
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
নিউট্রিনো কণা শনাক্ত করে এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেন। গতকাল মঙ্গলবার সুইডেনের স্টকহোম থেকে এ বছরের পদার্থবিজ্ঞানে বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্স। নোবেল কমিটি জানায়, আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে নির্ণায়ক অবদান এবং অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল বা মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য ফ্রান্সিস হ্যালজেনকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফ্রান্সিস হ্যালজেন প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন যে অ্যান্টার্কটিকার বরফ ব্যবহার করে নিউট্রিনো নামে পরিচিত কণাগুলোর গতিপথ শনাক্ত করা সম্ভব।
নোবেল কমিটি আরো বলছে, অত্যন্ত উচ্চ-শক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো অত্যন্ত বিরল, তাই পর্যাপ্ত সংঘর্ষ পর্যবেক্ষণ করতে বিশাল আয়তনের বরফের প্রয়োজন হয়। হ্যালজেনের গবেষণার আইসকিউব পুরো এক ঘনকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং এর নির্মাণকাজ ২০১১ সালে শেষ হয়। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের নিউট্রিনো উৎসের অনুসন্ধান আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
ফ্রান্সিস হ্যালজেন উপলব্ধি করেছিলেন যে, দক্ষিণ মেরুর বরফকে ‘নিউট্রিনো’ নামক কণা শনাক্ত করার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। তার দূরদর্শী চিন্তা ও বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছে- এটি মূলত এক ঘন কিলোমিটার আয়তনের বরফের খণ্ড, যা আলোক-সংবেদী সেন্সর বা আলোক-গ্রাহক যন্ত্রে সজ্জিত। আইসকিউব ব্যবহার করে গবেষকরা দূরবর্তী মহাবিশ্বের অত্যন্ত উচ্চ-শক্তি সম্পন্ন প্রক্রিয়া থেকে নির্গত নিউট্রিনোগুলোকে শনাক্ত করতে পারেন।
নিউট্রিনো সর্বত্রই বিদ্যমান; কিন্তু তারা সহজে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় না। আমাদের কোনো অজান্তেই এরা পৃথিবী এবং আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে অনায়াসে চলে যায়। অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে, কোনো একটি নিউট্রিনো কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সাথে মিথস্ক্রিয়া বা বিক্রিয়া ঘটায়; আর ঠিক এই ঘটনাটির কারণেই উপযুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই জানেন যে, মহাবিশ্বে প্রাকৃতিকভাবেই এমন কিছু কণা-ত্বরক (ঢ়ধৎঃরপষব ধপপবষবৎধঃড়ৎ) বা কণা-গতিবর্ধক ব্যবস্থা রয়েছে, যা পৃথিবীর গবেষণাগারে উৎপন্ন শক্তির তুলনায় দশ লাখ গুণ পর্যন্ত বেশি শক্তিসম্পন্ন কণা নির্গত করে। এই উৎসগুলো সম্পর্কে অনেক কিছুই এখনো রহস্যময়: এগুলোর প্রকৃতি কী, কোথায় এদের অবস্থান এবং এদের অভ্যন্তরে প্রধান প্রক্রিয়াগুলোই বা কী?
অন্যান্য ধরনের কণা যে পরিবেশে সৃষ্টি হয়, ঠিক সেই একই পরিবেশে অত্যন্ত উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোগুলোও উৎপন্ন হয়। তবে অন্যান্য কণার তুলনায় নিউট্রিনোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এরা কোনো দিক পরিবর্তন না করে বা শক্তি না হারিয়েই আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারে। এর অর্থ হলো, এরা এমন সব তথ্য প্রদান করতে সক্ষম যা অন্য কোনো উপায়ে পাওয়া সম্ভব নয়।
ফ্রান্সিস হ্যালজেন ১৯৮৮ সালে দক্ষিণ মেরুতে নিউট্রিনো শনাক্তকরণের বিষয়ে তার পরিকল্পনাটি প্রথম তুলে ধরেন। যখন কোনো নিউট্রিনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সাথে সংঘর্ষ ঘটায়, তখন আলোর একটি ঝলকানি বা স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়; স্বচ্ছ হিমবাহের বরফে বসানো সেন্সরগুলোর মাধ্যমে সেই আলো শনাক্ত বা অনুসরণ করা সম্ভব। দক্ষিণ মেরুর বরফের অনেক সুবিধা রয়েছে- যেমন, এটি বিভিন্ন ধরনের বাহ্যিক বাধা বা কোলাহলমুক্ত এবং ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত স্থিতিশীল অঞ্চল, যেখানে ভূমিকম্পের কোনো ঝুঁকি নেই। হ্যালজেন এবং তার এই ধারণাটি শিগগিরই অন্যান্য গবেষকদের সমর্থন লাভ করে এবং মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই বরফের মধ্যে সেন্সর বসিয়ে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়।
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে বেলজিয়ামে বেড়ে ওঠা ফ্রান্সিস হ্যালজেন কণা পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হন। পিএইচডি শেষ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনে যোগ দেন।
পুরস্কার হিসেবে তিনি পাবেন একটি মেডেল, একটি সনদপত্র এবং মোট ১২ মিলিয়ন বা এক কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। বিজ্ঞান, শান্তি ও সাহিত্যে অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯০১ সাল থেকে সুইডিশ বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ী আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছানুসারে এই পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যু দিবস ডিসেম্বরের ১০ তারিখ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কারের অর্থ তুলে দেয়া হয়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








