
রাজশাহী ব্যুরো
রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) ভিসি অধ্যাপক ডা. মো: জাওয়াদুল হকের পদত্যাগের ঘটনা এখন আর কেবল একজন ভাইস চ্যান্সেলরের পদত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন উঠেছে- একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যালয়ে কিভাবে একদল ব্যক্তি প্রবেশ করে ভিসিকে অবরুদ্ধ করলেন, আগে থেকেই প্রস্তুত করা একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করালেন এবং পরে কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়ে গেলেন?
ঘটনার এক দিনের ব্যবধানে মামলা হয়েছে। মামলায় ৫০ থেকে ৬০ অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতার ব্যক্তি আব্দুস সালাম স্থানীয় বিএনপির সাথে যুক্ত বলে তথ্য এলেও পুলিশ বলছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টি তদন্তে যাচাই করা হচ্ছে। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানববন্ধন করে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
অন্য দিকে স্থানীয় বিএনপি নেতারা বলছেন, এটি কোনো দলীয় কর্মসূচি ছিল না। তাদের দাবি, ‘ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে স্থানীয় বাসিন্দা ও দলের কিছু নেতাকর্মী সেখানে গেলেও ভিসিকে পদত্যাগে বাধ্য করার সাথে দলীয় সিদ্ধান্ত বা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- পদত্যাগপত্রটি কে আগে থেকে তৈরি করেছিল? কার নির্দেশে তা তৈরি হয়েছিল? কারা সেটি নিয়ে ভিসির কার্যালয়ে ঢুকেছিল? এবং ঠিক কী পরিস্থিতিতে একজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি তাতে স্বাক্ষর করলেন?
বেলা ১১টা থেকে কয়েক ঘণ্টা
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের ভাষ্যানুযায়ী, ৬ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ‘রাজশাহীর আপামর ছাত্র-জনতা’ লেখা ব্যানার নিয়ে একদল ব্যক্তি রামেবির অস্থায়ী কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দলটির সদস্যসংখ্যা ২০-২৫ থেকে ৪০-৫০ কিংবা ৫০-৬০ জন পর্যন্ত বলা হয়েছে।
ভিসি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজসংক্রান্ত বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করছিলেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ওই সময় দলটি ভিসির কার্যালয়ে ঢুকে তাকে পদত্যাগের জন্য চাপ দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, একপর্যায়ে আগে থেকেই লেখা একটি পদত্যাগপত্র ভিসির সামনে দেয়া হয়। পরে তাকে সেটিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। স্বাক্ষরের কয়েক মিনিটের মধ্যে ভিসি কার্যালয় থেকে বের হয়ে যান। প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীরা তাকে ভীত ও সন্ত্রস্ত অবস্থায় দেখার কথা জানিয়েছেন।
ভিসির নিজের বক্তব্যেও জোরপূর্বক স্বাক্ষরের অভিযোগ এসেছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মদদপুষ্ট স্থানীয় ঠিকাদার ও বহিরাগত কিছু লোক তার কার্যালয়ে ঢুকে- স্থানীয় ঠিকাদারদের পরিবর্তে ঢাকার ঠিকাদারদের কাজ দেয়া হচ্ছে- এমন অভিযোগ তোলে। তাকে ‘আওয়ামী লীগের দালাল’ আখ্যা দিয়ে স্লোগানও দেয়া হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। এরপর জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়া এবং তাকে কার্যালয় থেকে বের করে দিয়ে সেখানে তালা ঝোলানোর কথা উল্লেখ করেন তিনি।
শুধু ভিসি নন, কর্মকর্তাকেও পদত্যাগ
ঘটনাটি আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার ও ভিসির ব্যক্তিগত সহকারী মো: নাজমুল হোসাইনের পদত্যাগের ঘটনায়।
নাজমুলের অভিযোগ, তাকেও মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয় এবং পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। তিনি জানান, ঘটনার সময় কয়েকজনের হাতে অস্ত্রসদৃশ বস্তু ছিল এবং তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। তার অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যালয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন। পরে পুলিশ সেখানে অবস্থান নেয়।
ভিসির পদত্যাগপত্রে ‘পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণে’ দায়িত্ব পালন সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই কারণ দেখিয়ে নাজমুলও অব্যাহতির আবেদন করেন।
সিসিটিভির হার্ডডিস্ক গেল কোথায়?
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো- অভিযোগ অনুযায়ী ভিসির কার্যালয় থেকে শুধু পদত্যাগপত্র নেয়া হয়নি; সিসিটিভির হার্ডডিস্ক ও কম্পিউটারের কিছু সরঞ্জামও খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
নাজমুল হোসাইন অভিযোগ করেছেন, সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক নিয়ে যাওয়ায় ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ ভিডিওফুটেজও চলে যেতে পারে। অন্য কয়েকটি প্রতিবেদনে কম্পিউটারের সিপিইউ ও সিসিটিভিসংক্রান্ত যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেয়ার অভিযোগও এসেছে। পাশাপাশি কার্যালয় ও ক্যাম্পাসের বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এই অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কারা কখন ভবনে প্রবেশ করেছে, কারা ভিসির কক্ষে গেছে, কে পদত্যাগপত্র নিয়ে এসেছে এবং কে কিভাবে বের হয়েছে- এসব প্রশ্নের উত্তর ভিডিওফুটেজেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে পাওয়া সম্ভব। তাই সিসিটিভি হার্ডডিস্ক সরিয়ে নেয়ার অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত এবং কোনো ব্যাকআপ সার্ভার বা অন্য ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
মামলায় ৫০-৬০ জন, গ্রেফতার ১
ঘটনার রাতে রামেবির সেকশন অফিসার ও ভিসির পিএস নাজমুল হোসাইন রাজপাড়া থানায় মামলা করেন। মামলায় ৫০ থেকে ৬০ অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মামলার তদন্তে আবদুস সালাম নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ করে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে এবং অন্যদেরও শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে গ্রেফতার আবদুস সালামকে স্থানীয় বিএনপি নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় বিএনপি নেতারা বলছেন- এটি বিএনপির কোনো আনুষ্ঠানিক দলীয় কর্মসূচি ছিল না। তবে ‘ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিএনপির কিছু নেতাকর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে স্বীকারোক্তি এসেছে।
বিএনপির মহানগরীর জ্যেষ্ঠ নেতাদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়োগবাণিজ্য, দুর্নীতি, অনিয়ম ও ঠিকাদারি নিয়ে অভিযোগ থাকায় স্থানীয়ভাবে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। তাদের দাবি, ভিসি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন বলে তারা শুনেছেন।
অন্য দিকে ভিসির অভিযোগ হলো, তাকে রাজনৈতিক পরিচয়ের অপবাদ দিয়ে ভয় দেখিয়ে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে।
ঠিকাদারি কি ঘটনার নেপথ্যে?
রামেবিকে ঘিরে আগেও ভিসির পদত্যাগের দাবিতে কর্মসূচি হয়েছে। এসব কর্মসূচির পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ ও ঠিকাদারি নিয়ে স্থানীয় অসন্তোষের কথা সামনে এসেছে। স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ ছিল, নির্মাণকাজের সুযোগ ঢাকার ঠিকাদারদের দেয়া হচ্ছে। অন্য দিকে ভিসির পক্ষ থেকে আগে অভিযোগ করা হয়েছিল, একটি পক্ষ ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল।
আইনি বৈধতার প্রশ্ন
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- চাপ প্রয়োগ করে নেয়া পদত্যাগপত্র আইনগতভাবে কতটা কার্যকর? সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ আদালতের একটি মামলায় জোর করে নেয়া পদত্যাগপত্রের বৈধতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এসেছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গোলামনবী মডেল পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: আলকাছ উদ্দিন আহমেদের মামলায় হাইকোর্ট জোরপূর্বক নেয়া পদত্যাগপত্রের আইনগত বৈধতা না থাকার বিষয়ে রায় দেন এবং তাকে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন।
তবে ওই মামলাটি একজন স্কুলশিক্ষকের চাকরিসংক্রান্ত এবং রামেবির ভিসির নিয়োগের আইনগত কাঠামো ভিন্ন হতে পারে। ফলে ওই রায়ের নীতি সরাসরি রামেবির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা নির্ভর করবে ভিসির নিয়োগের শর্ত, প্রযোজ্য আইনবিধি এবং পদত্যাগের প্রকৃত পরিস্থিতির ওপর। সুতরাং রামেবির ক্ষেত্রে পদত্যাগপত্রটি স্বেচ্ছায় দেয়া হয়েছিল, নাকি ভয়ভীতি বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নেয়া হয়েছিল- এই প্রশ্নের উত্তরই আইনি অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
রাজনৈতিক দায় কার?
ঘটনার পর একজন স্থানীয় বিএনপি নেতার গ্রেফতার রাজনৈতিক প্রশ্নটিকে আরো সামনে এনেছে। একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়ায় এটি দলীয় সিদ্ধান্তে ঘটনাটি ঘটেছে কি না- এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে।
তদন্তে সামনে আসছে- কারা আগে থেকে পদত্যাগপত্র তৈরি করেছিল; কে সেটি উপাচার্যের কাছে নিয়ে যায়; কারা তাকে ঘেরাও করেছিল; কারা নাজমুল হোসাইনকে হেনস্তা করেছে; কারা সিসিটিভির হার্ডডিস্ক বা কম্পিউটার সরিয়েছে; কার নির্দেশে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল; ঘটনার আগে কারা কার সাথে যোগাযোগ করেছিল; স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা কী ছিল এবং কোনো দলীয় বা প্রভাবশালী মহল ঘটনাটিকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন করেছিল কি না।
প্রশাসনের জন্যও বড় পরীক্ষা
রামেবির ঘটনা শুধু একজন ভিসির ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়। এটি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে এনেছে। একজন ভিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী বা স্থানীয় নাগরিকদের প্রতিবাদের অধিকার আছে। কিন্তু সেই প্রতিবাদ কখন প্রশাসনিক কার্যালয়ে জবরদখল, অবরোধ, হুমকি বা বলপ্রয়োগে রূপ নেয়- সেখানেই রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের দায়িত্ব শুরু হয়।
একই সাথে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা যেমন জরুরি, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের কাছে জিম্মি না করাও জরুরি।
রামেবির ঘটনায় তাই দু’টি তদন্ত সমান্তরালে হওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, ভিসি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জোর করে পদত্যাগ করানোর অভিযোগ। দ্বিতীয়ত, ভিসির পক্ষ থেকে এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা টেন্ডার, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। সবশেষে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কল ও যোগাযোগের তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, পদত্যাগপত্রের প্রস্তুতির সময় ও উৎস এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করলেই হয়তো বেরিয়ে আসবে ৬ অক্টোবরের সেই কয়েক ঘণ্টার প্রকৃত চিত্র। কার নির্দেশে পদত্যাগপত্র প্রস্তুত হয়েছিল, কারা তা নিয়ে গিয়েছিল এবং কারা ভিসিকে স্বাক্ষরে বাধ্য করেছিল- এই তিন প্রশ্নের উত্তরই এখন রামেবি ঘটনার মূল রহস্য।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








