গ্রিনহাউজ গ্যাস শূন্যে নামলেও গরিব দেশগুলো সুবিধাবঞ্চিতই থাকবে

 দ্য গার্ডিয়ান 
বিশ্বজুড়ে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমিয়ে শূন্যতে নামিয়ে আনা হলেও জলবায়ু সঙ্কটের বৈষম্যমূলক প্রভাব সহজে দূর হবে না। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনার পর যে সুফল পাওয়া যাবে, বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো, বিশেষ করে ক্রান্তীয় বা ট্রপিক্যাল অঞ্চলের মানুষ সেই সুবিধা ভোগ করবে সবার শেষে। 
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্যারিস চুক্তির পরোক্ষ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের এই বৈষম্যমূলক প্রভাব রাতারাতি বিপরীতমুখী হবে না। এমনকি যদি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড সরিয়ে নেয়ার মাধ্যমে ‘নেট-নেগেটিভ নির্গমন’ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়, তবুও এই অসমতা দূর হতে কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে। 
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের ড. অ্যান্ড্রু কিংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ লেটার্স সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষক দলটি গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন শূন্যে পৌঁছালে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা কিভাবে পরিবর্তিত হতে পারে তা নিয়ে তিন ধরনের কম্পিউটার মডেলিং বিশ্লেষণ করেছেন এবং প্রাপ্ত ফলাফলের সাথে বিভিন্ন দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির তুলনা করেছেন। 
গবেষণার ফলাফল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ড. অ্যান্ড্রু কিং জানান, আমরা যদি নেট জিরোর কাছাকাছি কোনো পথ অনুসরণ করি, তবে বর্তমানে আমরা যে বৈষম্যমূলক উষ্ণায়ন দেখছি তা অনির্দিষ্টকালের জন্য বহাল থাকবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেসব ধনী দেশ জলবায়ু সঙ্কটের পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী, তারা কিন্তু এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নয়; বরং যেসব অঞ্চল নির্গমনের জন্য দায়ী নয়, তারাই সবচেয়ে বেশি উষ্ণায়নের মুখোমুখি হচ্ছে।
কিং স্পষ্ট করে বলেছেন, বিশ্বের দরিদ্র অঞ্চলগুলোর ভাগ্য; যেগুলো মূলত বিষুবরেখার কাছাকাছি বা ক্রান্তীয় অঞ্চলে পুঞ্জীভূত তা নির্ভর করবে নেট জিরোতে পৌঁছানোর আগে বিশ্ব ঠিক কতটা গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন করছে তার ওপর। তিনি উল্লেখ করেন, আমরা যখন নেট জিরোতে পৌঁছাব, তখনো বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ কার্বন জমা থাকবে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব বহু শতাব্দী ধরে অব্যাহত থাকবে। এই ক্ষতি সহজেই মুছে ফেলা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য এড়াতে হলে বিশ্বকে অতি দ্রুত নির্গমন শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে হবে। 
গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার উন্নত ও উচ্চ অক্ষাংশের দেশগুলোর তুলনায় ক্রান্তীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা তাদের ঐতিহাসিক সীমার চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। উপরন্তু সামুদ্রিক প্রবাল প্রাচীরের মতো ট্রপিক্যাল অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রগুলো আবহাওয়ার খুব সঙ্কীর্ণ তাপমাত্রা সীমার মধ্যে টিকে থাকার জন্য বিবর্তিত হয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে নির্গমন কমানোর প্রক্রিয়া চলাকালেও এসব বাস্তুতন্ত্র দীর্ঘ সময় ধরে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হতে থাকবে। 
এ দিকে এই গবেষণার প্রকাশনার সাথেই তাল মিলিয়ে জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং পিটার ম্যাকমুলিন সেন্টার অন স্টেটলেসনেস যৌথভাবে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে জলবায়ু সঙ্কট কিভাবে মানুষকে রাষ্ট্রহীন বা নাগরিকত্বহীন করার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে তা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে চরম জলবায়ু ক্ষতির মুখোমুখি হওয়া দেশগুলোর জন্য, বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ভূখণ্ড হারাতে থাকা প্যাসিফিক দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য ‘রাষ্ট্রসত্তার ধারাবাহিকতা’ নিশ্চিত করতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছে। 
জাতিসঙ্ঘের সংস্থাটির মতে, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ রাষ্ট্রহীন অবস্থায় রয়েছে। তবে সরকারি পরিসংখ্যানে এই মানুষেরা দৃশ্যমান না থাকায় প্রকৃত সংখ্যাটি এর চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দাবানল, বন্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো জলবায়ু তাড়িত দুর্যোগের ফলে মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে কিভাবে রাষ্ট্রহীনতার মুখে পড়ছে তা উঠে এসেছে এই রিপোর্টে। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং রিপোর্টের সহ-লেখক রাধা গোভিল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল এবং রাষ্ট্রহীনতার ঝুঁকির মধ্যে একটি স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে।