
মনির হোসেন
সৌদি আরবের রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মিসাইল হামলা চালানোর পর এবার দাম্মাম বিমানবন্দরেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে ঢাকা থেকে দাম্মামগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
গতকাল সোমবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, নিরাপত্তাজনিত কারণে ১৩ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় বেলা ৩টা ১০ মিনিটে ঢাকা থেকে দাম্মামগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের (বিজি-৩৪৯) ফ্লাইটটি স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও যাত্রার সময়সূচি ১৪ অক্টোবর দুপুর ১২টায় জানানো হবে বলেও উল্লেখ করা হয়। গত রাত ৭টার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক স্বাক্ষরিত অপর এক বিজ্ঞপ্তিতে অবশ্য জানানো হয়, সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকার পরিপ্রেক্ষিতে বিমানের ঢাকা থেকে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট বাংলাদেশ সময় এবং তারিখ অনুযায়ী আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ওই সব ফ্লাইটের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং যাত্রার সময়সূচির হালনাগাদ তথ্য যথাসময়ে কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জানানো হবে। ফ্লাইট স্থগিতের কারণে যাত্রীদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখপ্রকাশ করা হয়েছে। গতকাল বেলা ৩টা ১০ মিনিটে ঢাকা থেকে দাম্মাম যাওয়ার কথা ছিল বিজি-৩৪৯ ফ্লাইটটির। নিরাপত্তাজনিত কারণে সেটি স্থগিত করা হয়।
এ দিকে বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের ফ্লাইট বাতিলসংক্রান্ত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রিয়াদ এয়ারপোর্ট বন্ধ থাকার কারণে আগামী ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ফ্লাইটের নতুন সময়সূচি নির্ধারিত হলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের জানিয়ে দেয়া হবে। কর্তৃপক্ষ আপাতত বিমানবন্দরে যাওয়া থেকে যাত্রীদের বিরত থাকতে অনুরোধ জানিয়েছে। এ দিকে সংস্থার এক তথ্যে এ পর্যন্ত ঢাকা থেকে সৌদিগামী ৫১টি ফ্লাইট বাতিলের কথা জানা গেছে।
রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দরে হাউছিদের অতর্কিত মিসাইল হামলার পর সৌদি আরবে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ দু’টি বিমানবন্দরের আশপাশে রেড অ্যালার্ট জারি করেছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী প্রবাসী বাংলাদেশীর সাথে কথা বলে জানা গেছে।
গতকাল সৌদির সময় রাত ৭টার দিকে দাম্মাম থেকে মুক্তার নামে একজন প্রবাসী বাংলাদেশী নয়া দিগন্তকে জানান, শনিবার মধ্যরাতে দাম্মাম বিমানবন্দরে বোমা হামলা হয়। এর পরই ওই বিমানবন্দরের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে রেড অ্যালার্ট জারি করে। এই সীমানায় বসবাসকারী সব নাগরিককে সতর্কভাবে চলাচল করার জন্য কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে অনুরোধ জানানো হয়। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, রিয়াদে বোমা হামলা চালানোর পরদিন সৌদি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ১২ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দু’জন বাংলাদেশী নাগরিক রয়েছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। একইভাবে দাম্মাম বিমানবন্দরে হামলার ঘটনার পর কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তা এক দিন পর তারা প্রকাশ করবে। তিনি আরো বলেন, রিয়াদ ছাড়াও জিজান শহরে বেশি বোমা হামলার ঘটনা ঘটছে। রিয়াদ বিমানবন্দরের ২০ কিলোমিটারের দূরত্বে অবস্থানকারী একজন প্রবাসী বাংলাদেশী নিজের নাম না জানিয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, আগে আমাদের মোবাইলে কোনো হামলার আশঙ্কা থাকলে রিংটোন বাজত। কিন্তু গত এক মাস থেকে দেড় মাস ধরে এই রিংটোন আর বাজছে না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রিয়াদ এয়ারপোর্টের কাছাকাছি আমরা আছি। এত বড় হামলার ঘটনার পরও সৌদি সরকারের সতর্কতা ছাড়া তেমন কোনো উদ্যোগ দেখছি না।’
গতকাল প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিতে গেলে জানা যায়, সৌদি আরবের রিয়াদ, দাম্মামসহ অন্যান্য শহরে যেখানে বাংলাদেশী শ্রমিকরা রয়েছেন তাদের সর্বশেষ অবস্থা জানতে দূতাবাস ও কনসুলেট অফিসের সাথে কর্মকর্তারা যোগাযোগ রাখছেন। রিয়াদ দূতাবাস থেকে আহত ও নিহত বাংলাদেশীদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়। আহতদের চিকিৎসার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, তাদের সাথে দূতাবাস প্রতিনিধি সাক্ষাৎ করেছেন। বলা হয়, আটকে পড়া ৫০০ জন যাত্রীকে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য সেবা চলমান রয়েছে।
গতকাল বিকেলে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সাথে সর্বশেষ অবস্থা জানতে তার দফতরে গিয়েও বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে তার মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, যে দু’জন বাংলাদেশী মারা গেছেন তাদের লাশ আসতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। সরকার নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের বাইরে তাদের আরো বেশি ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে কি না, তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি। আহতদেরও নিয়মানুযায়ী সুস্থ হওয়ার পর দেশে ফিরিয়ে আনা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
বিকল্প পথে সৌদি যাওয়ার সুযোগ
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঢাকা-রিয়াদ রুটের ফ্লাইট চলাচলে বিঘœ ঘটছে। এতে আটকে পড়া যাত্রীদের বিকল্প পথে সৌদি পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর অংশ হিসেবে রিয়াদগামী যাত্রীদের মদিনা হয়ে গন্তব্য পৌঁছানোর সুযোগ দেয়া হচ্ছে। গতকাল বিকেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রধান কার্যালয় বলাকার টিকিট বিক্রয় কাউন্টারে খোজ নিয়ে জানা যায়, বিকল্প ফ্লাইটের টিকিট পেতে ভিড় করছেন রিয়াদগামী যাত্রীরা। কেউ টিকিট হাতে পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করছেন, আবার কেউ গন্তব্য যাওয়ার নিশ্চয়তার জন্য অপেক্ষমান রয়েছেন। যাত্রীদের মধ্যে ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরা প্রবাসীদের পাশাপাশি ভিসার মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন। নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তাদের যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এখন মদিনাগামী ফ্লাইটে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে অনেকের দুশ্চিন্তা কমছে। যাত্রীরা জানান, সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এতে দেশে থাকা তাদের পরিবারের সদস্যরাও আর্থিক ও মানসিক চাপে পড়বেন। তাই বিকল্প পথে সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ তাদের জন্য অনেকটা স্বস্তির।
৫১ ফ্লাইট বাতিল, সাড়ে ৫ হাজার যাত্রী অপেক্ষমাণ
বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র কাউছার আহমেদের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনায় বিধিনিষেধের কারণে বেশ কিছু ফ্লাইট চলাচল করতে পারেনি। এর মধ্যে সরাসরি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট চারটি। ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের দু’টি, সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের তিনটি ও রিয়াদ এয়ারওয়েজ তিনটি।
অন্য দিকে যে কয়েকটি ট্রানজিট ফ্লাইট পরিস্থিতিতে প্রভাবিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের ১৬টি, সালাম এয়ারের তিনটি, ইজিপ্ট এয়ারের একটি, এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ৯টি, কাতার এয়ারওয়েজের পাঁচটি ও ফ্লাই দুবাইয়ের পাঁচটি ফ্লাইট। সব মিলে সরাসরি ফ্লাইট ১২টি, ট্রানজিট ফ্লাইট ৩৯টি। এসব ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় পাঁচ হাজার ৪১৮ জন যাত্রী গন্তব্যের উদ্দেশ্য ঢাকা থেকে রওনা দিতে পারেননি। উল্লেখ্য, গত এক সপ্তাহে রিয়াদ বিমানবন্দরে অন্তত এ নিয়ে পাঁচবার হামলা হয়েছে। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার হামলায় এক পাইলটসহ তিন সৌদি নাগরিক নিহত হন।
সৌদি প্রবাসীদের জন্য দূতাবাসের জরুরি নির্দেশনা
চলমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। একই সাথে সৌদি কর্তৃপক্ষের জারি করা নিরাপত্তা ও আইনি নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে। রোববার দূতাবাসের জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কিত কোনো তথ্য, ছবি বা ভিডিও ধারণ, মুঠোফোনে সংরক্ষণ, অন্যের সাথে আদান-প্রদান কিংবা ফেসবুক, ইউটিউব ও এক্সসহ (সাবেক টুইটার) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা সৌদি আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই সৌদি আরবের আইন মেনে এ ধরনের ছবি, ভিডিও ও স্পর্শকাতর তথ্য প্রচার এবং আদান-প্রদান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনুরোধ জানিয়েছে দূতাবাস। এ ছাড়া নিরাপত্তার স্বার্থে ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবহুল এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।
প্রবাসী বাংলাদেশীদের জরুরি প্রয়োজনে দূতাবাসের বিভিন্ন হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। শ্রমসংক্রান্ত বিষয়ে ৮০০১০০০১২৫ নম্বর এবং পাসপোর্টসংক্রান্ত বিষয়ে ৮০০১০০০১২৬ নম্বরে বিনামূল্যে কল করা যাবে। ডিপ্লোম্যাটিক উইং-সংক্রান্ত প্রয়োজনে বিজ্ঞপ্তিতে ৮০০১০০০১২৪ নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া মৃত্যুসংক্রান্ত জরুরি প্রয়োজনে +৯৬৬৫৭০২১২১৮০ নম্বরে যোগাযোগের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








