তন ভারতীয় কূটনীতিক সুরি বলেন, ইসরাইল ও ভারত প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী অংশীদার। ইসরাইল ও ভারতের সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক পর্যায়ে এতটাই ঘনিষ্ঠ বোঝাপড়া রয়েছে, ইসরাইলের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে (ভারতের) এক ধরনের অনীহা কাজ করে।