
বিশেষ সংবাদদাতা
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য আয়কর ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। শেয়ারের বাজারদর বেড়ে কাগজপত্রে যে লাভ তৈরি হয়, অর্থাৎ অনুপার্জিত লাভ, তা আয় হিসেবে গণ্য হবে না। তবে শেয়ার বিক্রি করে প্রকৃত যে লাভ অর্জিত হবে, সেটি উপার্জিত লাভ বা মূলধনী আয় হিসেবে বিবেচিত হবে এবং নির্ধারিত নিয়মে কর দিতে হবে।
২০২৬-২৭ করবর্ষের আয়কর নির্দেশিকায় শেয়ারবাজারসহ বিভিন্ন মূলধনী সম্পদ থেকে অর্জিত আয় নির্ধারণের পদ্ধতি উদাহরণসহ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো সম্পদ প্রকৃতপে হস্তান্তর না হলে শুধু তার বাজারমূল্য বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট ধারণাগত লাভ মূলধনী আয় হিসেবে বিবেচিত হবে না। ফলে শেয়ার হাতে রেখেই বাজারদর বেড়ে গেলে সেই বাড়তি মূল্যকে আয় হিসেবে দেখিয়ে কর দেয়ার প্রয়োজন হবে না।
তবে এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত। অবিক্রীত শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি আয় না হলেও ওই অনুপার্জিত লাভকে সম্পদ বৃদ্ধির উৎস হিসেবে দেখানো যাবে না। অর্থাৎ বাজারমূল্য বেড়েছেÑ এমন তথ্য দিয়ে রিটার্নে অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের উৎস ব্যাখ্যা করা যাবে না।
৫৫ লাখ টাকা লাভ হলে কর কত?
এনবিআরের নির্দেশিকায় দেয়া উদাহরণে একজন করদাতার পুঁজিবাজার থেকে ৫৫ লাখ টাকা উপার্জিত লাভ এবং ৩০ লাখ টাকা অনুপার্জিত লাভ রয়েছে। নির্দেশিকার হিসাব অনুযায়ী, ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত উপার্জিত লাভের সুবিধা বাদ দেয়ার পর অবশিষ্ট ৫ লাখ টাকা করযোগ্য হবে। এই ৫ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর হিসাব করলে করের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৫ হাজার টাকা। অন্য দিকে ৩০ লাখ টাকা অনুপার্জিত লাভ করযোগ্য আয়ে যুক্ত হবে না।
অর্থাৎ একজন বিনিয়োগকারীর হাতে থাকা শেয়ারের বাজারমূল্য ৩০ লাখ টাকা বেড়ে গেলেও শেয়ার বিক্রি না করলে সেই ৩০ লাখ টাকা আয়করযোগ্য হবে না। কিন্তু শেয়ার বিক্রি করে প্রকৃত লাভ হলে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী করের হিসাব হবে।
‘কাগুজে লাভ’ বনাম প্রকৃত লাভ
কর ব্যবস্থায় এই পার্থক্যটি শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন, একজন বিনিয়োগকারী ৫০ লাখ টাকা দিয়ে শেয়ার কিনেছেন। বাজারদর বেড়ে তার শেয়ারের বর্তমান মূল্য হয়েছে ৭০ লাখ টাকা। এখানে ২০ লাখ টাকা অনুপার্জিত লাভ। শেয়ার বিক্রি না করা পর্যন্ত এটি প্রকৃত আয় নয়। কিন্তু শেয়ারগুলো ৭০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হলে ২০ লাখ টাকা প্রকৃত লাভ বা উপার্জিত লাভ হিসেবে বিবেচিত হবে। তখন করের বিধান প্রযোজ্য হবে। এর ফলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতের সময় ক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্য, বিক্রয়ের তারিখ এবং প্রকৃত লাভের হিসাব সংরণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাঁচ বছরের সম্পদে আলাদা কর কাঠামো
শুধু শেয়ার নয়, অন্যান্য মূলধনী সম্পদ হস্তান্তরের েেত্রও আয়কর নির্দেশিকায় পৃথক বিধান রয়েছে। কোনো মূলধনী সম্পদ অর্জন বা প্রাপ্তির পাঁচ বছরের মধ্যে হস্তান্তর করা হলে সংশ্লিষ্ট মূলধনী আয় মোট আয়ের সাথে যুক্ত হয়ে নিয়মিত করহারে করযোগ্য হতে পারে। পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর হস্তান্তরের েেত্র মূলধনী আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে করের বিধান রয়েছে।
তবে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সিকিউরিটিজ লেনদেন থেকে অর্জিত মূলধনী আয়ের েেত্র বিশেষ করহার প্রযোজ্য হওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীর সম্পদের ধরন ও লেনদেনের প্রকৃতি অনুযায়ী করের হিসাব আলাদা হতে পারে।
সম্পদ বিবরণীতে বাড়তি সতর্কতা
আয়কর রিটার্নে সম্পদ ও দায়ের বিবরণী দেয়ার েেত্রও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শেয়ারের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পেলেই সেটিকে আয় হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই। আবার সেই মূল্যবৃদ্ধিকে ব্যবহার করে নতুন সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎসও ব্যাখ্যা করা যাবে না।
এখানে আয়কর কর্তৃপরে কাছে প্রকৃত লেনদেনের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। শেয়ার কখন কেনা হয়েছে, কত টাকায় কেনা হয়েছে, কখন বিক্রি হয়েছে এবং কত টাকায় বিক্রি হয়েছেÑ এসব তথ্যের ভিত্তিতেই প্রকৃত মূলধনী লাভ নির্ধারণ করতে হবে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন করে হিসাব রাখার তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের এখন থেকে ব্রোকারেজ হাউজের লেনদেনের বিবরণী, শেয়ার ক্রয়ের মূল্য, বিক্রয়মূল্য ও সংশ্লিষ্ট খরচের নথি সংরণে আরো সতর্ক হতে হবে। কারণ বাজারদরের ওঠানামা এবং প্রকৃত আয়Ñ দুইটি এক বিষয় নয়।
এক দিকে অবিক্রীত শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি করযোগ্য আয় নয়; অন্য দিকে প্রকৃত বিক্রয় থেকে অর্জিত লাভ করের আওতায় আসতে পারে। ফলে শুধু পোর্টফোলিওর বর্তমান বাজারমূল্য দেখে আয় নির্ধারণ করলে বিভ্রান্তির সুযোগ রয়েছে।
আয়কর নির্দেশিকার এই কাঠামোতে মূলত প্রকৃতভাবে অর্জিত লাভকে করের আওতায় এবং কাগুজে মূল্যবৃদ্ধিকে আয় হিসাবের বাইরে রাখার নীতি স্পষ্ট হয়েছে। তবে করদাতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ অনুপার্জিত লাভকে আয় না দেখানোর পাশাপাশি সেটিকে সম্পদ বৃদ্ধির বৈধ উৎস হিসেবেও উপস্থাপন না করা।
শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য তাই এবারের করবর্ষে হিসাবের মূল পার্থক্যটি খুবই সরলÑ শেয়ারের দাম বাড়লেই কর নয়; কিন্তু শেয়ার বিক্রি করে লাভ হলে করের হিসাব করতেই হবে।
তথ্যবক্স
অনুপার্জিত লাভ : শেয়ার বিক্রি না করেই বাজারমূল্য বৃদ্ধির কাগুজে লাভÑ আয় হিসেবে গণ্য নয়।
উপার্জিত লাভ : শেয়ার বিক্রি করে প্রকৃতভাবে অর্জিত লাভÑ প্রযোজ্য বিধানে করযোগ্য।
নির্দেশিকার উদাহরণ : ৫৫ লাখ টাকা উপার্জিত লাভ+৩০ লাখ টাকা অনুপার্জিত লাভ।
৫০ লাখ টাকা : উদাহরণে উপার্জিত লাভের এই অংশের পর অবশিষ্ট ৫ লাখ টাকা করযোগ্য।
করহার : উদাহরণে অতিরিক্ত ৫ লাখ টাকার ওপর ১৫%=৭৫ হাজার টাকা।
সতর্কতা : অনুপার্জিত লাভ আয় না হলেও সম্পদ বৃদ্ধির উৎস হিসেবে দেখানো যাবে না।
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








