
কাওসার আজম
তৈরী পোশাকশিল্পে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ রফতানিকারক হলেও এ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা উৎপাদনে ব্যাপকভাবে আমদানি নির্ভর বাংলাদেশ। প্রতি বছর দেশের বস্ত্র ও পোশাকশিল্পে প্রায় ৯০ লাখ গাঁট কাঁচা তুলার প্রয়োজন হলেও দেশে উৎপাদিত হচ্ছে মাত্র ২.২৪ লাখ গাঁট আঁশ। ফলে বিপুল পরিমাণ তুলা আমদানি করে চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৭৩ লাখ গাঁট কাঁচা তুলা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ লাখ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১৯ লাখ গাঁট তুলার আঁশ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
তুলার চাহিদার বিপরীতে আকাশ-পাতাল ব্যবধানের মধ্যেই আজ বুধবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব তুলা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘তুলায় সমৃদ্ধি : বাণিজ্য, রূপান্তর ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের তুলা মূল্যশৃঙ্খল শক্তিশালীকরণ’। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে আজ নানা কর্মসূচি পালিত হবে বলে জানান সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মো: রেজাউল আমিন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ। তৈরী পোশাকশিল্পের বিপুল চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদনের এই ঘাটতি থাকায় বাংলাদেশের জন্য দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হচ্ছে। অথচ প্রায় দুই লাখ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। খাদ্যশস্য উৎপাদনের জমির সাথে প্রতিযোগিতা এড়াতে চরাঞ্চল, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল, পাহাড়ি এলাকার উপযুক্ত সমতল ভূমি, নতুন ফলজ ও বনজ বাগানের অব্যবহৃত জায়গা এবং লবণাক্ততা ও কম ফসল-নিবিড় এলাকায় তুলা চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু চাষের জমি বাড়ালেই হবে না; উৎপাদন বাড়াতে উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাত, মানসম্মত বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি, পানি ব্যবস্থাপনা, আন্তঃফসল চাষ, কৃষি প্রণোদনা এবং লাভজনক বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বছরে ৪৫ হাজার কোটি টাকার আমদানি : রফতানিমুখী তৈরী পোশাকশিল্পের জন্য বছরে প্রায় ৯০ লাখ গাঁট কাঁচা তুলার প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন মাত্র ২.২৪ লাখ গাঁট হওয়ায় প্রায় ৭৫-৮০ লাখ গাঁট তুলা আমদানি করতে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে প্রায় ৭৩ লাখ গাঁট। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশীয় তুলার আঁশের উৎপাদন পাঁচ লাখ গাঁটে উন্নীত করা সম্ভব হলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
বোর্ডের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাইব্রিড তুলার জাত উদ্ভাবন, চাষযোগ্য জমি সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের ধারাবাহিক প্রণোদনা সহায়তার মাধ্যমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। উপযুক্ত জমির ব্যবহার ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগে ফলন বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। উৎপাদন বাড়লে আমদানি নির্ভরতা কমার পাশাপাশি পোশাকশিল্পের সরবরাহশৃঙ্খলও শক্তিশালী হবে। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মো: রেজাউল আমিন বলেন, তুলা চাষ কৃষকের জন্য অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়। এক বিঘা জমিতে তুলা উৎপাদনে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। ভালো ফলন হলে প্রায় ১৫ মণ কাঁচা তুলা পাওয়া যায়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
২৬ জেলায় ২৫ হাজার কৃষককে প্রণোদনা : তুলা উৎপাদন বাড়াতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রণোদনা হিসেবে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের মৃত্তিকা উর্বরতা ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. এম গাজী গোলাম মুর্তুজা জানান, ২৬ জেলার প্রায় ২৫ হাজার প্রান্তিক কৃষককে এক বিঘা জমিতে আন্তঃফসল হিসেবে তুলা চাষের জন্য উন্নতমানের বীজ, সার ও কীটনাশক সহায়তা দেয়া হবে। তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ কমিয়ে কৃষকের মুনাফা বাড়ানোর মাধ্যমে তুলা চাষে আগ্রহ সৃষ্টি করাই এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। তুলা উৎপাদন বাড়লে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের আমদানি ব্যয়ও কমবে।
তুলার সাথে হলুদ-মরিচ : তুলার সাথে আন্তঃফসল চাষেও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাজশাহীর চারঘাট ও নাটোরের দয়ারামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার হেক্টর জমিতে তুলার সাথে হলুদ চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। চলতি বছর প্রায় ৪০০ বিঘা জমিতে এ পদ্ধতিতে তুলার সাথে হলুদ চাষ হচ্ছে। একইভাবে যশোর অঞ্চলে প্রায় ৫০০ বিঘা জমিতে তুলার সাথে মরিচ চাষ করা হচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে, আন্তঃফসল পদ্ধতিতে একই জমি থেকে একাধিক ফসল পাওয়া যায়। এতে জমির উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের মোট আয় বাড়ে। খাদ্যশস্য উৎপাদনের জমির সাথে প্রতিযোগিতা কমিয়ে তুলা চাষ সম্প্রসারণেও এ পদ্ধতি ভূমিকা রাখতে পারে।
রয়েছে চ্যালেঞ্জও : তুলা উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও এ খাতে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলেন, নীতিগত সহায়তার ঘাটতি, তুলার তুলনামূলক দীর্ঘ উৎপাদনকাল, অন্যান্য উচ্চমূল্যের ফসলের সাথে প্রতিযোগিতা, চাষযোগ্য জমির সঙ্কট, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বাজারদরের ওঠানামা এবং কীটপতঙ্গের আক্রমণ তুলা চাষের বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা মোকাবিলায় শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তি ও ধারাবাহিক সরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সাথে তুলা চাষের এলাকা সম্প্রসারণ, তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃষকের জন্য মূল্য সহায়তা এবং বিশেষ কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি।
সাধারণত জুনের মাঝামাঝি তুলার বীজ বপন করা হয় এবং ডিসেম্বরের দিকে সংগ্রহ শুরু হয়। দেশের দক্ষিণ, পশ্চিম, উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের ৩২টিরও বেশি জেলার উঁচু ও পাহাড়ি এলাকায় তুলা চাষের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে।
আঁশের বাইরেও অর্থনীতি : তুলা শুধু বস্ত্র ও পোশাকশিল্পের কাঁচামাল নয়। এর বীজ থেকে ভোজ্যতেল এবং অবশিষ্টাংশ থেকে খৈল উৎপাদন করা হয়, যা পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে আঁশের পাশাপাশি বীজ, তেল ও খৈলসহ বিভিন্ন উপজাতের মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষি, জিনিং, স্পিনিং, বস্ত্র, তেল ও পশুখাদ্য- বহু খাতের সাথে তুলার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই দেশীয় তুলা উৎপাদন বাড়লে এর প্রভাব কৃষি ও পোশাকশিল্পের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন এবং বৈদেশিক বাণিজ্যেও পড়বে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








