অব্যাহত মার্কিন সহায়তায় গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের ৩ বছর

আলজাজিরা
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় শুরু হয় ব্যাপক ইসরাইলি আগ্রাসন। এরপর প্রায় তিন বছর ধরে চলা বিমান ও স্থল হামলায় অবরুদ্ধ উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বাড়িঘর, সড়ক, হাসপাতাল ও অন্যান্য অবকাঠামোর বড় অংশই আজ নিশ্চিহ্ন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ইসরাইলি হামলায় গত তিন বছরে ৭৪ হাজার ২৪৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়া হলেও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও এক হাজার ৪৬২ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ফলে প্রায় ২০ লাখ মানুষের এই ভূখণ্ডে স্বাভাবিক জীবনযাপন এখন বহু দূরের বিষয়।
গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকার তিন বছর পার হলেও ওয়াশিংটনের কৌশলগত নীতি কিংবা সহায়তার ধারায় দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন থেকে শুরু করে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প- উভয় প্রশাসনের সময়ই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরাইলকে বিনাশর্তে সামরিক সহযোগিতা জুগিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সঙ্ঘাত এবং ইরান ও মার্কিন-ইসরাইল মুখোমুখি অবস্থানের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেও এই বিপুল অস্ত্র ও অর্থ প্রবাহে কোনো ছন্দপতন ঘটেনি। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর টানা সামরিক তৎপরতা, গত বছরের সাময়িক যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘন এবং ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে স্থায়ী শান্তির পথ রুদ্ধ করার পদক্ষেপ নিয়ে মার্কিন প্রশাসন একাধিকবার মৃদু অসন্তোষ জানালেও সামরিক সহযোগিতার হাত সঙ্কুচিত করেনি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সাবেক কর্মকর্তা ও নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এ নিউ পলিসি’-র প্রধান জশ পল জানান, বাইডেন ও ট্রাম্প- দুই ভিন্ন রাজনৈতিক দলের আমলেই অর্থ, অস্ত্র ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ইসরাইলকে একচেটিয়া সুরক্ষা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন বাহিনীর যে বিশাল সামরিক ব্যয় হচ্ছে, তার প্রধান কারণও ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও দেশটির নেয়া নানামুখী পদক্ষেপ।
সামরিক সহায়তার চিত্র
কয়েক দশক ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে বিপুল পরিমাণ সহায়তা ও মার্কিন তৈরি আধুনিক অস্ত্র কেনার অনন্য সুবিধা দিয়ে আসছে। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলের অভিষেকের পর থেকে মুদ্রাস্ফীতির হিসাব সমন্বয় করে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দিয়েছে ওয়াশিংটন, যা বিশ্ব ইতিহাসে অন্য যেকোনো দেশের প্রাপ্তির চেয়ে বেশি। ২০০৮ সালে প্রণীত একটি আইন মার্কিন সরকারকে বাধ্য করে যাতে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় থাকে। এই আইনি বাধ্যবাধকতার ফলে পেন্টাগন ও ইসরাইলি বাহিনীর মধ্যে সুদৃঢ় মেলবন্ধন গড়ে উঠেছে। ইসরাইলের বিমান বাহিনী, অত্যাধুনিক গোলাবারুদ, সাঁজোয়া যান ও ট্যাংক থেকে শুরু করে আয়রন ডোম, ডেভিডস স্লিং এবং আয়রন বিমের মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য তারা মার্কিন প্রযুক্তির ওপর পুরোদমে নির্ভরশীল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-সহ বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহুবার বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর মার্কিন অস্ত্রের বিধ্বংসী ব্যবহারের অকাট্য নথি প্রকাশ করেছে। তবে স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের গাজায় প্রবেশে বাধা দিয়ে চলেছে ইসরাইল। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম হারটুং উল্লেখ করেন, গাজায় চলমান ভয়াবহ গণহত্যার মধ্য দিয়ে আমেরিকা যেভাবে নিয়মিত অস্ত্র সরবরাহ চালিয়ে যাচ্ছে, তার ফলে সাধারণ মানুষ হত্যার দায় মার্কিন সরকারের ওপরও সমানভাবে বর্তায়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে মার্কিন বাজেটে ইসরাইলের জন্য অন্তত ২৫.৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
২০১৬ সালে বারাক ওবামা মেয়াদের ১০ বছর মেয়াদী সমঝোতার অধীনে নির্ধারিত বার্ষিক ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক বরাদ্দ অব্যাহত রয়েছে। এর পাশাপাশি ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ অর্থবছরের নিয়মিত বরাদ্দের সাথে যোগ হয়েছে ২০২৪ সালের এপ্রিলে অনুমোদিত ১৪.১ বিলিয়ন ডলারের জরুরি নিরাপত্তা সহায়তা।

Advertisement