
প্লেটোর রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে এমন এক গ্রন্থ, যার মূল প্রতিপাদ্য আড়াই হাজার বছর পরও আমাদের ভাবায়। প্লেটোর সিদ্ধান্ত স্পষ্ট : দার্শনিকরা যতদিন শাসক না হবেন, অথবা শাসকরা যতদিন দার্শনিক না হবেন, ততদিন রাষ্ট্রের দুর্দশার অবসান নেই। তিনি দেখিয়েছেন, ছায়াকে সত্য ভেবে অভ্যস্ত মানুষ আলোর দিকে ফিরতে চায় না; শিক্ষার কাজ হলো সেই মুখ ফেরানো। তাই তার কল্পিত রাষ্ট্রে শিক্ষা কেবল পেশা তৈরির কারখানা নয়; এটি চরিত্র গঠনের, নাগরিক ও নেতৃত্বকে পরিশুদ্ধ করার প্রক্রিয়া। এই ভাবনাকেই আমরা বলতে পারি ‘প্রজ্ঞায় মুক্তি’। মুসলিম রাষ্ট্রদার্শনিক আল-ফারাবি তার ‘আদর্শ নগরী’ ধারণায় একই সুরে বলেছেন, রাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকবেন জ্ঞান ও নৈতিকতায় অগ্রগণ্য ব্যক্তি। ইবনে খালদুন মুকাদ্দিমায় দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রের উত্থান-পতন নির্ভর করে সামাজিক সংহতি (আসাবিয়া) ও নৈতিক ভিত্তির ওপর। অর্থাৎ প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের চিন্তায় একটি জায়গায় মিল আছে : রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতার কাঠামো নয়, প্রজ্ঞারও কাঠামো। প্রজ্ঞার এই আদর্শ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠে কতটা আছে এবং সেই পাঠ বাস্তবে কতটা প্রয়োগ হচ্ছে, আজকের প্রশ্ন সেটিই।
আরো পড়ুন—ভোট চুরির দায়ে মোদির পতন কি আসন্ন?
তবে তত্ত্ব তত্ত্বই থাকলে তার মূল্য সীমিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আসল পরীক্ষা হলো বাস্তবে তার প্রয়োগ, অনুসরণ ও রূপান্তর। ইমানুয়েল কান্ট অবশ্য প্লেটোর চেয়ে বেশি সতর্ক ছিলেন। তার মতে, রাজা দার্শনিক হবেন, এমনটা আশা করা যেমন কঠিন, তেমনি কাম্যও নয়, কারণ ক্ষমতা যুক্তির স্বাধীন বিচারকে কলুষিত করে। কিন্তু রাজারা যেন দার্শনিকদের কণ্ঠ রোধ না করেন; বরং শোনেন, এই দাবি তিনি করেছেন। এখানেই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকার দার্শনিক ভিত্তি। দার্শনিক-রাজা নয়, প্রজ্ঞাবান পরামর্শক; ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান। হ্যারল্ড ল্যাসওয়েল যখন নীতি-বিজ্ঞানের কথা বলেছিলেন, তখন এই প্রয়োজনের কথাই বলেছিলেন : জ্ঞান যেন নীতিনির্ধারণের টেবিলে পৌঁছায়।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জাতি ও রাষ্ট্র নির্মাণের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রমাত্রই জানেন, জাতি, জাতীয়তা ও জাতিরাষ্ট্র এক ধারণা নয়। আর্নেস্ট গেলনার জাতীয়তাবাদকে দেখেছেন সংস্কৃতির সাথে রাজনৈতিক একতার মিলন হিসেবে, বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতিকে বলেছেন কল্পিত সম্প্রদায়, আর অ্যান্থনি স্মিথ জাতীয় পরিচয়ের শিকড় খুঁজেছেন সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও ইতিহাসে। ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি থেকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার যাত্রা শুরু হলেও জাতিরাষ্ট্র গড়ে উঠতে লেগেছে কয়েক শতাব্দী। ফরাসি বিপ্লব ও আলোকায়ন জনগণের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিকত্বকে রাষ্ট্রের বৈধতার কেন্দ্রে এনেছে। জাতিরাষ্ট্র তাই এক দিনের ঘটনা নয়; শতাব্দীর যুদ্ধ, দরকষাকষি ও চিন্তার পরিণতি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জাতিরাষ্ট্র নির্মাণের প্রক্রিয়া এখনো চলমান। আমাদের পরিচয়ের দু’টি স্তর আছে। একটি স্তর ভাষা ও ইতিহাসের, যেখানে আমরা বাঙালি; অন্যটি নাগরিকত্ব ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার, সেখানে আমরা বাংলাদেশী। এই ভূখণ্ডে নানা ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করেন; পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোও আমাদের বহুত্বেরই অংশ। বাঙালি-বাংলাদেশী পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক জাতীয় ঐক্যে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করেছে। সংবিধানের ৬(২) অনুচ্ছেদে নাগরিকের পরিচয় নিয়ে যে আলোচনা, তার সারকথাও এটাই : রাষ্ট্রীয় পরিচয় এমন হওয়া চাই, যেখানে কেউ নিজেকে বাইরের মনে না করেন। বাংলাদেশী জাতীয়তা তাই ভাষা-সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য মুছে ফেলার নাম নয়; বরং সেই স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে অভিন্ন রাজনৈতিক নিয়তি ভাগ করে নেয়ার অঙ্গীকার। বাগানে নানা রঙের ফুল ফুটলে যেমন বাগানই সমৃদ্ধ হয়, বহুত্বও তেমনি রাষ্ট্রের শক্তি।
কিন্তু শুধু পরিচয়ের স্বীকৃতিতে জাতিরাষ্ট্র দাঁড়ায় না; তার জন্য চাই নাগরিকের আস্থা, আর আস্থা অর্জিত হয় রাষ্ট্রের আচরণে। নাগরিক যখন ভোট দিয়ে নিজের মতের প্রতিফলন দেখেন, বিচারের দরজায় গিয়ে সমান আচরণ পান, দারিদ্র্য ও বেকারত্বের মুখে রাষ্ট্রের সুরক্ষা অনুভব করেন এবং ভিন্নমতকে অপরাধ নয়, বৈধ অধিকার হিসেবে দেখতে পান, তখনই রাষ্ট্র তার কাছে ‘আমার’ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ জাতিরাষ্ট্রের আসল ভিত্তি বৈধতা। আবেগ দিয়ে সংহতি তৈরি হয়; কিন্তু তাকে টিকিয়ে রাখে প্রতিষ্ঠান। নির্বাচন, সংসদ, বিচার, প্রশাসন, জনকল্যাণ ও বহুত্বের মর্যাদা— এই প্রশ্নগুলোর প্রতিটিই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চিরায়ত আলোচ্য। তাই জাতিরাষ্ট্র গড়ার প্রায় সব প্রশ্নের সূত্র রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাণ্ডারেই পাওয়া যায়।
প্রশ্ন হলো, এই ভাণ্ডার কি আমাদের রাষ্ট্র কাজে লাগাতে পেরেছে? বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চর্চা আছে; কিন্তু তার বাস্তবতা ও কার্যকারিতা প্রায় অনুপস্থিত। একটি তুলনা দেয়া যাক। অর্থনীতিবিদদের একটি সমিতি আছে। বাজেট বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে নানা অর্থনৈতিক প্রশ্নে তারা রাষ্ট্রকে পরামর্শ দেয়, প্রকাশ্যে অভিমত জানায়; সরকার তা গ্রহণ করুক বা না করুক, সেই আলোচনা জনপরিসরে গুরুত্ব পায়। অথচ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই, যা নৈর্ব্যক্তিকভাবে, অ্যাকাডেমিক মানদণ্ডে এবং ব্যবহারযোগ্য উপায়ে সরকারকে সহায়তা করতে পারে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতি নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, যার সাথে প্রায় সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত ছিল; কিন্তু শেষ দিকে, বিশেষ করে এক-এগারোর সময়ে, রাজনৈতিক দলীয় প্রভাবের অভিযোগে সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তার পর থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে দিকনির্দেশনা দেয়া বা পরামর্শ দেয়ার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থাই আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। এই ব্যর্থতার পেছনে বড় কারণ দলীয়করণের প্রবণতা। রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ অনুগত বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। ফল হয়েছে দ্বিমুখী : রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বিভক্ত হয়েছেন, আর পাঠ্যসূচির ভেতরেই সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এমনকি সেই পাঠ্যসূচিও আধুনিক বিশ্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়; সর্বশেষ তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিকাশ সেখানে ঠাঁই পায়নি। এটি এক বড় ব্যর্থতা।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়লেই রাষ্ট্র ভালো চলবে, এমন দাবি কেউ করে না; কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান অবশ্যই দিকনির্দেশনা দিতে পারে। বিশ্বের নানা দেশে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের স্বার্থে, দেশপ্রেমের তাগিদে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয় এবং তাদের নানা দায়িত্ব দেয়। পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের সময় নির্দিষ্ট দেশভিত্তিক বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হয়। মিয়ানমারের জন্য একটি কমিটি, কানাডার জন্য আরেকটি; এভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকদের সাথে নিরন্তর যোগাযোগ রেখে নীতি তৈরি হয়। ব্রুকিংস বা চ্যাথাম হাউজের মতো থিংক ট্যাংকের ভূমিকা সেই সংস্কৃতিরই ফসল। আমাদের দেশে এই ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। ফলে উত্তম নাগরিক তৈরির প্রক্রিয়া, উত্তম রাষ্ট্র গড়ার প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানভিত্তিক অনুসরণ-অনুকরণ ব্যাহত হয়েছে। এটি আমাদের দুর্ভাগ্য।
আরেকটি বৈপরীত্য চোখে পড়ার মতো। সংখ্যার হিসাবে বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চর্চা ব্যাপক। অসংখ্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ আছে, প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক হচ্ছেন; কিন্তু সেই বিপুল আয়োজনের ফলাফল প্রায় শূন্য। গবেষণার মান নিম্ন, প্রকাশনা অপ্রতুল, নীতিনির্ধারণে প্রভাব নগণ্য। ইবনে খালদুনের ভাষায়, জ্ঞানের যদি সংহতি না থাকে, তবে তা সমাজকে আলোকিত করতে পারে না। আমাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান সংখ্যায় বহু; কিন্তু সংহত নয়; বিস্তৃত, কিন্তু প্রভাবশালী নয়।
তাহলে করণীয় কী? আমার মতে, দেশব্যাপী রাষ্ট্রবিজ্ঞানভিত্তিক একটি স্বায়ত্তশাসিত, নিরপেক্ষ ও অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে নৈর্ব্যক্তিক পরামর্শ পৌঁছে দেবে; সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কার ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে গবেষণা করবে; আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করবে; পাঠ্যসূচিকে আধুনিক বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নেবে এবং নাগরিক শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রাখবে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি শর্তের ওপর : সদস্য নির্বাচনে মেধা ও গবেষণার মানদণ্ড, দলীয় প্রভাবমুক্ত স্বাধীন কাঠামো, প্রতিবেদন ও মতামত প্রকাশে স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রের তরফ থেকে পরামর্শ শোনার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাজনৈতিক দলগুলোকেও বুঝতে হবে, বুদ্ধিজীবীকে দলের লেজুড় বানালে ক্ষণস্থায়ী সুবিধা মেলে; কিন্তু রাষ্ট্র হারায় তার সবচেয়ে মূল্যবান বিবেচনাশক্তি।
এই কাজটি অবশ্যই প্রজ্ঞা, বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা ও পাণ্ডিত্যের সাথে সম্পন্ন করতে হবে। কারণ সমালোচনার চেয়ে নির্মাণ কঠিন, আর পরামর্শের চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন কঠিনতর।
প্লেটোর শিক্ষা থেকে আজকের বাংলাদেশে ফিরে এলে একটি সত্য স্পষ্ট হয় : প্রজ্ঞাহীন ক্ষমতা অন্ধ, আর ক্ষমতার পাশে ঠাঁই না পাওয়া প্রজ্ঞা বন্ধ্যা। কান্টের সতর্কবাণী মনে রেখেই বলা যায়, আমাদের দরকার দার্শনিক-রাজা নয়, দার্শনিকের কণ্ঠকে শোনার মতো রাষ্ট্রীয় বিনয়। যে রাষ্ট্র তার জ্ঞানী সন্তানদের প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে পারে না, সে রাষ্ট্র আসলে প্রদীপ জ্বালিয়ে ঘরের বাইরে রেখে আসে। জাতিরাষ্ট্র গড়ার কাজ এক দিনের নয়; এটি এক নিরন্তর যাত্রা, যার পাথেয় ঐক্য, ন্যায় ও প্রজ্ঞা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ যতদিন প্রায়োগিক বাস্তবতায় রূপ না পাবে, ততদিন তা কেবল পাঠ্যপুস্তকের শোভা হয়েই থাকবে। সেই প্রজ্ঞাকে প্রাতিষ্ঠানিক ঠিকানা দেয়াই হোক আমাদের নতুন অঙ্গীকার।
লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








