৬ লাখ টন সার আমদানিতে বিশ্বব্যাংকের ৩০ কোটি ডলারের ঋণ

বিশেষ সংবাদদাতা

Advertisement

সার আমদানি করতে বাংলাদেশকে ৩০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা দিচ্ছে বিশ^ব্যাংক। ‘জরুরি খাদ্য নিরাপত্তা সহায়তা প্রকল্পের’ আওতায় এই অর্থ প্রদান করা হচ্ছে। এই জন্য বাংলাদেশের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও বিশ^ব্যাংকের পক্ষ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাজেন্সি’র (আইডিএ) মধ্যে গত সোমবার একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। 
চুক্তি অনুযায়ী ঋণের পরিমাণ ২১ কোটি ৯২ লাখ বিশেষ ড্রয়িং রাইটস (এসডিআর), যা বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ৩০ কোটি ডলার। পুরো অর্থ শুধু সার আমদানিতে খরচ করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী আমদানি হবে ৬ লাখ মেট্রিক টন সার, যার অর্ধেক ইউরিয়া। এতে প্রায় ১৪ লাখ হেক্টর ধানী জমিতে ধান চাষে সুবিধা হবে। চুক্তিতে অনুমোদিত সারের তালিকায় আছে ইউরিয়া ও ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি)। আইডিএর সম্মতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় (পিআইপি) অন্য সারও যুক্ত হতে পারে।
 জানা গেছে, আমন (জুলাই-অক্টোবর ২০২৬) ও বোরো (অক্টোবর ২০২৬-এপ্রিল ২০২৭) মৌসুমের জন্য এই অর্থ ব্যবহার করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য, দুই মৌসুম মিলে দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে। বাংলাদেশ ৮৫ শতাংশের বেশি সার আমদানি করে থাকে, তাই সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। 
ঋণের শর্ত
ঋণটি ‘কনসেশনাল’, অর্থাৎ বাজারদরের চেয়ে সহজ শর্তের ঋণ এটি
সুদ : উত্তোলিত অর্থের ওপর বার্ষিক ১.৫ শতাংশ; অব্যবহৃত অর্থের ওপর সর্বোচ্চ ০.৫ শতাংশ কমিটমেন্ট চার্জ প্রযোজ্য হবে। 
পরিশোধ : ২০৩১ সালের ১৫ জুলাই থেকে ২০৫১ সালের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি ছয় মাসে ২.৫ শতাংশ করে, মোট ৪০ কিস্তিতে। অর্থাৎ প্রায় পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ডের পর ২০ বছরে শোধ।
সময়সীমা : চুক্তি কার্যকর হওয়ার সর্বশেষ সময় স্বাক্ষরের ৯০ দিন পর (জানুয়ারি ২০২৭-এর শুরু)। প্রকল্পের মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত
জানা গেছে, অর্থ বিভাগের অধীনে একটি প্রকল্প সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনা ইউনিট (পিসিএমইউ) গঠন করতে হবে। আমদানি করবে বিসিআইসি ও বিএডিসি, যাদের সাথে সরকারকে সহায়ক চুক্তি করতে হবে। সব সরবরাহ চুক্তি আইডিএর আগাম পর্যালোচনা ও অনুমোদনের আওতায় থাকবে এবং প্রতিটি সরবরাহকারীকে দুর্নীতিবিরোধী নির্দেশিকা মানার লিখিত অঙ্গীকার দিতে হবে। কার্যকর হওয়ার এক মাসের মধ্যে পিআইপি তৈরি করতে হবে, যেখানে সার আমদানি যাচাইয়ের পদ্ধতি, বৈধ সারের তালিকা, প্রতারণা-দুর্নীতি দমন ও উপকারভোগী চিহ্নিতকরণের কাঠামো থাকবে। পরিবেশ-সামাজিক অঙ্গীকার পরিকল্পনা (ইএসসিপি), অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ব্যবস্থাও বাধ্যতামূলক। জমি, যানবাহন, ভাতা, জ্বালানি, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন এবং ঋণের ১৫ শতাংশের বেশি কর সরকারকে নিজ তহবিল থেকে মেটাতে হবে। টানা ১২ মাস অর্থ না তুললে এবং অগ্রগতি না থাকলে আইডিএ অব্যবহৃত অর্থ বাতিল করতে পারে।
পশ্চাদমুখী অর্থায়ন
চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ধারাগুলোর একটি হলো পশ্চাদমুখী অর্থায়ন। ২০২৬ সালের ১ মার্চ থেকে স্বাক্ষরের আগে পরিশোধ হওয়া সার আমদানির ব্যয় থেকে সর্বোচ্চ ৮ কোটি ৭৬ লাখ ৮০ হাজার এসডিআর (ঋণের ৪০ শতাংশ) এই ঋণ থেকে তোলা যাবে। অর্থাৎ ঋণের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে কেনা সারের দাম মেটাতে ব্যবহার করা যাবে, নতুন সরবরাহ বাড়াতে নয়। 
এ দিকে বিশ্লেষকরা এই ঋণের বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তারা বলেছেন, আমন মৌসুম প্রায় শেষ, বোরোর সার-চাহিদা শীর্ষে ওঠে সাধারণত ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু পিসিএমইউ ও পিআইপি তৈরির বাধ্যবাধকতা চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর শুরু হবে। নতুন ক্রয় ও আগাম অনুমোদন এই সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা চ্যালেঞ্জ।
এ ছাড়া এই প্রকল্পের সুফল কৃষকের কাছে পৌঁছাবে কি না, তা নির্ভর করবে ডিলার-পর্যায়ের ব্যবস্থার ওপর। সরকারি সারের মজুদ, কৃত্রিম সঙ্কট ও সীমান্ত পাচারের অভিযোগ অতীতে উঠেছে। আমদানি বাড়লেও বিতরণ দুর্বল থাকলে প্রভাব সীমিত হবে।
 ঋণের ৩০ কোটি ডলার দিয়ে ৬ লাখ টন সার কিনলে গড় ব্যয় টনপ্রতি প্রায় ৫০০ ডলার দাঁড়ায়। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইআরডির এক কর্মকর্তা এই ঋণের বিষয়ে বলেছেন, শর্তের দিক থেকে ঋণটি অনুকূল : কম সুদ, দীর্ঘ মেয়াদ, গ্রেস পিরিয়ড এবং নির্দিষ্ট কাজে ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা। আমদানির লক্ষ্য পূরণের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। কিন্তু প্রান্তিক কৃষকের কাছে সুফল পৌঁছানো নির্ভর করবে সময়মতো সরবরাহ, স্বচ্ছ ক্রয় ও কার্যকর বিতরণের ওপর।