
ফরিদপুরের বোয়ালমারীর নদী, খাল-বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়ে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে চায়না দুয়ারি জাল। এই জালে রেণু-পোনা থেকে শুরু করে ডিমওয়ালা মা-মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণি নির্বিচারে ধ্বংস হচ্ছে। এতে একদিকে কমে যাচ্ছে দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়ছে জলজ জীববৈচিত্র্য। দিনের পর দিন চায়না দুয়ারির ব্যবহার বাড়লেও এর বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধে উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের কার্যকর তৎপরতা না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকার প্রায় প্রতিটি প্রাকৃতিক জলাধারেই ছড়িয়ে পড়েছে চায়না দুয়ারির ব্যবহার। চন্দনা-বারাশিয়া, কুমার ও মধুমতী নদীর বিভিন্ন অংশে বাঁশের খুঁটি পুঁতে সারিবদ্ধভাবে এসব জাল বসানো হচ্ছে। নদীর তলদেশে মাটির সাথে মিশিয়ে রাখা জালে স্রোতের উজান ও ভাটি উভয় দিক থেকে আসা মাছ আটকা পড়ে। পাশাপাশি পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের দাদুড়িয়া বিল, গুনবহা ইউনিয়নের পুটিমারি বিল, ময়না ইউনিয়নের আষাঢ়ে বিল, রূপাপাত ইউনিয়নের প্লাবনভূমি ও জলমহাল, বোয়ালমারী সদর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের খাল-বিল এবং রূপাপাত ও শেখর ইউনিয়নের মধ্যবর্তী সংযোগ খালগুলোতেও এর ব্যবহার বেড়েছে।
মৎস্যসংশ্লিষ্টদের মতে, চায়না দুয়ারি এক ধরনের অতিসূক্ষ্ম ফাঁসযুক্ত রিং-ভিত্তিক টানেল ফাঁদ। স্থানীয়ভাবে এটি ম্যাজিক জাল, রিং জাল বা ঢলুক জাল নামেও পরিচিত। আকারভেদে এসব জালের দৈর্ঘ্য ৫০ থেকে ১০০ ফুট এবং উচ্চতা প্রায় এক থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর লোহার ফ্রেম থাকায় পানির নিচে জালটি দীর্ঘ সময় স্থির ও বিস্তৃত অবস্থায় থাকে। ফলে মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন জলজ প্রাণিও এতে আটকা পড়ে।
চায়না দুয়ারির অতিসূক্ষ্ম ফাঁসের কারণে কই, শিং, মাগুর, টেংরা, পাবদা, বোয়াল, আইড়, শোল, টাকি, বাইম, পুঁটি, মলা ও ঢেলাসহ দেশীয় মাছের রেণু-পোনা পর্যন্ত রক্ষা পাচ্ছে না। একই সাথে ব্যাঙ, কুঁচিয়া, জলজ সাপ, শামুক, কাঁকড়া ও বিভিন্ন জলজ কীটপতঙ্গও আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। এতে জলাশয়ের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশগত ভারসাম্য ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জলাশয়ে চায়না দুয়ারির ব্যবহার বাড়লেও বাজার পর্যায়ে এর বিক্রি বন্ধে কার্যকর নজরদারি নেই। বোয়ালমারী পৌরসভা ও আশপাশের বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রকাশ্যেই এসব জাল বিক্রি ও গুদামজাত করা হচ্ছে বলে তাদের দাবি। নিয়মিত বাজার পরিদর্শন ও মনিটরিং না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগ নিচ্ছেন। ফলে প্রতিদিন নতুন নতুন চায়না দুয়ারি জাল নদী-খাল-বিলে নামছে।
পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের রামায়ণ রাজবংশী বলেন, ‘একসময় নদীতে সাধারণ খেপলা বা টানা জাল ফেললেই পরিবারের খাবারের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রির মতো প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু গত কয়েক বছরে চায়না দুয়ারির ব্যবহারের পর থেকে বিল ও নদীতে প্রাকৃতিক মাছের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এখন পেশাদার জেলেরা সাধারণ জাল নিয়ে সারাদিন পরিশ্রম করেও এক কেজিও দেশীয় ছোট মাছ সংগ্রহ করতে পারছেন না।’
চতুল গ্রামের ওমর আলী জানান, শুধু জলাশয়ে অভিযান চালিয়ে জাল জব্দ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এসব জালের বিক্রয়কেন্দ্র ও সরবরাহের উৎস চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি নদী, খাল-বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়ে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সাথে জেলেদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ জরুরি।
এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা পবিত্র কুমার দাস বলেন, ‘গত মাসের ৩০ তারিখ একটি অভিযান পরিচালনা করেছি। আপনারা জানেন আমাদের লোকবল কম, তারপরও আগামীকাল থেকে মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান চলবে। এ সাথে চায়না দুয়ারী উদ্ধার ও বিভিন্ন নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে অভিযান চালানো হবে।’
বোয়ালমারীর ইউএনও এস এম রকিবুল হাসান বলেন, ‘মৎস্য বিভাগ ইতোমধ্যেই একটি অভিযান চালিয়ে কিছু জাল জব্দ করেছে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক দুদিনের মধ্যে অভিযান পরিচালনা করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এছাড়া চায়না দুয়ারী জাল ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে কেউ যুক্ত থাকলে আমাদের অবিহিত করুন, আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








