গাজা, স্কুল, ওত পেতে থাকে মৃত্যু, ইসরাইলি হামলা, ঝরছে, শিশুদের প্রাণ,
নিহত এক শিশুর ছবি ও স্কুলের সনদ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা দাঁড়িয়েছেন ক্যামেরার সামনে। আল জাজিরা

যুদ্ধের বিরতি এলেও নিরাপদ নয় গাজার শিশুরা। স্কুলে ফেরার আনন্দের বদলে এখন তাদের মনে আতঙ্ক—পথে, শ্রেণিকক্ষে, এমনকি তাঁবুর ভেতরেও। ১৪ বছরের মোহাম্মদ হামাদ স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল। সঙ্গে ছিল ১০ বছরের ছোট ভাই আবদুল্লাহ। গত ১৭ অক্টোবর দেইর আল-বালাহর আল-বারাকা এলাকায় তাঁদের চলার পথে ইসরাইলি হামলা চালায়। এতে মোহাম্মদ ও আরেক ব্যক্তি নিহত হন। প্রাণে বেঁচে যায় আবদুল্লাহ।

Advertisement

আল জাজিরা ৩১ অক্টোবর জানায়, মোহাম্মদ ছিল রিয়াদ হামাদের তৃতীয় সন্তান। অষ্টম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রটির পড়াশোনা ও সাফল্য নিয়ে পরিবারের গর্বের শেষ ছিল না। সেই ছেলেকে হারিয়ে তাঁরা এখনো শোক সামলে উঠতে পারেননি। ৪৪ বছর বয়সী রিয়াদ বলেন, ‘মোহাম্মদ প্রায়ই আমাকে জিজ্ঞেস করত, আমি তাকে কতটা ভালোবাসি।  কসম খেয়ে বলছি, তার কাছে আমার চাওয়া বলতে ছিল শুধু এইটুকুই।’ ছোট ভাই আবদুল্লাহ এখন একা চলতে ভয় পায়।

দীর্ঘ প্রায় তিন বছর বিঘ্নিত থাকার পর গত ১৯ সেপ্টেম্বর গাজায় নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়। তাঁবু ও অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে স্কুল খুলতে শুরু করলে পরিবারগুলো সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে থাকে। কিন্তু গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইলি বিমান হামলা ও স্নাইপারের গুলি থামেনি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ৫৭৪ ফিলিস্তিনি নিহত ও ৫ হাজার ৬৮৭ জন আহত হয়েছেন। ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবরের মধ্যে নিহত হয়েছে ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১০ শিশু ও একজন শিক্ষক।

গত ২১ অক্টোবর জাবালিয়ার মুরাদিয়া স্কুলে সকালের সমাবেশ চলার সময় গুলিতে দুই ছাত্রী আহত হয়। একই দিন স্কুলে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হয় চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী সুয়াদ আবদ রাব্বো। মেয়ের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে মা আলিয়া খালি পায়ে ছুটে যান। সুয়াদের হাঁটুর ওপরের অংশে গুলি লাগে। চিকিৎসকেরা জানান, গুলিটি স্নায়ু ও রগের কাছে আটকে আছে; বের করতে গেলে পঙ্গু হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অস্ত্রোপচার করেও গুলি বের করা যায়নি। এখনো সেটি তার পায়ে রয়ে গেছে।

অজ্ঞান করার ওষুধের প্রভাব কাটতেই সুয়াদ স্কুলের শ্রুতি লিখনের পরীক্ষার জন্য মুখস্থ করা একটি অংশ আবৃত্তি করে। সেখানে ছিল, ‘উদারতা ও সহনশীলতার প্রতীক… ক্লান্ত হলে বাড়ির উঠানে জলপাইগাছের নিচে বসি, ক্লান্তি কাটিয়ে আবার স্বস্তি ফিরে পাই।’ হাসপাতাল থেকে ফিরলেও সে এখন তাঁবুতে শুয়ে আছে; হাঁটতে পারে না। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে অস্ত্রোপচার দরকার, কিন্তু গাজার ঢোকার ও বের হওয়ার পথ ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে। সুয়াদের প্রশ্ন, ‘আমার সঙ্গে এমন হলো কেন? আমাকে কেন লক্ষ্যবস্তু করা হলো? আমি কী করেছি?’

যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে গাজাকে ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনি নিয়ন্ত্রণে ভাগ করা ‘হলুদ রেখা’ গত এক বছরে পশ্চিম দিকে সরে গেছে। জাতিসংঘের হিসাবে, এতে গাজার ৬৫ শতাংশের বেশি এলাকা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে; চুক্তিতে এর পরিমাণ ছিল ৫৩ শতাংশ। ওই রেখার কাছে অন্তত ৬৬ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা এখন স্নাইপারের গুলি ও বোমার ঝুঁকিতে।

জাবালিয়া আল-বালাদের পশ্চিমে আল-ঘুবরি এলাকার একটি স্কুলে ২০টি তাঁবুতে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়ে। স্কুলটির প্রধান নাঈমা আলুশ বলেন, ইসরাইলি কামান, কোয়াডকপ্টার ড্রোন ও স্নাইপারের গুলি প্রায়ই স্কুলে এসে পড়ে। তাঁর ভাষায়, ‘শিক্ষা এখন গোলাগুলির মুখে। আমাদের পুরো জীবনটাই গোলাগুলির মধ্যে।’

সেদিন আহত পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী আমিনা খাদরের পেটে গুলি লাগে। বাবা খালেদ খাদর স্কুলে ছুটে গিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে কাছের চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান। ঘটনার পর থেকে আমিনা স্কুলে ফিরতে ভয় পায়। একবার গেলেও গোলাগুলির শব্দে আগেভাগে বাড়ি ফিরে আসে। ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্নে সে এখনো দেখে, সহপাঠী রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

খালেদ জানেন না, সন্তানদের স্কুলে পাঠাবেন, নাকি ঘরে আটকে রেখে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত করবেন। তাঁর প্রশ্ন, স্কুলে পাঠালে যদি তাদের ওপর গুলি চলে, তাহলে কী করবেন? আর ঘরে রাখলে তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে? যুদ্ধের মধ্যে গাজার শিশুদের সামনে এখন এই কঠিন বাস্তবতা।