মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি
বাংলাদেশ ব্যাংক। ইন্টারনেট

 

Advertisement

মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও স্বস্তির জায়গায় পৌঁছেনি। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগে ধীরগতি অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে কঠিন করে তুলছে। এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথমবারের মতো তিন মাস মেয়াদি এই মুদ্রানীতিতে মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। 
গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন ডেপুটি গভর্নর ড. মো: হাবিবুর রহমান। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন নীতিতে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে রয়েছে। গত আগস্টে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হলেও বেসরকারি ঋণের চাহিদায় প্রত্যাশিত গতি এখনো দেখা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, অর্থনীতিতে মোট ঋণ বাড়লেও এর বড় অংশ সরকারি খাতে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির সর্বশেষ প্রবণতা কিছুটা ইতিবাচক। আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। তবে এটি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির বড় অংশ শুধু অতিরিক্ত চাহিদা থেকে নয়; সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজার কাঠামোর সমস্যা, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের অস্থিরতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে শুধু সুদের হার ব্যবহার করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। 
এখানেই নতুন মুদ্রানীতির সবচেয়ে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। এক দিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান ধরে রাখতে হবে, অন্য দিকে দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদহার বজায় রাখলে উদ্যোক্তাদের ঋণ নেয়ার খরচ বাড়ে। এতে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের মুদ্রানীতি পর্যালোচনাতেও কঠোর আর্থিক পরিস্থিতির কারণে বেসরকারি ঋণের চাহিদা দুর্বল হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।  তবে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো মানেই নির্বিচারে ঋণ সম্প্রসারণ নয়। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের অন্যতম সমস্যা হলো খেলাপি ঋণ ও ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। তাই উৎপাদনশীল খাতে লক্ষ্যভিত্তিক ঋণসহায়তা নিশ্চিত করা এবং একই সাথে ঋণের মান ও ব্যাংকের সুশাসন উন্নত করা জরুরি। অন্যথায় তারল্য বাড়লেও তা বিনিয়োগে না গিয়ে সম্পদমূল্য বা অনুৎপাদনশীল খাতে যেতে পারে।
তিন মাস মেয়াদি মুদ্রানীতি এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তন হলে ছয় মাস অপেক্ষা না করে মূল্যস্ফীতি, ঋণপ্রবাহ, তারল্য ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে তথ্যের দ্রুততা, নীতির স্বচ্ছতা এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর। 
সব মিলিয়ে নতুন মুদ্রানীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি কঠিন সমীকরণ সমাধানের চেষ্টা করছে- মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে, কিন্তু একই সাথে বিনিয়োগ ও উৎপাদন থামিয়ে দেয়া যাবে না। এই লক্ষ্য অর্জনে মুদ্রানীতির পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আগামী তিন মাসে মূল্যস্ফীতি ও বেসরকারি ঋণের গতিপথই দেখাবে, এই ভারসাম্য কতটা কার্যকরভাবে বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।