সীমান্তে অস্থিতিশীলতার মাঝে বিদ্যুৎ করিডোর : জাতীয় স্বার্থ রক্ষার দাবি

 নিজস্ব প্রতিবেদক

কটিহার (বিহার)-পার্বতীপুর (বাংলাদেশ)-বোরনগর (আসাম) রুটে প্রস্তাবিত ৭৬৫ কিলোভোল্ট (কেভি) ভারতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন করিডোর, ব্রহ্মপুত্র জলবিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা এবং সীমান্তে চলমান স্পর্শকাতর পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাগরিক সংগঠন ‘জানা-জাতীয় স্বার্থে নাগরিক’ (সিএনআই)। গতকাল সোমবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এ কথা বলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বিবৃতিতে এই ৭৬৫ কেভি করিডোরের প্রাথমিক সম্মতি প্রকাশের পর ২০২০ সালে ভারতের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় এটি অনুমোদন করে। পরে বিভিন্ন যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠক শেষে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ২০২৮ সালকে লক্ষ্য সমাপ্তিকাল ধরে প্রকল্পটি দ্রুত এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। ‘জানা’-র প্রতিনিধিরা জানান যে তারা কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের অন্ধ বিরোধিতা করছেন না বরং জাতীয় সুরক্ষা, তথ্য প্রকাশ ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার তাগিদ দিচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের সীমান্তে চলমান বিএসএফের সহিংসতা ও অন্যায্য পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, একদিকে সীমান্তে একতরফা পুশ-ইন অব্যাহত রয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বেড়া নির্মাণ সংক্রান্ত ৩৯টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করেছে। একই সাথে সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশীদের প্রাণহানি বন্ধ হয়নি- আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, কেবল ২০২৫ সালেই ৩৪ জন বাংলাদেশী বিএসএফের হাতে নিহত হয়েছেন। এই চরম অস্থিতিশীল সীমান্ত পরিস্থিতির মাঝেও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবকাঠামো চুক্তিতে প্রবেশের আগে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার শতভাগ নিশ্চয়তা দাবি করা দেশের পূর্ণ অধিকার বলে মনে করে ‘জানা’।
প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ করিডোরটি ভারত-বাংলাদেশের অতি সংবেদনশীল অঞ্চল শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেন নেক এলাকার মধ্য দিয়ে যাবে। মাত্র ১৭ থেকে ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই সঙ্কীর্ণ ভূখণ্ডটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোকে যুক্ত করেছে, যা বৈশ্বিক ও ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ চোকপয়েন্ট হিসেবে পরিচিত। সংগঠনটির মতে, এই বিদ্যুৎ করিডোর কেবল একটি সাধারণ প্রযুক্তিগত ট্রানজিট রুট নয় বরং অতি স্পর্শকাতর ভূ-কৌশলগত অঞ্চল হওয়ায় বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নেয়া উচিত।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রবাহমান ৫৪টি অভিন্ন নদীর অববাহিকা ব্যবস্থাপনা এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি আগামী ২০২৬ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ হতে চলেছে, কিন্তু এর নবায়ন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অন্য দিকে সকল আন্তর্জাতিক চুক্তি কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও ১৯৮৩ ও ২০১১ সালের তিস্তা চুক্তি প্রচেষ্টা কেবল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আপত্তিতে ঝুলে আছে। এর ফলে রংপুর অঞ্চলের তিস্তা অববাহিকার প্রায় তিন কোটি মানুষ বছরের পর বছর ধরে শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানি সঙ্কটে ভুগছেন। 
দ্বিপক্ষীয় চুক্তির এমন অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশ ২০২৫ সালে জাতিসঙ্ঘের ‘ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াটারকোর্সেস কনভেনশন’-এ যোগ দিয়েছে, যাকে ‘জানা’ সাধুবাদ জানায়। একইভাবে, বিদ্যুৎ করিডোরের ক্ষেত্রে কেবল ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি না করে নেপাল, ভুটান ও চীনকে যুক্ত করে একটি সর্বজনীন আঞ্চলিক কাঠামোর অধীনে চুক্তি সম্পাদনের দাবি জানানো হয়।
বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট ও অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহারের সুযোগ দিলেও নেপাল ও ভুটানকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেয়া সংক্রান্ত বিবিআইএন প্রস্তাব ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহারের জটিলতায় থমকে আছে। তবে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারত-নেপাল-বাংলাদেশ ত্রিপক্ষীয় বিদ্যুৎ চুক্তির অধীনে নেপাল ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রফতানি শুরু করে বহুপক্ষীয় বাণিজ্যের নজির গড়েছিল, যা বর্তমানে ভারত স্থগিত রেখেছে।
এ ছাড়া ২০২৫ ও ২০২৬ সালে নেপালে সংঘটিত হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত আকস্মিক ভয়াবহ বন্যার উদাহরণ দিয়ে বলা হয়- উজানের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনো সীমানা মানে না। ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা অববাহিকায় ভারতীয় বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও করিডোর বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ বড় ধরনের নদী ও পরিবেশগত ঝুঁকিতে পড়বে। তাই কোনো আঞ্চলিক পূর্বাভাস ও সমন্বিত তথ্য-বিনিময় ব্যবস্থা ছাড়া বাংলাদেশ একা এই পরিবেশগত ঝুঁকি বহন করতে পারে না বলে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।