রাজনীতির মাঠে নতুন সমীকরণ ও টানাপড়েন

খালিদ সাইফুল্লাহ

Advertisement

জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ও কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশের নতুন ডালপালা মেলছে। একসময়ের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কের সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ নতুন রূপ নিয়েছে। এক দিকে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপির রাজপথ ও কৌশলী অবস্থান, অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ১১ দলীয় ঐক্যের নতুন রাজপথমুখী তৎপরতা- সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতির দৃশ্যপটে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের টানাপড়েন। এ পটভূমিতে আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা-যশোর হয়ে কুষ্টিয়া অভিমুখে ১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত লংমার্চ কর্মসূচিটি ক্ষমতার ভারসাম্য ও আগামী দিনের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে এক নতুন বার্তা বহন করছে।
বিরোধী শিবিরের শক্তিপ্রদর্শনের নতুন ক্ষেত্র
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য আগামী ৩১ অক্টোবর ‘ঢাকা-খুলনা-যশোর-কুষ্টিয়া’ অভিমুখে এক বিশাল লংমার্চের ডাক দিয়েছে। নির্ধারিত দিন সকালে রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে এ কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলো অতিক্রম করে কুষ্টিয়ায় এক সুবিশাল সমাবেশের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
সাত দফা দাবি আদায়, নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি রোধ এবং রাজনৈতিক নেতাদের ওপর দমন-পীড়নের প্রতিবাদে কর্মসূচিটি দেয়ার কথা বলা হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত রাজপথে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তির শক্তিপ্রদর্শনের মহড়া। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-রংপুর কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় নতুন এই রুটে আন্দোলন নিয়ে নামার মধ্য দিয়ে ইসলামপন্থী ও সমমনা এ জোটটি প্রমাণ করতে চায়- রাজপথের রাজনীতিতে তারা কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয়।
বিএনপি ও জামায়াত : সহযাত্রী থেকে তীব্র ক্ষমতার সঙ্ঘাত
এককালের রাজপথের ঘনিষ্ঠ মিত্র বিএনপি ও জামায়াতের নীতি ও কৌশলে এখন স্পষ্ট ও প্রকাশ্য বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপট ও জুলাই সনদ স্বাক্ষরসহ জাতীয় রাজনীতির নানা বাঁকে দুই দলের আদর্শিক এবং কৌশলগত পার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে।
বিএনপির অবস্থান ও উদ্বেগ
জাতীয় রাজনীতিতে মূল নিয়ামক ভূমিকা রাখা এবং দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই বিএনপির প্রধান কৌশল। জামায়াত ও তাদের শরিক জোটের ঘনঘন মাঠপর্যায়ের আন্দোলনকে বিএনপি নেতারা দেশের উদীয়মান অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। তাদের মতে, বাস্তবসম্মত কারণ ছাড়া রাজপথে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা রাজনীতিতে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে।
জামায়াত ও ১১ দলের চ্যালেঞ্জ 
বিপরীতে, জামায়াতে ইসলামী রাজপথ ও সংসদ- উভয় ময়দানেই বিএনপিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে নিজেদের শক্তিশালী ‘রাজনৈতিক বিকল্প’ হিসেবে দাঁড় করাতে চায়। ১১ দলীয় ঐক্যের ছায়াতলে এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টির মতো দলগুলোকে সাথে নিয়ে তারা বিএনপিকে মাঠের রাজনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়ার ছক কষছে। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে দুই দলের কর্মী-সমর্থকদের উসকানিমূলক বক্তব্য ও মুখোমুখি অবস্থান রাজনীতিকে ক্রমাগত উত্তপ্ত করে তুলছে।
সরকারের কৌশল ও নজরদারি 
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ও দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় বৃদ্ধিতে জনমনে ক্রমেই ক্ষোভ বাড়ছে। এ কারণে রাজনীতিতে নতুন এ সমীকরণকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। বর্তমানে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হলো দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এজন্য সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-যশোর-কুষ্টিয়া লংমার্চকে কেন্দ্র করে কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আন্দোলন যেন কোনোভাবেই হিংসাত্মক রূপ না নেয় বা জনজীবনে বড় ভোগান্তি সৃষ্টি না করে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সাথে কৌশলগতভাবে মাঠের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার নীতি গ্রহণ করেছে সরকার।
সব মিলিয়ে, ৩১ অক্টোবরের ঢাকা-কুষ্টিয়া লংমার্চ কেবল সাধারণ কোনো গণসংযোগ কর্মসূচি নয় বরং এটি আগামী দিনের রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব ও অবস্থান সুনির্দিষ্ট করার ক্ষেত্রে ১১ দলীয় ঐক্যের জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষা। অন্য দিকে, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার এই বাড়তে থাকা দূরত্ব বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়, তা সময়ই বলে দেবে।