
মনির হোসেন
‘ভুয়া ভিসা’ দিয়ে সার্বিয়াগামী কর্মীদের কাছ থেকে অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে। এমন অভিযোগের পরই প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর নির্দেশে স্বাধীনতা ওভারসিস নামের রিক্রুটিং এজেন্সিসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অভিযানিক দল (টাস্কফোর্স)। তবে গতকাল রাত ৮টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক বা সংশ্লিষ্ট কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না তা জানা যায়নি।
জানা যায়, গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সামনে বহির্গমন ছাড়পত্র না পাওয়া সার্বিয়াগামী কয়েক শ’ কর্মী ব্যানার নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন শুরু করেন। এ সময় তারা সরকার তথা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দিতে থাকেন। পরে আগতদের মধ্য থেকে পাঁচজনের একটি প্রতিনিধিদলকে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী তার দফতরে ডেকে নেন। এরপর এসব কর্মীদের চাহিদাপত্র, ভিসা আসল না নকল, মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত্র কোনো আবেদন জমা দেয়া হয়েছে কি না, প্রতি কর্মীর কাছ থেকে এজেন্সি মালিক কত টাকা করে আদায় করেছেন এবং এ কর্মীদের অবস্থান কর্মসূচীর নেপথ্যে থেকে কারা কারা ইন্ধন জোগাচ্ছে সেসব বিষয় আলোচনায় উঠে আসে। উভয়পক্ষের আলোচনার মধ্যেই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ম্যাজিস্ট্রেটকে আসতে বলেন। এরপর তিনি স্বাধীনতা ওভারসিসের মালিকের উপস্থিতিতে তার প্রতিষ্ঠানে দ্রুত অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। একই সাথে ওই প্রতিষ্ঠানের সব ডকুমেন্ট জব্দ করে অফিস সিলগালারও নির্দেশ । নির্দেশনা দেয়ার সময় রমনা জোনের ডিসি, এডিসি, গোয়েন্দা সংস্থা ডিবির প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, তিনি ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশনা দিয়েছেন অভিযান চালাতে। তারা আগে ডকুমেন্ট নিয়ে আসুক। তারপর তাদের ভিসা সঠিক পাবো; তাদেরকে আজকেই বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করব। যদি রাত ২টাও বাজে বাজুক। আর যাদের ভিসায় সমস্যা পাব তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব। তাদের ছাড়া হবে না।
এর আগে বেলা ১১টার দিকে রিক্রুটিং এজেন্সি স্বাধীনতা ওভারসিসসহ একাধিক রিক্রুটিং এবং ট্রাভেল এজেন্সির মালিকদের ‘পরিকল্পনায়’ সার্বিয়াগামী কয়েক শ’ শ্রমিক প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সামনে অবস্থান নেন। তারা বর্তমান সরকার তথা প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, প্রবাসী কল্যাণ সচিব মোকতার আহমেদ, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন, যা বিকেল পর্যন্ত চলমান ছিল। তাদের অবস্থান কর্মসূচির কারণে ওই রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি হয়।
মন্ত্রীর দফতরে আগত প্রতিনিধিদের মধ্যে একজন সার্বিয়াগামী কর্মী বলেন, ‘স্যার আমি সার্বিয়া যেতে রিক্রুটিং এজেন্সি মালিককে ইতোমধ্যে আট লাখ টাকা দিয়েছি। আমি নানাভাবে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, আমাকে সার্বিয়ার যে কোম্পানি থেকে ভিসা দেয়া হয়েছে, সেখানে কাজ, বেতনসহ সবকিছুই ঠিক আছে। তারপরও ভিসা আসার পর দুই মাস ধরে বহির্গমন ছাড়পত্রের জন্য ঘুরছি। বিদেশে যেতে আমি জমিজমা বিক্রি করে টাকা জোগাড় করেছি। এখন বিদেশে যেতে না পারলে আমার সব শেষ হয়ে যাবে।’ এ সময় পাশে বসা স্বাধীনতা ওভারসিসের মালিক মন্ত্রীকে বলার চেষ্টা করেন, আমি স্যার সার্বিয়াতে অনেক লোক পাঠিয়েছি। দুই মাস আগেও বাংলাদেশ দূতাবাসের কোনো সত্যায়ন লাগেনি। এবার আমি ৭০০ কর্মীর নামে চাহিদাপত্র পেয়েছি। এর মধ্যে আমার স্বাধীনতা ওভারসিসের নামে ৩১ জন কর্মীর বহির্গমন ছাড়পত্র পেতে আবেদন করেছি; কিন্তু এখনো আমাকে এসব ভিসার বিপরীতে বিএমইটি থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র দেয়া হচ্ছে না।
মন্ত্রীর জিজ্ঞাসাবাদে রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক বলেন, প্রত্যেক কর্মী সার্বিয়া যাওয়ার জন্য ভিসা বাবদ সাড়ে আট লাখ টাকা করে দিয়েছে বলে স্বীকার করেন। পরে আগত প্রতিনিধির মধ্যে একজন ট্রাভেল এজেন্সির মালিক পরিচয় দিয়ে বক্তব্য দেন। তখন তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, ট্রাভেল এজেন্সির মালিক কিভাবে বিদেশে লোক পাঠানোর কাজ করছে। তারা কি এটা করতে পারে? এ সময় বিএমইটির ডিজি জামিল আহমেদ ডকুমেন্ট দেখিয়ে বলেন, মোট ১৪টি সার্বিয়ার কোম্পানি থেকে কর্মীর নামে চাহিদাপত্র এসেছে। সেগুলো আমাদের দফতরে জমা হলে আমরা তাদের এসব চাহিদাপত্র, ভিসা সঠিক আছে কি না; সেটি যাচাইয়ের জন্য ইতালির রোমের বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করি। তারা আমাদেরকে অফিসিয়ালি জানিয়েছে, ২-৩টি প্রতিষ্ঠানের দেয়া কর্মীদের ভিসাসহ অন্য সবকিছু ঠিকঠাক আছে। তবে বাকি ১১টি প্রতিষ্ঠানের নামের চাহিদা ও ভিসার সবগুলোই ভুয়া। এরপরই আমরা এসব ভিসার বিপরীতে বহির্গমন ছাড়পত্র দেয়া বন্ধ রাখি। এ সময় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মোখতার আহমেদ বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ও দালাল চক্র মিলে সার্বিয়াগামী ৭০০ কর্মীর কাছ থেকে গড়ে ৬০ কোটি টাকার মতো হাতিয়ে নিয়েছে। সবার বক্তব্য শোনার পর প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আলোচনার মধ্যে নির্দেশনা দেন, আগে স্বাধীনতা ওভারসিসের অফিস সিলগালা করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেটকে আসতে বলো। অফিস সিলগালা করো। সেখান থেকে সব ডকুমেন্টস আনার পরই পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এরপর তিনি ডিবির প্রধান, পুলিশ কমিশনারের একজন প্রতিনিধিকে তার দফতরে উপস্থিত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বলেন। তারা আসার পর তার ব্যক্তিগত রুমে গিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে তিনি তাদের সাথে আলোচনা করেন।
কর্মীদের অবস্থান কর্মসূচীসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, আমাদের দফতরে সার্বিয়াগামী কিছু ডকুমেন্ট গত ২৭ তারিখ জমা পড়েছিল। আমরা ২৮ তারিখই সেগুলো যাচাই করার জন্য রোমের বাংলাদেশ দূতাবাসে পাঠিয়ে দেই। তাদের কাছে পাঠিয়ে আমরা জানতে চেয়েছি, এ ইন্ডাস্ট্রি ঠিক আছে কি না, ডিমান্ড লেটারগুলো ঠিক আছে কি না, প্রত্যেক কর্মীর কাছ থেকে সাড়ে আট লাখ টাকা করে নিয়েছে চক্রের সদস্যরা। অথচ ভুয়া, দালাল চক্র এদেরকে পাঠায়। পরে তাদের চাকরি থাকে না। ডিমান্ড নোট থাকে না। দেখা যায়, নানাভাবে তারা প্রবলেমে পড়ে। ওই দেশে গিয়ে অ্যারেস্টও হয়। আবার সেখান থেকে পালিয়ে যায়। আমি আজকে শুনলাম এবং তাদের প্লাকার্ডটা দেখলাম। সেখানে তারা লিখলো, তাদের সমস্যার সমাধান না হলে সরকারকে গদি ছাড়তে হবে। অনির্দিষ্টকালের জন্য তাদের অবস্থান কর্মসূচী চলবে। আমি বললাম, আমি জানতে চাই আসলে ঘটনা কী। এর জন্য আমি সকাল থেকে নিজেই অফিসে আছি। আমার যাওয়ার কথা ছিল শ্রম মন্ত্রণালয়ে; কিন্তু আমি যাইনি। যেহেতু আন্দোলনকারীরা এখানে। তাদের কি দাবি এটা জানার জন্যই বসে আছি।
এ সময় একজন সাংবাদিককে বসিয়ে তিনি বলেন, আজকে পাইছি আপনারে। আপনি এখানে বসে থাকেন। সব তথ্য নেন। সঠিক তথ্যটা জনগণকে বুঝান, জানান। এরপরে পুলিশ আসলো। পুলিশ বললো তারা কয়েকজন আসতে চাইছে। তখন আমি তাদের বললাম, তারা পাঁচজন, সাতজন যে কজন আসতে চায় আসতে বলেন। আমি তাদের সাথে কথা বলতে চাই। জানতে চাই। আমাদের মন্ত্রণালয়ের কোনো ক্রটি আছে কি না। ভিসা পাইছে যাবে না, কারণ কী? আনলাম ডেকে। এখন দেখি। এখানে একজন পেলাম কর্মী। বাকি তিনজনের মধ্যে একজন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক, আরেকজন হেলপের জন্য এসেছে। দুইজন ট্রাভেল এজেন্সির মালিক। ট্রাভেল এজেন্সি কিভাবে রিক্রুটিং এজেন্সির কাজ করে। পুলিশ প্রশাসনকে আমি বললাম ৭০০ মানুষের ভিসা নিলো, আমার কাছে তো অ্যাপ্লিকেশনও করল না। এরাই আবার অর্গানাইজড করে মানুষ নিয়ে আসলো। তারা মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিছে তো। এখন তারা (কর্মী) বলতেছে আমাদের সব শেষ। সরকার, বিএমইটি হয়রানি করতেছে, এ দেখেন ভিসার মেয়াদ শেষ। এরা পারমিশন দিলেই তুমি কালকে (সার্বিয়া) চলে যেতে পারবা। এসব বলে সব ব্লেম আমাদের মন্ত্রণালয়ের ওপর নিয়ে আসছে। এখন আমি দেখতে চাই। রাত ২টা হলেও যদি জেনুইন ভিসা হয়ে থাকে আমরা ওভারনাইট অফিসারদের কাজ করতে বলেছি। তারা আমাদের তালিকা দিয়ে বলেছে, ১১টা ইন্ডাস্ট্রিই ভুয়া। এটা দূতাবাসের রিপোর্ট। কোনো অস্বস্তিই নাই। যেগুলো জেনুইন পাইছি সেগুলো দিয়ে দিচ্ছি। এখন যে ৩১টি ভিসা আসছে সেগুলো ভেরিফাই করছি। তিনি বলেন, ট্রাভেল এজেন্সি এবং রিক্রুটিং এজেন্সি মিলে এরা একটি চক্র। ওই এজেন্সিরাই। এরাই মানুষ অর্গানাইজড করছে। যাদের কাছ থেকে পয়সা নিছে এরা দিতে পারছে না। এখন আমাদের ওপর ব্লেম দিচ্ছে। তবে আমি আজকে ছাড়ব না। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর এ সময় উপস্থিত হয়ে তার মোবাইলে সার্বিয়াগামী কর্মীদের প্রায় ৭০০ সদস্য ট্যাগ হওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, তারা মন্তব্যের ঘরে মন্ত্রণালয়, বিএমইটি ও আমাকে নিয়ে যা তা মন্তব্য করছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








