
ভারতে বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা মিলে এমন এক সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে, যার ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের অস্তিত্ব নিয়ে টান পড়েছে। ভারতের বেকার তরুণ ও শিক্ষার্থী, যারা সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছিল— তারা এখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে সোচ্চার। তারা তাকে ‘ভোট চোর’ বলে অভিহিত করেছে।
তরুণদের রাস্তায় নেমে আসার প্রথম কারণ ছিল ভারতের মেডিক্যাল কলেজগুলোর প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনিয়ম ও দুর্নীতি। এর ফলে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং হতাশ অনেক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। ভারতের প্রধান বিচারপতি বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বলে সম্বোধন করেন; কিন্তু একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া কেউ আশা করেনি। তবে পরিস্থিতিকে বিস্ফোরক করে তোলার মূল অনুঘটকটি ছিল ২৩ সেপ্টেম্বর ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত ঋতিকা চোপরার একটি প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই নির্বাচন কমিশনার প্রকাশ্যে তাদের প্রধান তথা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে, তিনি বেআইনিভাবে ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি (১৩০ মিলিয়ন) ভোটারের নাম মুছে ফেলেছেন। এই নাম মুছে ফেলার ঘটনাটি বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফল বিজেপির পক্ষে আনতে সাহায্য করেছিল।
মোদি যে তার নির্বাচনী কৌশলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভকে কোনোভাবেই পতন হতে দিতে চান না, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তিনি বিক্ষোভকারীদের দমাতে আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেন। তিনি জম্মু ও কাশ্মিরের মতো গোলযোগপূর্ণ এলাকা এবং পাকিস্তান সীমান্তের মতো সংবেদনশীল এলাকায় মোতায়েন আধা সামরিক বাহিনীর সৈন্যদেরও নিয়ে এসেছিলেন। তাদের সাথে রাস্তায় যোগ দিয়েছে হিন্দুত্ববাদী শিবিরের ক্যাডার বাহিনীসহ দিল্লির পুলিশ বাহিনী। তারা সদ্য গঠিত রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তারা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
আরো পড়ুন—শেখ হাসিনার সেই ভিডিও তাহসিফ ধারণ করেননি : জুলকারনাইন সায়ের
এ দিকে ‘তেলাপোকা’ বলে অভিহিত এই তরুণদের বড় অংশই এসেছে সাধারণ শ্রেণী থেকে। ফলে শাহিনবাগের ২০২০ সালের নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলনের সময় যে কৌশল মোদি ব্যবহার করেছিলেন, তা এখন আর কার্যকর হচ্ছে না। শাহিনবাগের সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন মূলত সাহসী মুসলিম নারীরা। ওই পুরো পরিস্থিতি এমন একসময়ে ঘটেছে যখন কোভিড-১৯ মহামারী এবং ডোনাল্ট ট্রাম্পের গুজরাট সফরের মতো ঘটনাগুলো একে অপরের সাথে মিলেমিশে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। যে সময়ে ট্রাম্প হেরে যান এবং জো বাইডেন নির্বাচনে জয়ী হন, যদিও ট্রাম্প পরে ভিন্ন পরিস্থিতির অবতারণা করেছিলেন। এরপর ট্রাম্প আবার ভারত সফরে আসেন যখন দু’জন মুসলিম ছাত্রনেতা উমর খালিদ এবং সারজিল ইমামকে ভারতে দমন-পীড়নের সময় ছয় বছর আগে আটক করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে তারা কারাগারে বন্দী জীবন যাপন করছেন।
‘ককরোচ (তেলাপোকা) আন্দোলনটি এমন কিছু মূল লক্ষ্য তুলে ধরেছে, যা নিয়ে ভারতীয়রা দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্ন দেখে আসছে; আর এর মাধ্যমেই আন্দোলনটি এখন গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে বিনাবিচারে কারাবন্দী উমর খালিদ সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডভিত্তিক ‘ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডারস’ সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত ‘ঝুঁকিতে থাকা মানবাধিকার রক্ষাকারীদের জন্য ২০২৬ সালের পুরস্কার’ (এশিয়া-প্যাসেফিক অঞ্চল) অর্জন করেছেন। দিল্লি পুলিশ এবং হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর যৌথবাহিনীর নির্মমতা বর্তমান আন্দোলনকারীদের ওপর যেভাবে নেমে এসেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বিশেষ করে তরুণীদের ওপর তারা একাধিকবার হামলা চালিয়েছে। এই আন্দোলন মোদি প্রশাসন এবং বিরোধী দল উভয়ের জন্যেই একটি অত্যন্ত সঙ্কটময় মুহূর্ত তৈরি করেছে।
জাতীয় রাজনীতির বাম ধারার সাহসী তরুণ নেত্রী নেহা বোরা এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র। ব্যাপক রাজনৈতিক সমর্থন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে চলমান এই সম্মিলিত লড়াইকে আরো শক্তিশালী করেছে।
বিরোধী শিবিরে মূলত আম আদমি পার্টি (আপ) ও কংগ্রেসের মধ্যে ছাত্রদের দাবির প্রতি করে অঙ্গীকার বেশি, তা নিয়ে কিছুটা মতভেদ বা বাগবিতণ্ডা দেখা গেছে। তবে এর পেছনে মূলত পাঞ্জাবে রাজনৈতিক সুযোগ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে, যেখানে আগামী বছরের শুরুর দিকে তারা একে অপরের মুখোমুখি হবে। নিরপেক্ষভাবে বলতে গেলে, ‘ভোট চুরির’ বিরুদ্ধে এই প্রচারণার সূচনা হয়েছিল ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাহুল গান্ধীর হাত ধরে। সে সময় এমন দু’টি আইন পাস করা হয়েছিল, যেগুলো যেকোনো কার্যকর গণতন্ত্রে কলঙ্কজনক ও অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতো। মোদি নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনেন, তিন নির্বাচন কমিশনার বাছাইকারী তিন সদস্যের কমিটি থেকে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে নিজের মন্ত্রিসভার একজন মন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করেন। ফলে বিরোধী দলের উপস্থিতি অর্থহীন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া তিনি নিজের পছন্দের নির্বাচন কমিশনারকে তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনি চ্যালেঞ্জ থেকে আজীবন দায়মুক্তি দেন। এই পদক্ষেপটি মোদির পক্ষে কাজ করেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন মোদির সাম্প্রদায়িক প্রচার এবং অর্থের প্রভাবকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে। এটি না ঘটলে হয়তো তিনি ২৪০টি আসন পেতেন না— যা সংখ্যাগরিষ্ঠ তা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়েও ৩২টি কম ছিল।
‘ককরোচ’ আন্দোলনটি এমন সব লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা নিয়ে ভারতীয়রা দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্ন দেখে আসছে; আর এভাবেই এই আন্দোলনটি তার গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। অবসর-পরবর্তী পুরস্কার হিসেবে কোনো প্রধান বিচারপতিকে রাজ্যসভার আসন দেয়া যাবে না— এই মর্মে একটি ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মূলত সেই প্রধান বিচারপতির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যিনি বিতর্কিত রায় দিয়েছিলেন। ‘দ্য ককরোচ এজেন্ডা’ নামক গোষ্ঠীটি নির্বাচন কমিশনারকে সতর্ক করে বলেছে, ‘যদি কোনো বৈধ ভোট তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়, তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ‘আনলফুল অ্যাক্টিভিটিস’ (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট বা (ইউএপিএ)-এর অধীনে গ্রেফতার করা হবে; কারণ ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া ‘সন্ত্রাসবাদের চেয়ে কম কিছু নয়।’
ককরোচ জনতা পার্টি নারীদের জন্যে পার্লামেন্টে ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের (বর্তমানে প্রতিশ্রুত ৩৩ শতাংশের পরিবর্তে) পক্ষে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা মনে করে, মোদির প্রতি অনুগত বলে পরিচিত টিভি চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দেয়া উচিত। ‘স্বাধীন গণমাধ্যমের পথ প্রশস্ত করার জন্যে গৌতম আদানির গ্রুপ এবং মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকানাধীন মিডিয়া হাউজের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। ‘মোদি মিডিয়ার’ (সরকারপন্থী গণমাধ্যম) উপস্থাপকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
কংগ্রেসের মতো রাজনৈতিক দলগুলো যারা বিজেপিতে নেতাদের দলত্যাগের কারণে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তাদের জন্য ‘দ্য ককরোচেস’ একটি স্বস্তির প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের মতে, ‘যেকোনো বিধায়ক (এমএলএ) বা সংসদ সদস্য (এমপি) যদি এক দল থেকে অন্য দলে যোগ দেন, তবে তাকে ২০ বছরের জন্যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং কোনো সরকারি পদে আসীন হওয়া থেকে নিষিদ্ধ করা হবে।’ এ ছাড়া ‘দ্য ককরোচেস’ আরটিআই আইনের অধীনে জবাবদিহি করতে এবং কোনো বেনামী অনুদান গ্রহণ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এটি স্পষ্ট যে, দ্য ককরোচেসের কর্মসূচির বড় একটি অংশ গড়ে উঠেছে রাহুল গান্ধীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রচারণার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ভারতের এই সঙ্কটময় মুহূর্তে নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়া কি আদৌ কোনো উপকারে আসবে? বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গে একে অপরের ওপর অবিশ্বাসের পরিণতি হয়েছিল বিপর্যয়কর, যা ‘ইন্ডিয়া’ জোটের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। রাহুল গান্ধী মনে করেন, মোদি এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা শিগগির আইনের মুখোমুখি হবেন। তিনি চাইলে নতুন প্রজন্মের শক্তির ওপর আস্থা রাখতে পারেন। নেহরুর আমল থেকেই দলীয় রাজনীতি কংগ্রেসের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নরেন্দ্র মোদি সরকার এবং বিজেপি সেভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সুরক্ষা দিয়েছে এবং তাকে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের কাছে পৌঁছানোর অযোগ্য করে তুলেছে, তা দেশকে এক অসাধারণ সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। জ্ঞানেশ কুমার দৃঢ়তার সাথে কাজ করেছেন। তারা ভারতীয় রাজনীতিকে এমনভাবে গঠন করতে চেয়েছিলেন, যাতে মুসলিমদের কোনো কণ্ঠস্বর না থাকে।
ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ভোটার বাদ দেয়া কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি নয়। কমিশন হিন্দুত্ববাদী শক্তির কর্তৃত্ববাদী লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করেছে। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর একটি প্রযুক্তি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তৈরির চেষ্টা। মোদি নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফলকে ইচ্ছেমতো তৈরি করার জন্য পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার পদক্ষেপ নিয়েছেন। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত টিএন সেশান ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। তখন নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠেনি।
এখন থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়েছে। দিল্লি, মোম্বাই, চেন্নাই, উত্তর কলকাতা থেকে ভোটার বাদ পড়ার হার ছিল যথাক্রমে ৩৩, ৩৫, ৩৫ ও ২৬ শতাংশ। ২০১৪ সাল থেকে চলা নির্বাচন কৌশলের কারণে এই জঘন্য অবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রতিনিয়ত ভোট হলেও পরিকল্পিতভাবে ভোটের মাঠ অসম করে রাখা হয়। প্রথমে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও অর্থের দাপট দিয়ে এটি শুরু হয়। পরে নির্বাচন কমিশন সিবিআই ও ইডিকে ব্যবহার করে এই প্রক্রিয়াকে পাকাপোক্ত করা হয়।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ইতোমধ্যে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাগুলো ভেঙে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনারের অধীনে সব নির্বাচনই অবৈধ। বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এই শাসনকে ভারতীয় গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী একটি গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই গোষ্ঠীতে রয়েছে করপোরেট সংস্থা, গৌতম আদানি, মোহন ভাগভত, নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, অজিত দোভাল এবং জ্ঞানেশ কুমার। তাই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগই যথেষ্ট নয়, এ জন্য মোদিকেও পদত্যাগ করতে হবে।
লেখক : যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








