মেরাজুল ইসলাম
মতামত লোগো। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশের দীর্ঘতম রেলপথ হলো ঢাকা থেকে পঞ্চগড়। দূরত্ব প্রায় ৫৯৩ কিলোমিটার। এ পথে বর্তমানে তিনটি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে— একতা, দ্রুতযান ও পঞ্চগড় এক্সপ্রেস। পথ দীর্ঘ হওয়ায় বাসের তুলনায় মানুষ ট্রেনকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। কিন্তু এই ট্রেনযাত্রায় রয়েছে বেশ কিছু সমস্যা, যার অধিকাংশ তৈরি হয় কৃত্রিমভাবে। সদিচ্ছা থাকলে এসব সমস্যা সমাধান করে ট্রেনযাত্রা সম্পূর্ণ ভোগান্তিহীন ও আনন্দদায়ক করা সম্ভব।
ট্রেনযাত্রা শুরু হয় টিকিট কাটার মাধ্যমে। কিন্তু ঈদ বা পূজার মতো বড় ছুটির সময়ে টিকিট কালোবাজারিরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ টিকিট কাটতে পারে না। অসাধু চক্র আগেই টিকিট কেটে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে এবং পরবর্তীতে চড়া দামে তা বিক্রি করে। এই সমস্যা সমাধানে এনআইডি বা জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে— যার নামে টিকিট, তিনি ছাড়া অন্য কেউ যেন যাতায়াত করতে না পারেন।
ঢাকা-পঞ্চগড় যেহেতু দেশের দীর্ঘতম দূরত্বের ট্রেনযাত্রা, তাই ঘন ঘন ট্রেনের বিরতি দেয়া ঠিক নয়। ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ক্রসিং বাদে একতা এক্সপ্রেস ২২ বার, দ্রুতযান এক্সপ্রেস ২৪ বার এবং পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ৯ বার বিরতি দেয়। এসব ট্রেনের বিরতি বা স্টপেজের সংখ্যা কমালে যাত্রার সময় অনেকটাই কমে আসবে, যা দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের মানুষের ভোগান্তি অনেকাংশেই কমাবে।
অনেক সময় দীর্ঘ বিলম্বের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায় এক লাইনের রেলপথ। একক রেলপথের কারণে ক্রসিংয়ের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটি স্টেশনে ট্রেন থামিয়ে রাখতে হয়। পুরো রেলপথকে ডাবল লাইনে (দ্বিমুখী) রূপান্তর করলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে এবং নতুন ট্রেন চালু করাও সম্ভব হবে।
এ রুটের ট্রেনের কোচ বা বগিগুলোর অবস্থা বেশ নাজুক। একটি কোচে যত আসন থাকা উচিত, তার চেয়ে বেশি আসন বসানো হয়েছে। ফলে জানালার সাথে আসনের বিন্যাস অসঙ্গতিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক আসনে বসে যাত্রীরা জানালার সুবিধা নিতে পারেন না। এ লাইনের প্রতিটি ট্রেনের পুরনো কোচ পরিবর্তন করে আধুনিক কোচ সংযোজন করা দরকার। 
সাধারণত প্রতিটি কোচে ১০৫টি আসন থাকে এবং অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ স্ট্যান্ডিং টিকিট বিক্রি করা হয়। কিন্তু বাস্তবে নির্দিষ্ট সীমার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ কোচে চলাচল করে, যা ট্রেনের আরামদায়ক সুন্দর পরিবেশ নষ্ট করে ফেলে। টিকিট ছাড়া ওঠা যাত্রীদের কাছ থেকে টিটিই বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীরা জরিমানা ছাড়া বা জরিমানাসহ টাকা আদায় করেন। যেকোনো উপায়ে ট্রেনে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ওঠা বন্ধ করতে পারলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব।
ট্রেনে চলাচল করার সময় আরেকটি সমস্যায় পড়তে হয়। বর্তমানে ট্রেনটি ঠিক কোন জায়গায় অবস্থান করছে তা বোঝা যায় না। কিছু ট্রেনে পরবর্তী স্টেশন মাইকে ঘোষণা করা হলেও সব ট্রেনে তা নেই। মেট্রোরেলের মতো আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতেও যদি এলইডি স্ক্রিনে বর্তমান স্টেশন ও পরবর্তী স্টেশনের নাম প্রদর্শন করা হতো, তবে যাত্রীদের জন্য অনেক সুবিধা হতো।
রেলযাত্রার আরেকটি বড় সমস্যা হলো হকার, ভিক্ষুক ও হিজড়াদের উৎপাত। এমনিতেই ট্রেনে আসন ও চলাচলের জায়গা থাকে না, তার ওপর এদের অবাধ বিচরণের কারণে সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক সময় হিজড়ারা যাত্রীদের হেনস্তা করে টাকা আদায় করে। ট্রেনে অননুমোদিত ব্যক্তি বা হিজড়াদের চলাচল ও চাঁদাবাজি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা গেলে ভ্রমণ আরো স্বস্তিদায়ক হতো।
দীর্ঘ দূরত্বের এই ট্রেনগুলোর প্রতিটি কোচের সামনে-পেছনে মিলিয়ে মোট চারটি শৌচাগার বা ওয়াশরুম থাকার কথা। কিন্তু প্রায় সব কোচেই দু’টি ওয়াশরুম সবসময় বন্ধ থাকে, আর বাকি দু’টি থাকে নানা সমস্যায় জর্জরিত। কোনোটিতে পানি নেই, কোনোটিতে লাইট নেই, আবার কোনোটির দরজা বন্ধ হয় না। এত দীর্ঘ ভ্রমণে ওয়াশরুম ব্যবহার করা অপরিহার্য। তাই বাংলাদেশ রেলওয়ের উচিত দ্রুততম সময়ে শৌচাগারগুলো পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহার উপযোগী করা।
রেলওয়ের ওয়েবসাইটে লেখা থাকে ঢাকা থেকে পঞ্চগড় যেতে একতা এক্সপ্রেসের সময় লাগে ১০ ঘণ্টা ১০ মিনিট, দ্রুতযান এক্সপ্রেসের ১১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট এবং পঞ্চগড় এক্সপ্রেসের সময় লাগে ১০ ঘণ্টা। কিন্তু বাস্তবে লাগে তার চেয়ে অনেক বেশি। কোনো দিন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দুই থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত দেরি হয়। সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় অনেক যাত্রীর জরুরি কাজ ভেস্তে যায়। বাংলাদেশ রেলওয়ের উচিত ট্রেনের সময়সূচির প্রতি কঠোর দৃষ্টি রাখা এবং সার্বিক ভ্রমণের সময় আরো কমিয়ে ট্রেনযাত্রাকে জনবান্ধব করা।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি।

Advertisement