
ইয়েমেনের হাউছিদের ভাণ্ডারে রয়েছে বিচিত্র ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিশাল সমাহার। এসব অস্ত্রের জোরে তারা সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চালাতে সক্ষম। সৌদি আরব ও দেশটির সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেন সরকার এখন সেই সক্ষমতারই মুখোমুখি হচ্ছে।
পাকিস্তানের পুরোনো ইংরেজি দৈনিক ডন শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) এএফপির বরাত দিয়ে এ খবর জানায়।
পাল্টাপাল্টি হামলার কৌশল
গত সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরগুলোতে হামলা চালাচ্ছে হাউছিরা। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরও। সেখানে ২০ দফা হামলা চালিয়েছে তারা। তবে মদিনা ও মক্কায় হামলার চেষ্টা করেও সফল হয়নি বলে দাবি সৌদি আরবের।
চার বছরের যুদ্ধবিরতির পর আবারো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরে সৌদি আরবের বোমা হামলা। গত জুলাইয়ে হাউছি প্রতিনিধিদলকে বিমানবন্দরে অবতরণ করতে বাধা দিতে সৌদি বাহিনী ওই হামলা চালায়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ এপ্রিল লংলি অ্যালি বলেন, এরপর থেকে দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে আসছে।
তাঁর ভাষায়, ‘হাউছিরা এই অভিযানকে অবরোধের জবাবে অবরোধ, বিমানবন্দরের জবাবে বিমানবন্দর এবং উত্তেজনা বৃদ্ধির জবাবে আরো উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে তুলে ধরছে।’ অর্থাৎ, ঢিলটি মারলে পাটকেলটি খেতে হবে।
নানা ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন
হাউছিদের অস্ত্রভাণ্ডারে রয়েছে বিভিন্ন পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে বাব আল-মান্দেব প্রণালীর বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় এসব অস্ত্র ব্যবহার করছে তারা।
২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের সময় হাউছিরা দেশটির সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারের একটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। পাশাপাশি চোরাই পথে আনা অস্ত্রব্যবস্থা এবং পাচার করে আনা যন্ত্রাংশ দিয়ে নিজেরা তৈরি করা অস্ত্রও তাদের ভাণ্ডারে রয়েছে। উন্মুক্ত গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান জেনসের কৌশলগত অস্ত্র বিশ্লেষক নিরঞ্জন বিএস এ কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এসব অস্ত্র ও যন্ত্রাংশের বড় অংশ আরব সাগর দিয়ে ইয়েমেনে ঢুকেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সামরিক সক্ষমতাবিষয়ক তথ্যভাণ্ডার অনুযায়ী, হাউছিদের হাতে মাঝারি পাল্লার বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এগুলোর কয়েকটি ইরানি নকশার আদলে তৈরি। এর মধ্যে রয়েছে খাইবার শেকান।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, হাউছিদের কাছে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। এর মধ্যে আছেফ নামের জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রটি ইরানের খালিজ ফার্স শ্রেণির ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে তৈরি।
জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মূলত সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজে আঘাত হানার জন্য তৈরি। তবে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র স্থলভাগের লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধেও ব্যবহার করা যায়। কোন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কী ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো সম্ভব, তা নির্ভর করে সেটির নকশা ও প্রযুক্তির ওপর।
এ ছাড়া ইরানের কুদস শ্রেণির বিভিন্ন ধরনের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও হাউছিদের হাতে রয়েছে। উইলসন সেন্টারের ধারণা, এর মধ্যে কুদস-৪ সংস্করণটি প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
হাউছিদের ভাণ্ডারে আকাশ ও সমুদ্রে চলাচলে সক্ষম বিভিন্ন ধরনের ড্রোনও রয়েছে। এগুলোর অন্তত কয়েকটি ইরানি নকশা অনুসরণ করে তৈরি। নিরঞ্জন বিএসের মতে, ওয়ায়েদ-১ ও ওয়ায়েদ-২ নামের আকাশযান দুটি যথাক্রমে ইরানের শাহেদ-১৩১ ও শাহেদ-১৩৬ একমুখী আক্রমণকারী ড্রোনের স্থানীয় সংস্করণ।
ইরানের সহায়তা
মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান সরবরাহের মাধ্যমে ইরান হাউছিদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহায়তা দিয়েছে।’
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের যন্ত্রাংশ ইরানে নকশা ও তৈরি করা হয়। পরে ছোট নৌযান, পণ্যবাহী জাহাজ কিংবা ওমান-ইয়েমেন সীমান্ত দিয়ে সেগুলো পাচার করে ইয়েমেনে নেয়া হয়। সেখানে যন্ত্রাংশ জোড়া লাগিয়ে অস্ত্র তৈরি করা হয়।
২০২৪ সালের জুনে হাউছিদের সাথে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে চীনে এক ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়টির অভিযোগ, ইয়েমেনের ভেতরে উন্নত প্রচলিত অস্ত্র তৈরির উপকরণ সংগ্রহে ওই ব্যক্তি ‘গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা’ রেখেছিলেন।
দীর্ঘদিন লড়াই চালানোর সক্ষমতা
বহু বছর ধরে সংঘাতের মধ্যে টিকে থাকা হাউছিরা আরো দীর্ঘ সময় নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার ব্যবহার করে লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের এপ্রিল লংলি অ্যালি বলেন, ‘হাউছিদের ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, সৌদি, মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর ভয়াবহ বিমান হামলার মুখেও তারা অতীতে টিকে থেকেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এই গোষ্ঠীর দীর্ঘ লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আর সৌদিদের তুলনায় তাদের হারানোর মতো সম্পদও অনেক কম।’
লংলি অ্যালির মতে, ‘হাউছিরা সম্ভবত হিসাব করছে, তারা আরো দীর্ঘ সময় লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে। কারণ, এ ধরনের হামলার আঘাত সহ্য করতেই তারা অভ্যস্ত।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








