বিশ্ব ডাক দিবস
বিশ্ব ডাক দিবস।

 নাসিম সিকদার  

Advertisement

১৮৭৪ সালের ৯ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরে ২২টি দেশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে জেনারেল পোস্টাল ইউনিয়ন, যা পরবর্তীতে ‘ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন’ (ইউপিইউ) নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। আন্তর্জাতিক এই সংস্থার প্রতিষ্ঠানটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতি বছর ৯ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হয় ‘বিশ্ব ডাক দিবস’। বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক এই সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। 
মানবসভ্যতার আদিকাল থেকেই সংবাদ আদান-প্রদানের প্রয়োজনীয়তা ছিল। একসময় পায়রার পায়ে বার্তা বেঁধে কিংবা বিশ্বস্ত কুকুরের গলায় ঝুলিয়ে চিঠি পাঠানো হতো। পরবর্তীতে সেই স্থান দখল করে দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার বার্তাবাহক বা রানার। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার পর ঘোড়াগুলোকে নির্দিষ্ট খুঁটি বা ‘পোস্ট’-এ বেঁধে বিশ্রাম নেয়া হতো। সেই বিশ্রামাগারই কালক্রমে হয়ে ওঠে ‘পোস্ট অফিস’ আর বার্তা বহনকারীরা পরিচিত হন ‘পোস্টম্যান’ হিসেবে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ডাক বিভাগ নিজেকে গড়ে তুলেছে মানবসেবার এক অনন্য মাধ্যম হিসেবে। 
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ বিশ্বজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন ডাক যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছে। জনসেবাকে মূল ব্রত হিসেবে নিয়ে দেশের হাজার হাজার ডাকঘরের মাধ্যমে নাগরিক সেবা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। শুধু চিঠিপত্র, পার্সেল বা মানিঅর্ডার আদান-প্রদানই নয়; ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক, ডাক জীবনবীমা, প্রাইজবন্ড ও সঞ্চয়পত্র বিক্রয়, ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন, রাজস্ব স্ট্যাম্প বিতরণসহ বহুমুখী এজেন্সি সেবা দিচ্ছে এই বিভাগ। এ ছাড়া দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে নিয়মিত স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে আসছে বাংলাদেশ। ইসরাইল ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব দেশের সাথেই বাংলাদেশের ডাক যোগাযোগ বহাল রয়েছে, যার মধ্যে ইএমএস এবং ইন্টেল পোস্টের মাধ্যমে দ্রুততম সেবাও অন্তর্ভুক্ত। 
তবে বর্তমান যুগে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির জোয়ার, উচ্চগতির ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার সহজলভ্যতার কারণে ঐতিহ্যবাহী এই ডাক ব্যবস্থা আজ বিলুপ্তির পথে। ই-মেইল, মেসেঞ্জার বা মুহূর্তের মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের ডিজিটাল মাধ্যমের ভিড়ে চিঠিপত্রের সেই স্বর্ণযুগ অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে। 
তা সত্ত্বেও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় রূপ বদলালেও ডাক বিভাগের আত্মিক আবেদন আজও অমলিন। ইট-কাঠের যান্ত্রিক শহরের বাইরে গ্রামীণ জীবনে ডাকপিয়ন বা পোস্টমাস্টার এখনো পরিবারের একজন আপনজনের মতো। প্রিয়জনের হাতের ছোঁয়া লাগা চিঠি কিংবা দূরপ্রবাসে থাকা সন্তানের পাঠানো জমানো টাকার মানিঅর্ডারের যে গভীর আবেগ, তা কোনো ডিজিটাল বার্তার মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব নয়। রক্তে বোনা সম্পর্কের মতোই বাংলাদেশ ডাক বিভাগ আজও মানুষের আস্থার এক চিরন্তন ঠিকানা।