রাজউকের ৯০ শতাংশ ভবনই নকশাবহির্ভূত

নিজস্ব প্রতিবেদক 

Advertisement

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ ভবনই অনুমোদিত নকশা ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে, যার মোট সংখ্যা প্রায় চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ। বিশালসংখ্যক ভবন মালিক কাগজপত্রে রাজউকের অনুমোদিত নকশা (প্ল্যান) সংস্থান করলেও বাস্তবে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো ইমারত নির্মাণ করেছেন। রাজউক মাঝে মধ্যে কিছু অননুমোদিত ভবন উচ্ছেদ করলেও এই বিপুলসংখ্যক অবৈধ কাঠামোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার পর্যাপ্ত সামর্থ্য বা সক্ষমতা তাদের নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের এপ্রিলে রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যানের দেয়া তথ্যানুযায়ী, সংস্থাটির আওতাধীন এলাকায় তিন লাখ ৩৮২টি ভবন নির্মিত হয়েছে রাজউকের অননুমোদিত নকশা বা অনুমোদনহীন নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে। এর আগেও একাধিক জরিপে একই চিত্র ফুটে ওঠে। ২০১৮ সালে পরিচালিত রাজউকের এক জরিপে দেখা যায়, রাজধানীতে ১০তলার চেয়ে উঁচু এক হাজার ৮১৮টি ভবনের মধ্যে ৮৪ শতাংশ অর্থাৎ এক হাজার ৫২৭টি ভবনই নকশা লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হয়েছে কিংবা তখন নির্মাণাধীন ছিল। এ ছাড়া ২০১৮ সালের অপর এক জরিপ অনুসারে, রাজধানীতে দোতলার চেয়ে উঁচু দুই লাখ চার হাজার  ১০৬টি ভবনের মধ্যে ৯৭ শতাংশই রাজউকের অনুমোদিত প্ল্যান অনুসরণ না করে তৈরি  করা হয়েছে। 
নগর পরিকল্পনাবিদদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে যার কোনো প্রয়োগ দেখা যায় না। বাড়ি নির্মাণের সময় ভবনের মালিকরা নিজেদের সুবিধা ও বাহ্যিক সৌন্দর্য নিশ্চিত করতে ইচ্ছামতো রাজউকের নকশা লঙ্ঘন করেন। সাধারণত একটি বাড়ি নির্মাণে কমপক্ষে এক বছর সময় লাগলেও অনেক ভবনের মূল অনুমোদিত নকশার ভাঁজ পর্যন্ত খোলে না। মূল অনুমোদিত নকশাটি ড্রয়ারে বন্দী থাকে আর মাঠপর্যায়ে সাইট ইঞ্জিনিয়ারের হাতে থাকে মালিকের সুবিধা অনুযায়ী তৈরি করা নিজস্ব আরেকটি নকশা, যা দেখেই মূল নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। 
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকায় রাজউকের আওতাধীন কোথায় কোথায় নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে, তার সব খবরই রাজউকের স্থানীয় পরিদর্শকদের কাছে থাকে। নিয়মিত পরিদর্শকরা নির্মাণাধীন ভবনে যান এবং ঘুরে আসেন, কিন্তু দিনশেষে রাজউকের অভিযোগের খাতা শূন্যই থেকে যায়। প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম জোয়ারদার এই বিষয়ে জানান, নকশা পরিবর্তন করে ভবন নির্মাণ হচ্ছে কি না, তা বোঝার জন্য সাধারণ মানুষের প্রকৌশলী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না; একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলেই ধরে ফেলা যায়। তিনি জানান, একই সময়ে পাশাপাশি দু’টি ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হলে অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট ব্যবধান লক্ষ করা যায়। দেখা যাবে, এক ভবন মালিক সামনে ও দু’পাশে নির্ধারিত জায়গা ছেড়েছেন, অথচ পাশের ভবনে কোনো জায়গাই ছাড়া হয়নি। তিনি আরো উল্লেখ করেন, যেসব ভবনে রাজউকের নির্দেশিত ‘ভবন নির্মাণ সম্পর্কিত তথ্য’ লেখা সাইনবোর্ড ঝোলানো থাকে, সেগুলোতে কিছুটা জায়গা ছাড়ার প্রবণতা থাকলেও যেসব ভবনে সাইনবোর্ড থাকে না, সেখানে সামান্যতম জায়গাও ছাড়া হয় না। 
বাস্তবে নকশাবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগগুলোর বেশির ভাগই আসে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের লিখিত অভিযোগ থেকে; অথচ নিয়মিত তথ্য দেয়ার দায়িত্বে থাকা রাজউকের পরিদর্শকদের কাছ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য আসেই না বললেই চলে। উল্টো অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের একশ্রেণীর কর্মকর্তার বিশাল এক ‘আয়ের উৎস’ হলো রাজধানীর ত্রুটিপূর্ণ ও নকশা লঙ্ঘন করে গড়ে ওঠা ভবনের মালিকরা। 
রাজধানীর রামপুরা এলাকার এক বাড়িওয়ালা খোলামেলাভাবে জানান, রাজউক থেকে একবার নকশা পাস করিয়ে আনলেই কাজ শেষ। এরপর নিজের সুবিধামতো নির্মাণ করলেও কোনো সমস্যা হয় না। গলি ভেতরের বাসায় সুবিধা আরো বেশি, কারণ সেখানে রাজউকের উচ্ছেদ অভিযানের গাড়ি বা বুলডোজার পৌঁছায় না। তবে রাজউকের পরিদর্শকদের নিয়মিত ‘ম্যানেজ’ করে চলার সামর্থ্য থাকতে হয়। পরিদর্শকরা প্রায়ই তদারকির নামে আসেন, তবে সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা গলির ভেতরে কখনোই আসেন না। 
প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম জোয়ারদার জানান, অনেক সময় রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিগুলোও নকশা বিচ্যুতি ঘটায়। তবে সুপ্রতিষ্ঠিত বা বড় কোম্পানিগুলো সচরাচর এমনটি করে না, কারণ তারা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক সুনাম অক্ষুণœ রাখতে চায়। তা ছাড়া তারা নকশা অনুযায়ী যে স্থান ফাঁকা রাখে, তার সমপরিমাণ ব্যয় ক্রেতাদের কাছ থেকেই উসুল করে নেয়। তাই বড় কোম্পানিগুলোর নকশা লঙ্ঘনের প্রয়োজন পড়ে না। 
বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দৃশ্যমান স্থানে ‘ভবন নির্মাণ সম্পর্কিত তথ্য’ প্রদর্শন না করেই অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ভবন তৈরির চিত্র দেখা যাচ্ছে, যা মূলত ২০০৮ সালের আগের অনুমোদিত নকশার দোহাই দিয়ে করা হচ্ছে। ভবন তৈরি শেষ হলেই দাবি করা হয় নির্মাণকাজ বহুকাল আগেই সম্পন্ন হয়েছে। মাঝখান থেকে অনিয়ম ও তদারকিহীনতার এই সুযোগে রাজউকের মাঠপর্যায়ের অসাধু লোকজনের পকেট ভারী হচ্ছে নিয়মিত।