ইরানের এনপিটি ত্যাগের ভাবনায় মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা

 আরটির বিশ্লেষণ 
পারমাণবিক অপ্রসারণ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বের হয়ে আসার বিষয়ে তেহরানের নীতিনির্ধারক মহলে জোরালো চিন্তাভাবনা চলছে। অনবরত পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক আগ্রাসনের হুমকি ও চুক্তির আন্তর্জাতিক শর্ত বারবার লঙ্ঘিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ইরান এখন খতিয়ে দেখছে যে, আন্তর্জাতিক এই সনদে বহাল থাকা তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কোনো কাজে আসছে কি না। বিশ্ব রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা, তেহরান যদি শেষ পর্যন্ত সনদটি থেকে বেরিয়ে যায়, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিতে পারে। 
পারমাণবিক অপ্রসারণ চুক্তি থেকে সরে আসার বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বের সাথে আলোচনার বিষয়টি সম্প্রতি প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। ফলে সরকারিভাবে বিষয়টি স্বীকার করার পর একে আর কেবল উগ্রপন্থী রাজনৈতিক অংশগুলোর ফাঁকা হুমকি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে বাকাই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তির প্রতি তেহরানের শ্রদ্ধাশীল থাকার বার্তা পুনর্ব্যক্ত করলেও চুক্তি ত্যাগের সঙ্কেত স্পষ্ট করে দিয়েছেন। ইরানি কর্তৃপক্ষের প্রধান ক্ষোভ হলো, তারা নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ বলে জানালেও এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে একাধিক ক্ষেত্রে ছাড় দিলেও প্রাপ্য সুবিধা ও আইনগত অধিকার থেকে তাদের অনবরত বঞ্চিত করা হচ্ছে। ফলে ১৯৬৮ সালে প্রণীত এনপিটি কাঠামোর ভারসাম্য- যেখানে অ-পারমাণবিক দেশগুলো পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ থেকে বিরত থাকার বিনিময়ে শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের আন্তর্জাতিক অধিকার পাবে; তা তেহরানের দৃষ্টিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তারা অভিযোগ করছে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের সুযোগ নিয়ে তাদের মৌলিক অধিকার ও প্রযুক্তির বিকাশকে রুদ্ধ করার একটি প্রবণতা দৃশ্যমান। 
এই আস্থার সঙ্কট চরম আকার ধারণ করে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতা (জেসিপিওএ) ভেঙে পড়ার পর। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) শর্তাবলি পুরোপুরি মেনে চলা সত্ত্বেও ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায় এবং নজিরবিহীন আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। শর্ত পালনের পরও এমন বৈরী আচরণের তিক্ত অভিজ্ঞতা ওয়াশিংটনের সাথে নতুন কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে তেহরানকে চরম সংশয়ে রেখেছে। তা ছাড়া আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতা এ সংশয়কে আরো তীব্র করেছে। আন্তর্জাতিক তদারকিতে থাকা সত্ত্বেও দেশটির একাধিক পরমাণু স্থাপনায় নাশকতামূলক হামলা চালানো হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে এনপিটির সদস্য হওয়া কোনো সামরিক নিরাপত্তার জামানত দেয় না। অন্য দিকে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার চরম ভারসাম্যহীনতা লক্ষ করা যায়; প্রতিবেশী দেশ ইসরাইল এনপিটি চুক্তিতে সই না করেও আইএইএর কোনো বাধ্যবাধকতা ছাড়াই অবাধ পারমাণবিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। ইসরাইলের অনিয়ন্ত্রিত সুবিধার বিপরীতে এনপিটির সদস্য হয়েও ক্রমাগত চাপের মুখে থাকা তেহরানের অভ্যন্তরে চুক্তি বিরোধীদের হাতকে আরো শক্তিশালী করেছে।

Advertisement