
ক্রীড়া প্রতিবেদক
সাফল্য সব সময় পদকের রঙে মাপা যায় না। কখনো কখনো একটি জয়ই হয়ে ওঠে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অবহেলা আর সংশয়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো উত্তর। এশিয়ান গেমসের কুস্তির ম্যাটে বাংলাদেশের আব্দুস সাত্তার ও মাহবুব হোসেনের জয় তেমনই এক উত্তর। পরের রাউন্ডে দু’জনই হেরেছেন-কিন্তু তাতে তাদের অর্জনের মাহাত্ম্য এতটুকুও কমেনি। স্বাধীনতার পর এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে বাংলাদেশের পুরুষ কুস্তিতে এমন জয় নিঃসন্দেহে সাফল্যেরই বার্তা।
এশিয়ান গেমসে ৪৬ বছর পর কুস্তিতে বাংলাদেশের আব্দুল সাত্তার জয় পেয়েছেন। গত শুক্রবার ২ অক্টোবর জাপানের নাগোয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে ৬৫ কেজি ওজন শ্রেণীতে নেপালের রাম কিশোর যাদবের বিপক্ষে ১০-০ পয়েন্টে দুর্দান্ত জয় তুলে নেয় বাংলাদেশের কুস্তিগীর আব্দুল সাত্তার। যদিও দ্বিতীয় রাউন্ডে সৌদি আরবের কুস্তিগিরের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে। আর ৩ অক্টোবর দ্বিতীয় বাংলাদেশী হিসাবে কুস্তি খেলোয়াড় মাহবুব আলম ৫৭ কেজি ওজন শ্রেণীতে ১৩-৮ পয়েন্টে হারিয়েছেন শ্রীলঙ্কার ইকানায়াকা মুদিয়ানসেলাগেকে। প্রথম রাউন্ডে ৮ পয়েন্ট পিছিয়ে পড়লেও; দ্বিতীয় রাউন্ডে ফিরে এসে একাই ১২ পয়েন্ট আদায় করে নেন মাহাবুব! এ সুখ অবশ্য স্থায়ী হয়নি। পরবর্তী রাউন্ডে উত্তর কোরিয়ার প্রতিযোগীর কাছে হারতে হয়েছে।
আরো তাৎপর্যের বিষয়, এ সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছেন একজন নারী কোচ-শিরিন সুলতানা। পুরুষ কুস্তিগীরদের কোচ হিসেবে একজন নারীকে মেনে নিতে না পেরে যারা নানা প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাদের জন্য সাত্তার-মাহবুবের জয় যেন ম্যাটের ওপর থেকে দেয়া মোক্ষম জবাব। নারী কোচ বলে যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মানসিকতা যে কতটা সেকেলে, দুই কুস্তিগীরের জয় সেটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনে কোচের পরিচয় তার লিঙ্গে নয়, তার জ্ঞান, দক্ষতা, নেতৃত্ব ও শিষ্যদের পারফরম্যান্সে। শিরিন সুলতানার হাতে গড়ে ওঠা দুই কুস্তিগীর এশিয়ান গেমসের ম্যাটে জয় তুলে নিয়ে অন্তত সেটিই মনে করিয়ে দিলেন। সমালোচনার কালি যতই ছোড়া হোক, উত্তরটা শেষ পর্যন্ত দিতে হয় মাঠেই। সাত্তার ও মাহবুব সে উত্তর দিয়েছেন। তাদের জয় তাই শুধু দু’টি ম্যাচের জয় নয়-এটি অযথা সমালোচনার মুখে একেকটি শক্ত চপেটাঘাত।
বাংলাদেশ পুরুষ জাতীয় কুস্তি দলের কোচ হয়েছেন শিরিন। পুরুষ কুস্তি দলে নারী কোচ কেন? প্রশ্নটি স্বাভাবিক; কিন্তু উত্তরটাও পরিষ্কার-কোচের যোগ্যতা নির্ধারণে লিঙ্গ নয়, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাই মূল বিষয়। খেলাটির কৌশল এখন তিনি শেখাচ্ছেন, সে খেলায় তার নিজেরও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা রয়েছে। কোচ হিসেবেও নিয়েছেন প্রস্তুতি। শিরিনের দায়িত্বটি শুধু সাবেক খেলোয়াড় হওয়ার কারণে নয়। তিনি সলিডারিটি কোচেস কোর্স-২ সম্পন্ন করেছেন। ২০২৫ সালে তাকে বাংলাদেশের জাতীয় কুস্তি দলের প্রধান কোচ করা হয়েছে। তখন মিরপুরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের ক্যাম্পে তিনি কুস্তিগীরদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সে সময়ই বাংলাদেশের কুস্তিতে তিনি তৈরি করেন একটি নতুন দৃষ্টান্ত-জাতীয় কুস্তি দলের প্রথম নারী প্রধান কোচ।
শিরিন সুলতানা একসময়ের দেশের অন্যতম সেরা নারী কুস্তিগির। ১৯৮৮ সালে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পাহাড় অনন্তপুর গ্রামের জন্মগ্রহণ করেন শিরিন সুলতানা । মা আর দুই ভাইকে নিয়েই তাদের সংসার। বাংলাদেশ আনসারে ব্যাটালিয়ন সৈনিক হিসেবে ২০০৮ সালে যোগ দেন। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ আনসারে ট্যালেন্ট হান্ট কার্যক্রম শুরু হলে সেখানে জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় বর্তমানে আনসার মহিলা ফুটবল দলের কোচ রেহানা পারভীনের নজরে আসেন শিরিন। তখন থেকেই তার খেলোয়াড়ি জীবনের শুরু।
জাতীয় কুস্তি প্রতিযোগিতা ২০১০ সালে অংশগ্রহণ করে তিনি ৫৫ কেজি ওজন শ্রেণীতে সোনা অর্জন করেন। শুধু ২০১০ সালে নয়, কুস্তিতে জাতীয় পর্যায়ে ২০১১ ও ২০১২ সালেও শিরিন জিতেছেন স্বর্ণ জিতেন। ২০১২ সালে ভারতে ইন্দো-বাংলাদেশ-বাংলা আন্তঃরেসলিং চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতেন।
তিনি কুস্তি পাশাপাশি কাবাডিও খেলেন। বাংলাদেশ আনসারের হয়ে ২০১১ সালে মিজান জাতীয় কাবাডি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন। এ ছাড়া ২০১২ সালে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের হয়ে জাতীয় মহিলা ক্লাব লিগে বিজয়ী হয়ে সোনা জেতে তাদের দল।
২০১২ ইন্দো-বাংলা রেসলিং চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক, ২০১৩ এশিয়ান রেসলিং প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ পদক, ২০১৫ জাতীয় মহিলা কাবাডিতে স্বর্ণপদক, ২০১০ ও ২০১১ সালে জাতীয় উশু চ্যাম্পিয়নশিপে রৌপ্যপদক ও ২০১৪ সালে স্বর্ণপদক, জাতীয় রোইং চ্যাম্পিয়নশিপেও স্বর্ণপদক জয় পরপর চারবার (২০১০-১৩)। ২১তম কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে অংশগ্রহণ এবং ৪র্থ স্থান অর্জন। খেলা ও ব্যবসার পাশাপাশি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্মে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








