জাতিসঙ্ঘের লোগো
জাতিসঙ্ঘের লোগো সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন ও সুদানে যুদ্ধ চলছে। একইসাথে দ্রুত অগ্রসরমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আয়োজন জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে যোগ দিতে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) থেকে নিউইয়র্কে জড়ো হবেন বিশ্বনেতারা।

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ এবং এর বৈশ্বিক প্রভাব এবারের জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চ-পর্যায়ের অধিবেশন বা ‘হাই-লেভেল উইক’-এ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মিত্রদের প্রতি তার দেশের প্রতিরক্ষা প্রয়োজনের দিকে নজর ধরে রাখার আহ্বান জানাবেন। রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় দূরপাল্লার ড্রোন হামলার পর মস্কো পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।

অধিবেশন শুরুর আগে জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘আমরা যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দেখি, তখন প্রতিদিনই পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কোথাও কোনো উন্নতি নেই। আর যখন পরিস্থিতি প্রতিদিন আরো খারাপের দিকে যায়, তখন আমরা বড় ধরনের বিস্ফোরণের গুরুতর ঝুঁকিতে থাকি।’

আলোচনা ও বিভিন্ন ভাষণেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে। এআইয়ের সম্ভাব্য হুমকি মানবতার জন্য কী হতে পারে, তা নিয়ে প্রযুক্তি খাতের নেতারা সতর্ক করার পর বিষয়টি বিশ্বজুড়ে শিরোনাম হয়েছে।

এ নিয়ে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি বৈঠকও হওয়ার কথা রয়েছে।

এআই সেফটি কানেক্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও এআই শাসনব্যবস্থা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিকোলাস মিয়াইয়ে বলেন, ‘এ বছরের জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদ এমন একটি পরিকল্পনার সূচনা করতে পারে, যার মাধ্যমে এআই নিরাপত্তা নিয়ে শিল্প খাতের প্রতিশ্রুতি থেকে বিশ্ব কী চায় এবং তা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব কার- তা নির্ধারণ করা যাবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন হবে ওই পরিকল্পনা কেমন হবে, তা নিয়ে একমত হওয়া এবং সেটিকে বাস্তবে রূপ দেয়া।’

এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেই গুতেরেস আরো বৈশ্বিক সমন্বয়ের আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘এআই নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তলানিতে নামার প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য বিশ্বের নেই।’

নেপথ্যে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো জাতিসঙ্ঘের ভবিষ্যৎ নিয়েও দর-কষাকষি করবে। বিভাজনে জর্জরিত এবং বড় ধরনের বাজেট ঘাটতিতে থাকা এই সংস্থার পরবর্তী নেতৃত্বে কাকে আনা হবে, তা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা হবে।

এ বিষয়ে বড় কোনো অগ্রগতি প্রত্যাশিত নয়। তবে প্রক্রিয়াটিতে ভেটো ক্ষমতা থাকা ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এই সমাবেশকে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর কাজে ব্যবহার করতে পারে।

বিশ্বব্যাপী সংঘাত বেড়ে যাওয়া, করোনা ভাইরাস মহামারি, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও ব্যাপক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে গুতেরেসের দ্বিতীয় পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে।

এক ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বাছাই প্রক্রিয়াটি খুব একটা সফল হয়নি। কোনো ধরনের ঐকমত্যও তৈরি হচ্ছে না।’

‘অস্তিত্বের জন্য হুমকি’
বিশ্বনেতাদের সামনে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতও আবার অন্যতম বিভাজন সৃষ্টিকারী বিষয় হয়ে উঠবে। গাজায় থমকে থাকা শান্তি প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের বসতি সম্প্রসারণ- সবই আলোচনায় থাকবে।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অল্প সময়ের সফরে অধিবেশনে যোগ দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করতে পারেননি বলে স্বীকার করার পর তিনি এ সফরে আসছেন।

ট্রাম্প প্রশাসন টানা দ্বিতীয় বছরের মতো মাহমুদ আব্বাসসহ অন্যান্য ফিলিস্তিনি নেতাকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা দেয়নি।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবারের কূটনৈতিক সমাবেশে যোগ দেবেন না। এর পরিবর্তে তিনি সরাসরি ওয়াশিংটনে গিয়ে ট্রাম্পের সাথে রাষ্ট্রীয় সফরে মিলিত হবেন।

রাশিয়া ও ইরানের প্রতি বেইজিংয়ের সমর্থনও আলোচনার কঠিন বিষয়গুলোর মধ্যে থাকবে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ড্যানিয়েল ফোর্তি বলেন, ‘জাতিসঙ্ঘে চীনা কূটনীতিকরা ওয়াশিংটনের তুলনায় নিজেদের আরো নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে সচেতনভাবে কাজ করছেন। আমাদের মূল্যায়ন হলো, এ অবস্থান তুলে ধরতে সাধারণ পরিষদের উচ্চ-পর্যায়ের অধিবেশনে শি’র আলোচনার কেন্দ্রে থাকার প্রয়োজন নেই।’

বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙছে। একইসাথে চরম আবহাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। গুতেরেস তার মেয়াদের পুরো সময়ের মতো এবারো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আরো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানাবেন।

তিনি ‘জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর’ নিয়ে একটি বৈঠক করবেন। এরপর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে একটি দিনব্যাপী আয়োজন হবে। নিচু দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্বের জন্য জন্য এটি হুমকি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট জলবায়ু ও পরিবেশগত ক্ষতির পাশাপাশি এর সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাবও জাতিসঙ্ঘ এবং নিউইয়র্কে অনুষ্ঠেয় বৃহত্তর ‘ক্লাইমেট উইক’-এর আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবছর অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে পরিবেশকর্মী, বিভিন্ন কোম্পানি ও শিক্ষাবিদরা অংশ নেন।

সূত্র : বাসস