
শাহ আলম নূর
রাজস্ব আয় বাড়াতে বড় ধরনের কর সংস্কারের তাগিদ দিয়ে আসছে বিশ্বব্যাংক। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের গতি মন্থর থাকা, মূল্যস্ফীতি উঁচুতে থাকা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে নতুন করে করের বোঝা বাড়লে তার শেষ প্রভাব সাধারণ ভোক্তা ও মধ্যবিত্তের ওপর পড়বে কি না- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- রাজস্ব বাড়াতে নতুন করদাতা ও নতুন করযোগ্য আয় খুঁজে বের করা হবে, নাকি যারা ইতঃমধ্যে নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদের ওপরই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত সর্বশেষ বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের রাজস্ব সংগ্রহ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন। একই প্রতিবেদনে ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭- উভয় অর্থবছরই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
এ দিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা। বাকি ২৫ হাজার কোটি টাকা এনবিআর-বহির্ভূত কর এবং ৬৬ হাজার কোটি টাকা অনাকর রাজস্ব থেকে আসবে। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের বাজেট লক্ষ্যমাত্রা পাঁচ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হলেও, এনবিআরের কর আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক অর্থবছরের ব্যবধানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে এক লাখ এক হাজার কোটি টাকা।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুন পর্যন্ত কর আদায় হয়েছে চার লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। বিপরীতে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা; অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। এই বড় অঙ্কের ঘাটতির ওপর দাঁড়িয়েই ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরকে আরো এক লাখ এক হাজার কোটি টাকা বেশি আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়িয়ে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করা হবে, নাকি করের আওতার বাইরে থাকা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নতুন করে করজালে আনা হবে- সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বের বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামোর বড় দুর্বলতা হিসেবে কর অব্যাহতি, দুর্বল কর প্রশাসন এবং মূল্যসংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বাংলাদেশের করের হার অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশের তুলনায় কম নয়; মূল সমস্যা রয়েছে করের ভিত্তি, কর প্রশাসন এবং আদায়ের দক্ষতায়। একই সাথে কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণ, ভ্যাট ব্যবস্থার সরলীকরণ এবং প্রত্যক্ষ করের ভূমিকা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর সংস্কারের আলোচনায় শুধু নতুন করদাতা খোঁজা নয়, বিদ্যমান কর সুবিধাগুলোর কার্যকারিতাও খতিয়ে দেখা জরুরি। কোন সুবিধা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রফতানি বাড়িয়েছে এবং কোনটি কেবল কর ফাঁকি বা কমানোর সুযোগ তৈরি করেছে- তার সঠিক হিসাব না করলে সংস্কার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামোর আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা। এনবিআরের গবেষণা বলছে, ২০২২ সালে ভ্যাট অব্যাহতি ও অন্যান্য কাঠামোগত সুবিধার কারণে সম্ভাব্য রাজস্ব হারানোর পরিমাণ ছিল প্রায় এক লাখ ২৯ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ। এ ছাড়া আইএমএফের ২০২৩ সালের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ভ্যাট-সংক্রান্ত আদায় ঘাটতি ছিল জিডিপির ৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রাজস্ব ব্যবস্থাকে ভোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল করে তোলে। অর্থনীতি মন্থর হলে তাই রাজস্বও দ্রুত কমে যায়।’ রাজস্ব বাড়াতে নতুন করদাতা শনাক্তকরণের পাশাপাশি কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর অব্যাহতির কার্যকারিতা যাচাইয়ের ওপর জোর দেন তিনি।
এনবিআর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যের বিপরীতে আয়কর বিভাগে অনুমোদিত ১২ হাজার ৭৬৪টি পদের মধ্যে চার হাজার ৫৫২টি পদই শূন্য রয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ জনবল ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু থাকলেও সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় এখনো হয়নি। এই পরিস্থিতিতে কেবল নতুন করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিন) বা কাগজপত্রের সংখ্যা বাড়িয়ে করজাল সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হলে, প্রকৃত আয় ও লেনদেন শনাক্ত না হয়ে বরং করদাতাদের হয়রানিই বাড়বে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ মনে করেন, কর ফাঁকি রোধ, ব্যবসার খরচ কমানো এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা উচিত। ব্যবসাবান্ধব নীতি ও কর সুবিধার মাধ্যমে বাণিজ্য বাড়লে দিনশেষে রাজস্বও বাড়বে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরকে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা আদায়ের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য দেয়া হয়েছে, তা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। এই অতিরিক্ত রাজস্ব যদি কেবল বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপিয়ে আদায় করার চেষ্টা করা হয়, তবে তা বিনিয়োগ ও ব্যবসার খরচে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পক্ষান্তরে, করজালের বাইরে থাকা আয়, সম্পদ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে যুক্ত করা গেলে ন্যায্যতার ভিত্তিতেই রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব। সহজ পথ হিসেবে বিদ্যমান করদাতা ও ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ না চাপিয়ে, একটি কার্যকর ও আধুনিক করব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সরকারের প্রধান সংস্কার এজেন্ডা হওয়া উচিত।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








