
বিশেষ সংবাদদাতা
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের পণ্য রফতানিতে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিলেছে। জুলাইয়ে সামান্য পতনের পর আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে টানা প্রবৃদ্ধি হওয়ায় জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে পণ্য রফতানি আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। তিন মাসে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে রফতানি আয় হয়েছে ৩ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই মাসের ৩ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি। আগস্টে রফতানি হয়েছিল ৪ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। জুলাইয়ে রফতানি আয় ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও আগের বছরের অস্বাভাবিক উচ্চ ভিত্তির কারণে বছরওয়ারি হিসাবে ০ দশমিক ৯ শতাংশ কম ছিল।
অর্থাৎ প্রথম প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি মূলত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে রফতানি পুনরুদ্ধারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তবে মাসভিত্তিক চিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও দেখা যাচ্ছেÑ জুলাইয়ের ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার থেকে আগস্টে রফতানি কমে ৪ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন এবং সেপ্টেম্বরে আরো কমে ৩ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। ফলে বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও মাসিক গতিশীলতা এখনো সমান নয়।
পোশাকই মূল চালিকাশক্তি
রফতানি প্রবৃদ্ধির প্রধান উৎস এখনো তৈরী পোশাক খাত। সেপ্টেম্বরে পোশাক রফতানি আয় ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগস্টে পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ। ফলে প্রথম দুই মাসেই তৈরী পোশাক খাত সামগ্রিক রফতানি বৃদ্ধির বড় অংশ বহন করেছে।
পোশাকের দুই প্রধান উপখাতÑ নিট ও ওভেনÑ উভয় েেত্রই আগস্টে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানি আগস্টে ২৬ শতাংশের বেশি এবং জুলাই-আগস্টে প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসও গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। পোশাক খাতের আগস্টের উচ্চ প্রবৃদ্ধির পেছনে আগের বছরের তুলনামূলক দুর্বল ভিত্তিও ভূমিকা রেখেছে বলে শিল্প উদ্যোক্তারা উল্লেখ করেছেন।
অ-পোশাক খাতে নতুন সম্ভাবনা
প্রথম প্রান্তিকের সবচেয়ে ইতিবাচক দিকগুলোর একটি হলো অ-পোশাক পণ্যের কয়েকটি খাতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি। আগস্টে পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি বেড়েছে ৩৭ দশমিক ০৯ শতাংশ, ওষুধে ২৮ দশমিক ৫২ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ২৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ, প্রকৌশল পণ্যে ২৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং অন্যান্য জুতায় ১৫ দশমিক ২৯ শতাংশ। জুলাই-আগস্টের হিসাবে ওষুধ রফতানি বেড়েছিল প্রায় ৩৯ শতাংশ এবং পাটজাত পণ্যে ২২ শতাংশের বেশি।
সেপ্টেম্বরে এই প্রবণতা আরো স্পষ্ট হয়েছে। মাসটিতে ফার্মাসিউটিক্যালস রফতানি বেড়েছে ৬৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে প্রবৃদ্ধি ২০ দশমিক ১৯ শতাংশ, পাট ও পাটজাত পণ্যে ২২ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং হোম টেক্সটাইলে ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ।
অর্থাৎ রফতানি বহুমুখীকরণের যে প্রয়োজন দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে, তার কিছু বাস্তব প্রতিফলন এখন পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। তবে এসব খাতের মোট রফতানি পরিমাণ পোশাকের তুলনায় এখনো অনেক ছোট। ফলে কয়েকটি খাতে উচ্চ শতাংশের প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রফতানি কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনতে হলে এই প্রবৃদ্ধিকে বহু বছর ধরে রাখতে হবে।
৬৩.৪ বিলিয়ন ডলারের ল্য কতটা দূরে
চলতি অর্থবছরে সরকার মোট রফতানির ল্য নির্ধারণ করেছে ৬৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে পণ্য রফতানির ল্যমাত্রা ৫৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার এবং সেবা খাতের ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। পণ্য রফতানিতে গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের ল্য নেয়া হয়েছে।
প্রথম তিন মাসে প্রায় ১৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। সেই হিসাবে শুধু পণ্য রফতানির বার্ষিক ৫৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ল্েয পৌঁছাতে পরবর্তী ৯ মাসে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রফতানি করতে হবে।
এখানেই মূল চ্যালেঞ্জ। প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ হলেও পুরো অর্থবছরে পণ্য রফতানিতে প্রায় ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য পরবর্তী মাসগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি আরো বাড়াতে হবে। গত অর্থবছরে পণ্য রফতানি প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল এবং ৫৫ বিলিয়ন ডলারের ল্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।
জ্বালানি সঙ্কট বড় ঝুঁকি
রফতানি প্রবৃদ্ধির বিপরীতে উৎপাদন সমতার সীমাবদ্ধতা এখনো বড় উদ্বেগ। শিল্প উদ্যোক্তারা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কথা জানিয়েছেন। আগস্টের উচ্চ প্রবৃদ্ধির মধ্যেও শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা বলেছেন, গ্যাস সঙ্কটে স্পিনিং ও উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং রফতানি প্রবৃদ্ধির একটি অংশ আগের বছরের নি¤œ ভিত্তির ফল।
এর সাথে সেপ্টেম্বরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশ ২১ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা করেছে। এর ফলে উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রফতানিমুখী শিল্পের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার েেত্র পণ্যের মূল্য, উৎপাদন সময় এবং সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতাÑ তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস, বিদ্যুৎ, সুদের হার ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
সামনে দুটি পরীা
প্রথম প্রান্তিকের পরিসংখ্যান বাংলাদেশের রফতানি খাতকে একটি মিশ্র বার্তা দিচ্ছে। একদিকে টানা দুই মাস প্রবৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি এবং ওষুধ, পাট, চামড়া ও প্রকৌশল পণ্যে শক্তিশালী অগ্রগতি ইতিবাচক। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এখনো তৈরী পোশাকনির্ভর এবং আগস্টের মতো কিছু েেত্র নি¤œ ভিত্তির প্রভাব রয়েছে।
তাই পরবর্তী মাসগুলোতে বাংলাদেশের জন্য দুটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হবে। প্রথমত, পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই হয়। দ্বিতীয়ত, অ-পোশাক খাতের বর্তমান উচ্চ প্রবৃদ্ধি কতটা বড় রফতানি আয়ে রূপ নেয়।
সরকার চলতি অর্থবছরে রফতানি বাড়াতে নতুন বাজার, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, ব্যবসা সহজীকরণ ও পণ্য বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিচ্ছে। কিন্তু ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ল্েয পৌঁছাতে এসব নীতিগত উদ্যোগের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত কাস্টমস ও বন্দরসেবা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রথম তিন মাসের ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি তাই নিঃসন্দেহে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত; কিন্তু ৫৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি ল্যমাত্রা অর্জনের জন্য এটিকে এখনো পর্যাপ্ত গতি বলা যাচ্ছে না। বরং প্রথম প্রান্তিককে সামনে থাকা বড় ল্েযর দিকে যাত্রার প্রাথমিক পরীা হিসেবেই দেখা যাচ্ছে।
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








