
মনিরুজ্জামান সুমন দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা। ভৈরব নদের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই জনপদ আজও নীরবে বহন করে বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি। প্রায় এক শতাব্দী ধরে সেই স্মৃতির অন্যতম দৃশ্যমান সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাটি ও ছনের তৈরি একটি আটচালা ঘর। অথচ দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানটি পূর্ণাঙ্গভাবে সংরক্ষিত হয়নি। নেই পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো, নেই গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উপযোগী কোনো কমপ্লেক্স। কবির স্মৃতির সাথে জড়িয়ে থাকা ভৈরব নদের ঘাটটিও পড়ে আছে জরাজীর্ণ অবস্থায়।
কার্পাসডাঙ্গার মাটিতে নজরুলের পদচারণার ইতিহাস এক দিনের নয়। ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯২৬ সালের দিকে কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিটে অবস্থানকালে কার্পাসডাঙ্গার মহিম সরকার, হর্ষপ্রিয় বিশ্বাস ও বৈদ্যনাথ বাবুর সাথে কবির ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তাদের আমন্ত্রণেই কবি সপরিবারে কার্পাসডাঙ্গায় আসেন। বিভিন্ন সূত্রে ১৯২৬ ও ১৯২৭ সালে তার একাধিকবার এখানে আসার কথা উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কলকাতা থেকে ট্রেনে দর্শনায় এসে সেখান থেকে গরুর গাড়িতে কার্পাসডাঙ্গায় পৌছেছিলেন কবি। আবার কোনো কোনো সূত্রে নদীপথে আসার কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে পথ যেটিই হোক, কার্পাসডাঙ্গায় এসে নজরুল যে পরিবেশে সময় কাটিয়েছিলেন, তার স্মৃতি আজও বহন করছে এই এলাকা।
কবি থাকতেন মিশনপাড়ার হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের বাগানবাড়ির আটচালা ঘরে। হর্ষপ্রিয় বিশ্বাস ছিলেন শিক্ষক, রাজনীতিক এবং তৎকালীন নদীয়া জেলা কংগ্রেসের নেতা। তার বাড়িটি সে সময় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। নজরুলের সাথে ছিলেন স্ত্রী প্রমীলা দেবী, শাশুড়ি গিরিবালা দেবী এবং দুই সন্তান অরিন্দম খালেদ বুলবুল ও কাজী সব্যসাচী। মাটি ও ছনের তৈরি সেই ঘরের গুরুত্ব তাই তার স্থাপত্যে নয়, প্রতি পরতে জমে থাকা ইতিহাসে।
কবি এখানে প্রায় দুই মাস অবস্থান করেছিলেন। এই ঘরেই কবির ব্যবহৃত খাট ও আলমারি সংরক্ষিত রয়েছে। হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের উত্তরসূরিরা নিজেদের উদ্যোগ ও অর্থে দীর্ঘদিন ধরে ঘরটি টিকিয়ে রেখেছেন।
কার্পাসডাঙ্গায় অবস্থানকালে ভৈরব নদের তীরে বাঁধানো সিঁড়ির ঘাট এবং ঝাউ ও দেবদারু গাছের ছায়াঘেরা স্থান ছিল কবির প্রিয় জায়গাগুলোর একটি। সেখানে বসে তিনি প্রকৃতি দেখতেন, গান গাইতেন ও সাহিত্যচর্চা করতেন। কার্পাসডাঙ্গার সাথে কবির ‘লিচু চোর’ ও ‘পদ্মগোখরো’সহ কিছু বিখ্যাত রচনা ও গানের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে।
কিন্তু প্রায় এক শতাব্দী পরও এখানে মূলত রয়েছে একটি আটচালা ঘর, একটি নামফলক এবং জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত একটি ঘাটলা। খড় সংগ্রহ করে ঘরের চাল ছাওয়া থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণÑ সবই করছেন হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের উত্তরসূরিরা। ২০১৫ সালে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হলেও তাতে ইতিহাস সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয়নি বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
দামুড়হুদা ইউএনও লাভলী ইয়াসমিন জানান, কার্পাসডাঙ্গায় কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত স্থানকে ঘিরে ‘নজরুল স্মৃতি কমপ্লেক্স’ নির্মাণের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে লিখিত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ভৈরব নদীর তীরে কবির স্মৃতিবিজড়িত ঘাটটি সংস্কারের পাশাপাশি সেখানে একটি দৃষ্টিনন্দন পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সংযোগ সড়ক উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকেও চিঠি দেয়া হয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








