সাদেক রহমান
মতামত লোগো। নয়া দিগন্ত

ফরাসি ঔপন্যাসিক দোমিনিক লাপিয়েরের ‘সিটি অব জয়’ উপন্যাস হাওড়ার পিলখানা আনন্দনগর বস্তির নিরন্ন, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে উপজীব্য করে রচিত। এই উপন্যাসের মাধ্যমে কলকাতা শহর পশ্চিমা বিশ্বে ‘আনন্দনগর’ বা ‘সিটি অব জয়’ নামের তকমা পেয়ে যায়। উপন্যাসের নাম আনন্দনগর বা সিটি অব জয় হলেও পুরো উপন্যাসে দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। হয়তো ঔপন্যাসিক ব্যঙ্গাত্মকভাবে এই নামকরণ করেছেন। বস্তির নাম আনন্দনগর। আর বস্তিতে বসবাস করে অভাবগ্রস্ত মানুষ। পশ্চিমারা ভারত উপমহাদেশে ব্যবসা করতে এসে প্রায় ২০০ বছর থেকে গিয়েছিল। উপমহাদেশে শোষণ নিপীড়ন করে তারা নিজেদের সমৃদ্ধ করেছে। এ নিয়ে তাদের কোনো অনুতাপ নেই। এখানকার দারিদ্র্য নিয়ে ব্যবসার সুযোগ পেলে কোনোভাবে হাতছাড়া করে না। উপন্যাসটি বিশ্বে প্রায় ৭৪ লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল। 
উপন্যাসে পোলিশ ধর্মযাজক স্তেফান কোভালস্কি একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র; যা বাস্তবের সুইস ব্রাদার গাস্ত যিনি পিলখানা বস্তিতে আসেন ১৯৭১ সালে। ১৯৮০ সালে পরিচয় হয় লাপিয়েরের সাথে। পরবর্তীতে ব্রাদার গাস্ত উপন্যাস নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমি ‘সিটি অব জয়’ লিখতে পারলে দুটো ভারতের কথা লিখতাম, শক্তিশালী ভারত আর কমজোর ভারত। দ্বিতীয়টিতে মুসলিম, আদিবাসী, দলিতদের কথা। যদিও আমাকে প্রতিরোধে পড়তে হবে। ব্রাদার গাস্ত কমজোর বলেছেন, সাহস করে বৈষম্যের শিকার বলেননি। ব্রাদার গাস্তের কথা মিথ্যা প্রমাণের সুযোগ নেই। এটি ভারতের বাস্তবতা। শাসকগোষ্ঠী সাম্য, ন্যায়নীতির কথা বলে মুখে ফেনা তুললেও বাস্তবে ভারতে ন্যায়নীতি দুর্লভ বস্তু! গণতান্ত্রিক বিশ্বে বৈষম্যের অন্যতম বড় উদাহরণ ভারত। জম্মু-কাশ্মিরের আজাদির লড়াই, পাঞ্জাবের খালিস্তান আন্দোলন, আসামের উলফা বিদ্রোহীসহ মনিপুর, নাগাল্যান্ড, মিজোরামের মতো অনেক জায়গায় স্বাধীনতাকামীদের সংগ্রাম অব্যাহত আছে। তাদের আজাদির লড়াই ভারত সরকার শক্ত হাতে দমন করছে। যদিও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের আজাদির লড়াইয়ে ভারত সরকার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।
বর্তমান বিজেপি সরকার হিন্দুত্ববাদের নামে ক্ষমতায় এসে দেশকে মহৎ কি উপহার দিয়েছে? শুধু মুসলমানদের বিরোধিতা করা কী হিন্দুত্ববাদ? বাবরি মসজিদকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসে। বাংলাদেশী মুসলমান ইস্যু কাজে লাগিয়ে আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। সন্দেহ নেই, তীব্র মুসলিমবিরোধী রাজনীতি বিজেপিকে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে। 
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে ন্যূনতম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল; তাও যে ক্রমশ উবে যাচ্ছে! হঠকারী রাজনীতি থেকে মহৎ কিছু আশা করা যায় না। বাস্তবতা হলো— সুশাসন প্রতিষ্ঠা বা ভালো কিছু উপহার দেয়ার কোনো চেষ্টা বিজেপি সরকারের মধ্যে নেই। রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিতে যা যা করা দরকার তাই করে যাচ্ছে। ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতার বাণী তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে থাকলেও বাস্তবে ব্যক্তিগত চরিত্রে বা জীবনযাপনে তার ছিটেফোঁটা প্রভাবও লক্ষ করা যায় না। ধর্মের কোনো কিছু যদি বাস্তব জীবনে অনুসরণ করা না হয় বা চরিত্রে প্রতিফলন না ঘটে; তবে কেন ধর্মের নামে রাজনীতি? ক্ষমতার জন্য ধর্মের ব্যবহার করার এ জাতীয় উদাহরণ আর কোথায় আছে? 
ওয়াক্ফ আইন সংশোধন করে মুসলমানদের হাত-পা বেঁধে ফেলা, মসজিদ-মাদরাসা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া, ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ, বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ, দোকানপাট থেকে উচ্ছেদের মতো ঘটনা যে ক্রমশ বড় আকারের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার রূপ নিচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা কী কেউ করে? 
মনে রাখা দরকার, কেউ অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ হয় না। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের যে ভাবমর্যাদা ছিল, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে হিন্দু ভোটারদের মেরুকরণ প্রক্রিয়া। ধর্মীয় পরিচয়ে বিভাজিত করা। অনুপ্রবেশের ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে নির্বাচনী বৈতরণী পার করা। সরকারের এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের বিশ্বাস ভঙ্গ হয়েছে। আজকে ভারতজুড়ে বিতর্কের কেন্দ্রে নির্বাচন কমিশন। ককরোচদের আন্দোলন যদি ব্যর্থও হয়; তবু সরকারের খুশিতে আত্মহারা হওয়ার কোনো কারণ নেই। এ আন্দোলনের ব্যর্থতা ভারতকে দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জে ফেলতে পারে। এমনকি এটি দেশজুড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদ আরো উসকে দিতে পারে; যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ভারতের রাজনীতিকে ভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে।  ভারতের শাসনতান্ত্রিক দুর্বলতার ইতিহাস কারো অজানা নয়। গজনীর সুলতান মাহমুদের ভারত আক্রমণ, তুর্কি সেনাপতির ভারত দখল, পারসিকদের আক্রমণ, আরব ও ইংরেজদের ভারত দখলের মতো ঘটনা ঘটেছিল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দুর্বলতায়। ঐক্যবদ্ধ ভারত রাষ্ট্র হিসেবে নিঃসন্দেহে শক্তিশালী। কিন্তু যদি রাজনৈতিক ঐক্য ও সংহতি রক্ষা করা না যায়, ভারত পৃথিবীর সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর তালিকায় উঠে আসবে। 
ধর্মের ভিত্তিতে বিজেপি ভারতকে রীতিমতো বিভাজিত করে ফেলেছে। কলকাতার মতো শহরকে অস্থিতিশীল করে তোলা হচ্ছে। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারী বলছেন, আম্মা বলা যাবে না, মা ডাকতে হবে। এ জাতীয় বক্তব্য দিয়েই চলেছেন তিনি। এ ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানি বিভাজন সুস্পষ্ট করবে। 
বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ এখনো সাহিত্য-সংস্কৃতির নগর হিসেবে কলকাতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। রবীন্দ্রনাথের শহরও কলকাতা। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লেখক, সাহিত্যিকরা কলকাতায় আসেন সাহিত্য-সংস্কৃতির রস আস্বাদন করতে। এখানে মির্চা এলিয়াদ রচনা করেছিলেন ‘লা নুই বেঙ্গলি’ উপন্যাস। যেটি প্যারিসসহ সারাবিশ্বে সাড়া জাগিয়েছিল। আরো কত কবি সাহিত্যিক এ শহরে বসে কালজয়ী সাহিত্য রচনা করে গেছেন; তার ইয়ত্তা নেই। সেই শহরের সত্যজিৎ ফিল্ম ও টিভি সোসাইটিতে হিন্দুত্ববাদীদের হামলার ঘটনার ঘটেছে। বিজেপি সরকারের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে এ জাতীয় ঘটনা ঘটছে।
পৃথিবীর কোনো দেশে মুসলমানরা মন্দির বা গির্জা ভেঙে ইসলামী রাজনীতির গোড়াপত্তন করেছেন এমন নজির আমাদের জানা নেই। মসজিদ ভেঙে ধর্মীয় রাজনীতির গোটাপত্তন করা বিজেপির রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা ছাড়া কিছু নয়। মসজিদ ভেঙে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন রেখা টেনে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। 
ঐতিহাসিক কলকাতা দাঙ্গার কথা এ উপমহাদেশের মানুষ কখনো ভুলে যাবে না। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট দাঙ্গাবাজরা সেদিন যে রক্তের খেলায় মেতে উঠেছিল ওই ক্ষত ইতিহাসের পাতায় এখনো জ্বলজ্বল করছে। উপমহাদেশের মানুষের মানসপট থেকে তা মুছে যাওয়ার নয়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে সহজে অনুমান করা যায়, দাঙ্গার ইতিহাস কী নিজে আবার ফিরে আসছে? 
লেখক : সাংবাদিক

Advertisement