
রয়টার্স ও এএফপি
ইয়েমেনের সমস্ত হাউছি নিয়ন্ত্রিত এলাকা পুনর্দখলে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সৌদি আরব সমর্থিত সরকার। অন্য দিকে, সংঘাতের মূল ফ্রন্টে নিজেদের শক্ত অবস্থান বজায় রেখে সরকারি বাহিনীর একটি অবরুদ্ধ শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার দাবি করেছে ইরান সমর্থিত হাউছি বিদ্রোহীরা।
গত রোববার দেয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি জানান, দেশের বাকি অংশ শত্রুমুক্ত করতে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সংঘাতময় এলাকায় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠাই এ অভিযানের মূল লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক নৌপথের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল বাবুল-মানদেব প্রণালী এবং লোহিত সাগর উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা সম্প্রতি হাউছিদের দখলে চলে যায়। হারিয়ে যাওয়া এসব কৌশলগত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই মূলত সরকারি বাহিনী এ ব্যাপক সামরিক উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। নিরাপত্তা সূত্রগুলোর তথ্যমতে, সরকারি বাহিনীর অন্তর্বর্তীকালীন রাজধানী এডেনের সাথে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাইজ শহরের মূল সংযোগ ও রসদ সরবরাহ পথটি গতকাল বিচ্ছিন্ন করে দেয় হাউছিরা। ওই পথটি অবরুদ্ধ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই সরকারি পক্ষ থেকে এ পাল্টা সর্বাত্মক অভিযানের ডাক আসে।
তাইজ ও তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে কয়েক দিন ধরেই সংঘাত তীব্র রূপ নিয়েছে। ২৪ ঘণ্টার প্রচণ্ড সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ৭০ জনেরও বেশি সদস্য নিহত হয়েছেন। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, হাউছি বাহিনী আল-সাফিয়া এলাকার থানা দখল করে নিয়েছে এবং প্রধান সড়ক বন্ধ করে দেয়ায় সেখানে মুখোমুখি লড়াই বজায় রয়েছে। সৌদি আরবের আকাশ ও স্থল সমর্থনের পরও হাউছিদের অগ্রগতি সামাল দিতে বেগ পেতে হচ্ছে ইয়েমেন সরকারকে। আবার ইয়েমেন সীমান্তের বাইরে সৌদি ভূখণ্ডেও হামলা জোরদার করেছে হাউছিরা। গতকালও সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ সংলগ্ন জ্বালানি স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি প্রকাশ করেছে দলটি। হাউছি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, রিয়াদের উপকণ্ঠ ও কুরাইশ অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে, যার ফলে সেখানে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। বিগত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে তাদের ওপর প্রায় ৫০টি বিমান হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ তুলে এ পাল্টা আঘাত হানা হয়েছে বলে দাবি করে হাউছিরা। তবে এ নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের চলতি পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিহন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল রফতানি ও সরবরাহে এমনিতেই সঙ্কট রয়েছে। তার ওপর সীমান্ত ঘেঁষে হাউছিদের নতুন এ সামরিক তৎপরতা রিয়াদের জন্য কৌশলগত উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিলো।
বাবুল-মানদেব দখলের দাবি, সানা মুক্ত করতে নতুন অভিযান
এ দিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার দাবি করেছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার। পাশাপাশি দেশটির তাইজ প্রদেশের উপকূলীয় শহর ধুবাবের একটি বিমানবন্দরও নিজেদের কব্জায় নেয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।
গতকাল সোমবার আলজাজিরা জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেয়া এক বার্তায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ আল-নুজাইলি জানান, সরকারি বাহিনী বিমানবন্দরটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং আশপাশের এলাকায় অবস্থান আরো শক্ত করেছে। চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলার পর অনেক হাউছি যোদ্ধা নৌকায় করে পালিয়ে যায়। হাউছিদের বিরুদ্ধে এক ‘ভাগ্যনির্ধারক সামরিক অভিযানে’ ধুবাব শহরটি দখলে নেয়া হয় বলে সেনা সূত্র থেকে আগেই জানানো হয়েছিল। আল-নুজাইলি জানান, বাহিনীর এই সামরিক অভিযান এখনো চলছে।
তা ছাড়া রাজধানী সানা শত্রুমুক্ত করতে ‘ডন অব ইয়েমেন’ বা ‘ইয়েমেনের উষা’ নামে বড় সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রশাদ আল-আলিমি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্ধার, সানামুক্ত করা এবং হাউছি মিলিশিয়াদের শাসন নস্যাৎ করতেই এই পদক্ষেপ। সাধারণ মানুষের ইচ্ছা, সেনাবাহিনীর সাহসিকতা ও বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সহায়তায় দেশটি আবার মুক্ত বাতাসের মুখ দেখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
২০১৪ সালেসানা দখল করে নেয় হাউছিরা। পরে সেখানে তারা নিজস্ব সরকার প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে ইয়েমেনের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল তাদের দখলে রয়েছে। গত মাসেও লোহিত সাগর উপকূলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এমন অবস্থায় হাউছিদের হাত থেকে সব এলাকা ফিরিয়ে নিতেই সৌদি সমর্থিত আল-আলিমি এই পাল্টা আক্রমণের ডাক দিয়েছেন। অন্য দিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, ইয়েমেনে হাউছিদের ৩০০টিরও বেশি ‘গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে’ তারা হামলা চালিয়েছে। মিত্র স্থল বাহিনীকে সার্বক্ষণিক আকাশ সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে বলে জানান জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি। তিনি জানান, ‘ইয়েমেনের উষা’ অভিযানে সোমবার সকালেই শতাধিক যুদ্ধবিমান অংশ নিয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








