১৯৩ ম্যাটস শিক্ষার্থীকে জালিয়াতি করে ভর্তি কোটিপতি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইমরুল

হামিম উল কবির

Advertisement

ভর্তি বাণিজ্যে কোটিপতি বনে গেছেন রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আওয়ামী লীগ নেতা মো: ইমরুল কায়েস। রাজধানীর তিন মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস) প্রতিষ্ঠানে ১৯৩ শিক্ষার্থীকে রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তি করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অবশ্য এই অভিযোগে তদন্তের মাধ্যমে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ইমরুল কায়েস অর্থের বিনিময়ে ভর্তি করেছেন বলে উচ্চপর্যায়ের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ থেকে জানা গেছে, আগামী বোর্ড সভায় ওই ১৯৩ ম্যাটস শিক্ষার্থীর শাস্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। তবে বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। 
এদিকে সাবেক এক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সহযোগী ইমরুল কায়েসের দাপট কিন্তু এখনো কমেনি, এখনো বাাইরে থেকেই স্ট্যাট মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টিতে দাপট দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন, নানাভাবে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মরতদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মো: ইমরুল কায়েসকে সহযোগিতা করেছেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেহানা পারভীন। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইমরুল কায়েস যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতি করে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করিয়েছেন, সেই প্রতিষ্ঠানগুলো তার স্ত্রী তানজিনা খানের মালিকাধীন।
ওই তিন প্রতিষ্ঠান হলো মিরপুরের শেওড়াপাড়ার ট্রমা সেন্টার অব মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ট্রমা সেন্টার), ট্রমা ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল টেকনোলজি (ট্রমা আইএমটি) এবং শ্যামলীর শ্যামলী ম্যাটস। শিক্ষার্থীদের কয়েকজন ইতোমধ্যে তাদের মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস) কোর্স শেষ করে পরীক্ষা দিয়েছেন, আবার অনেকেই দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। উল্লেখ্য, সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীকে কেন্দ্রীয়ভাবে ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় বসতে হয়। শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ  শিক্ষার্থীরাই ম্যাটসে ভর্তি হয়ে পড়ার সুযোগ পান। 
রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের সূত্রে জানা গেছে, ট্রমা ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল টেকনোলজিতে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ৩৩ জন এবং ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ৫২ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। ট্রমা মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ২৪ জন ও ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ২২ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন একই কায়দায়। অন্যদিকে শ্যামলী মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ৪১ জন এবং ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ২২ জন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই ভর্তি হন। 
রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইমরুল কায়েসের স্ত্রী তানজিনা খান উল্লিখিত তিনটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। এই তিনটি ম্যাটস স্কুলের শেয়ারের মালিক হয়ে তিনি এগুলোর পরিচালক হয়েছেন। ইমরুল কায়েস প্রভাব খাটিয়ে তার নিজের প্রতিষ্ঠানের এসব ছাত্র-ছাত্রীকে ভর্তি করিয়ে নেন। এই কাজে সহযোগিতা করে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন এবং এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক সচিব ডা. জাহিদুর রহমান।
তদন্ত কমিটির শুনানিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসক অনুষদের সাবেক সচিব ডা. মো: জাহিদুর রহমানও ইমরুল কায়েসের জালিয়াতির স্বীকারোক্তি দেন। তিনি তদন্ত কমিটিকে জানান, ‘ট্রমা ম্যাটস, ট্রমা আইএমটি ও শ্যামলী ম্যাটস জালিয়াতি করে থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে তারা যেসব উত্তীর্ণ রোল নম্বরের ছাত্র-ছাত্রী অন্য কোথাও ভর্তি হয়নি, তাদের রোল নম্বর ব্যবহার করে থাকতে পারে।’ 
রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের সাবেক সচিব বিগত আওয়ামী আমলের নিয়োগ পাওয়া। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে বুঝতে পেরে তিনি ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর পদত্যাগ করে চলে যান। ইমরুল কায়েসের জালিয়াতির সহযোগী হিসেবে ডা. জাহিদুর রহমানকেও মনে করা হয়।
ব্যাপারটি জানাজানি হলে এটা নিয়ে গঠিত তদন্তে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইমরুল কায়েসকে ইতোমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ইমরুল কায়েস যে শুধুমাত্র ম্যাটস শিক্ষার্থীদের অবৈধভাবে ভর্তি করিয়ে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন তা নয়, চট্টগ্রামে একটি নার্সিং কলেজ স্থাপনের লক্ষ্যে সৈয়দ জাহেদ হোসাইন নামক একজন উদ্যোক্তার কাছ থেকে ঘুষ দাবি করেন এবং দাবিকৃত অর্থের আংশিক গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ আব্দুল কাদেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত তদন্তে উঠে এসেছে।  বিষয়টি নিয়ে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি, চূড়ান্ত তদন্তের পর ১৯৩ জন শিক্ষার্থীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে এবং ইমরুল কায়েসকেও পুরোপুরি বরখাস্ত করা হতে পারে। 
বিষয়টি সম্বন্ধে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি গতকাল বুধবার নয়া দিগন্তকে জানান, এ বিষয়টি সম্বন্ধে বিস্তারিত জানে মেডিক্যাল এডুকেশন বিভাগ। সেখানে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি। পরে মেডিক্যাল এডুকেশন বিভাগে যোগাযোগ করা হলে সহকারী পরিচালক ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘স্ট্যাট মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টির পরিচালনা পরিষদের সভায় যেসব প্রতিষ্ঠান জালিয়াতি করে শিক্ষার্থী ভর্তি করেছে তাদের অনুমোদন বাতিল করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তা ছাড়া বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে, দুদকই হয়তো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে। অভিযুক্ত মো: ইমরুল কায়েস বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন, এ বিষয়ে তিনি কথা বলতে চান না।