
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের যুদ্ধ স্তিমিত হতে না হতেই ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের সাথে সৌদি আরবের তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে। ইরান সমর্থিত হাউছিরা সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালীর পূর্ণ দখল নেয়ার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হতো। বিশ্বের মোট তেল-গ্যাস সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়ে যেত। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ব্যবহার করে অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নেয়া শুরু করে। সেখান থেকে জাহাজে করে তেল রফতানি করা হতো। একপর্যায়ে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রফতানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল বাব আল-মানদেব দিয়ে যেত। কিন্তু হাউছিদের হামলার হুমকির কারণে আগস্টে বাব আল-মানদেব দিয়ে সৌদি তেল পরিবহন প্রতিদিন চার লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। আর এখন সৌদি আরবের বিমানবন্দরসহ জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হাউছিরা নিয়মিত আক্রমণ করছে, যাতে বাংলাদেশীসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক হতাহত হচ্ছেন। সর্বশেষ গত শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাউছি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই বাংলাদেশীসহ ১৩ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ২৪ জন বাংলাদেশী রয়েছে, যাদের মধ্যে চারজন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে বাংলাদেশের সাথে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ৫১টি ফ্লাইটে প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে কিছু ফ্লাইট বাতিল ও কিছু স্থগিত হয়েছে। এসব ফ্লাইটের পাঁচ হাজার ৪১৮ যাত্রী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। হাউছিরা সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোকে অব্যাহতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছে।
বাংলাদেশ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ না হওয়ায় সৌদি আরবের ওপর হাউছিদের আক্রমণে সামরিকভাবে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে পবিত্র মক্কা ও মদিনাকে রক্ষায় বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি (মক্কা চুক্তি নামেও পরিচিত) সই হয়েছে, যা একটি ত্রিপক্ষীয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি। ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত হওয়া এই চুক্তিটি একটি সম্মিলিত নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে একজন স্বাক্ষরকারীর ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। সৌদি আরবের ওপর হাউছিদের সাম্প্রতিক আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে।
সৌদি আরবের সাথে হাউছিদের লড়াইয়ে বাংলাদেশে ভূমিকা কি হওয়া উচিত- জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী কর্মরত রয়েছে। তাই হাউছিদের সাথে সৌদি আরবের চলমান লড়াইয়ে আমাদের নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। একই সাথে আমাদের সতর্ক থাকবে হবে, এই লড়াইয়ে আমরা যাতে জড়িয়ে না পড়ি। কেননা এটা ধর্মীয় নয়, বরং রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ইস্যু। তিনি বলেন, সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা ও মক্কা-মদিনাকে রক্ষার ব্যাপারে আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য থাকবে। কিন্তু সৌদি আরব ও হাউছিদের সামরিক লড়াই নিয়ে আমাদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে, যাতে বাংলাদেশ এ বিষয়ে কোনো ধরনের সমস্যায় না পড়ে।
হুমায়ুন কবির বলেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে মক্কা ও মদিনার প্রতি আমাদের স্পর্শকাতরা রয়েছে। তাই এই দুই পবিত্র স্থান রক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান বারবার স্পষ্ট করা হয়। তবে হাউছিরা কখনোই মক্কা-মদিনার ওপর আক্রমণের কথা বলেনি। সৌদি আরবের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হাউছিরা বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেছে এবং পরিষ্কার করে বলেছে যে, তারা ইসলামেই এই দুই পবিত্র স্থানের ওপর আক্রমণ করতে চায় না। তিনি বলেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হাউছিদের লড়াইটা দীর্ঘদিনের। দু’পক্ষের রাজনৈতিক বিরোধ থেকে এই সঙ্ঘাতে সৃষ্টি, যা আজও চলছে। এই বিরোধ থেকে ধর্মকে আলাদ রাখাই শ্রেয়।
সৌদি আরব ও হাউছিদের চলমান লড়াই বন্ধে ইরান মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রধান হুমায়ুন কবির বলেন, সৌদি আবর রাজী হলে ইরানের এই উদ্যোগ কাজে লাগতেও পারে। এতে বেসামরিক নাগরিক হতাহত হওয়া ও সম্পদ ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে এবং সমস্যা সমাধানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাই বিবদমান দু’পক্ষ ইরানের প্রস্তাব মেনে নিয়ে আলোচনায় বসলে আমাদের স্বাগত জানানো উচিত।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কি ভূমিকা পালন করছে- জানতে চাইলে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই লড়াই থেকে দূরে থাকতে চাচ্ছে। সৌদি আবরকে মৌখিকভাবে সমর্থন দিলেও যুক্তরাষ্ট্র হাউছিদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছে না। হাউছিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কয়েক দফায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন চেয়েও সৌদি আবর কোনো সাড়া পায়নি। এই লড়াইয়ের বাইরে থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থ যতটা আদায় করা যায়, সে দিকেই বেশি মনোযোগী হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








