ড. আবদুল লতিফ মাসুম
ড. আবদুল লতিফ মাসুম ছবি: নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল তার ‘পলিটিকস’ গ্রন্থে যখন রাষ্ট্রের শাসনপদ্ধতির শ্রেণী বিভাগ করেছিলেন, তখন গণতন্ত্রকে তিনি ‘পলিটি’ বা সুশাসনের বিচ্যুত রূপ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। দুই সহস্রাব্দ পরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল সেই একই প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন— ‘Democracy is the worst form of government, except for all the others’ (গণতন্ত্র সবচেয়ে খারাপ শাসনব্যবস্থা, অন্য সবগুলোকে বাদ দিলে)। এই দুই মনীষীর মধ্যকার দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে মানবসভ্যতা যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে— রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ, সামরিক শাসন, তার প্রতিটি থেকে যে শিক্ষা পাওয়া গেছে, তা একটিই— জনগণের শাসনে জনগণের অংশগ্রহণই সবচেয়ে কম অন্যায়মূলক ব্যবস্থা হচ্ছে গণতন্ত্র। 
১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস— ২০০৭ সালে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ ৬২/৭ প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য, আলোচনামূলক গণতন্ত্রের মাধ্যমে নাগরিকের সক্রিয় অংশীদারত্ব নিশ্চিতকরণ। এই প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কেননা আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে গণতন্ত্রের চর্চা ও তার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রশ্নটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জরুরি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, কোনো কার্যকর গণতন্ত্রে দুর্ভিক্ষ ঘটে না, কেননা মুক্ত গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার চাপে সরকার সময়মতো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। ফ্রিডম হাউজের গবেষণায় দেখা গেছে, গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে মাথাপিছু আয়, মানব উন্নয়ন সূচক ও জীবনমান অগণতান্ত্রিক দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মাইকেল ডয়েলের প্রমাণ করেছে যে, প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় না। ডারন অ্যাসিমোগলু ও জেমস রবিনসনের ‘Why Nations Fail’ গ্রন্থে দেখানো হয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান— যা গণতন্ত্রের মর্মবস্তু, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পূর্বশর্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার উত্থান এই তত্ত্বের বাস্তব প্রমাণ। তৃতীয় তরঙ্গের গণতন্ত্রায়ন— যা স্যামুয়েল হান্টিংটন চিহ্নিত করেছিলেন— পর্তুগাল, স্পেন, লাতিন আমেরিকা থেকে পূর্ব ইউরোপ পর্যন্ত স্বৈরশাসনের পতন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের যে ঢেউ তৈরি করেছিল, তা প্রমাণ করে গণতন্ত্র কেবল আদর্শ নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতায়ও এটি সবচেয়ে কার্যকর শাসনব্যবস্থা। ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনে যা ‘শূরা’ বা পরামর্শের ধারণা । ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে শাসকের জবাবদিহি ও প্রজাদের সম্মতির যে আলোচনা আছে, তা আধুনিক গণতন্ত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০২৩ সালে ২৪টি দেশে পিউ রিসার্চের জরিপে দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ মানুষ প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের পক্ষে— যদিও ৫৯ শতাংশ তাদের দেশে গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থায় সন্তুষ্ট নয়। এর অর্থ মানুষ গণতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করছে না; বরং আরো ভালো গণতন্ত্র চাইছে।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র বিশ্বব্যাপী চাপের মুখে। ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্র্যাসি (V-Dem) ইনস্টিটিউটের এ বছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যা ৮৭, আর স্বৈরাচারী সরকারের অধীনস্থ রাষ্ট্রের সংখ্যা ৯২ অর্থাৎ কর্তৃত্ববাদ গণতন্ত্রকে ছাড়িয়ে গেছে। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অভিযাত্রাকে খতিয়ে দেখা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাস যতটা আশাব্যঞ্জক ছিল সূচনালগ্নে, ততটাই হতাশাজনক তার পরবর্তী গতিপথ। ১৯৭২ সালের সংবিধান চারটি মূলনীতির মধ্যে গণতন্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। কিন্তু সেই গণতন্ত্রের প্রথম পরীক্ষাতেই বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয়— চারটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পত্রিকা ছাড়া সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়, বিচারব্যবস্থাকে নির্বাহী ক্ষমতার অধীনে আনা হয়, রাষ্ট্রপতিকে সীমাহীন ক্ষমতা  দেয়া হয়। এটি ছিল জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সাথে প্রথম ও মৌলিক বিশ্বাসঘাতকতা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হলো। 
এর পর বাংলাদেশ দীর্ঘ সামরিক ও আধা-সামরিক শাসনের কবলে পড়ে। এই ক্রান্তিকালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি ভিন্ন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সামরিক পটভূমি থেকে এসেও তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন— বাকশাল আমলে বন্ধ হওয়া পত্রিকাগুলো পুনরায় প্রকাশের অনুমতি পায়, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেয়া হয়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯ দফা কর্মসূচি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শন একটি সুসংহত রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করে। স্বনির্ভর বাংলাদেশ আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণের একটি নতুন মডেল তৈরি করেন। 
এরশাদের শাসনকাল (১৯৮২-৯০) গণতন্ত্রের আরেকটি অন্ধকার অধ্যায়। সামরিক ক্ষমতা দখল, সংবিধান স্থগিত, রাজনৈতিক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, ভোটে কারচুপি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যক্তিগত ব্যবহার— এরশাদ আমল ছিল প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের পদ্ধতিগত ধ্বংস। কিন্তু এই সময়েই বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে দুর্দমনীয় সাহস দেখান। দীর্ঘ আন্দোলনে জেল-জুলুম-হুমকি সহ্য করে তিনি বিএনপিকে গণতন্ত্রের মূল বাহনে পরিণত করেন। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতন হয়। 
১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি নির্বাচনী গণতন্ত্রের যুগে প্রবেশ করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তিনটি নির্বাচন— ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ সালে তুলনামূলকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছিল এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর ঘটেছিল। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার বিস্ময়কর বিজয়, ১৯৯৬ সালে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা পরিবর্তন এবং ২০০১ সালে বিএনপির পুনরায় নিরঙ্কুশ বিজয়— এই তিনটি নির্বাচন প্রমাণ করেছিল যে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রোথিত হচ্ছে। এই সময়কালে বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বাংলাদেশকে ‘surprising story of development’ বলে চিহ্নিত করে। কিন্তু ২০০৭-এর ওয়ান-ইলেভেন এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ— যেখানে বহিঃশক্তির মদদ ও আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্রের সংযোজন, সেই গতিপথকে সম্পূর্ণ উল্টে দেয়।
২০০৯ থেকে ২০২৪— এই দেড় দশক বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সময়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের শাসনব্যবস্থা ক্রমশ একটি ‘ইলেক্টোরাল অথরিটারিয়ানিজম’-এ পরিণত হয়, যেখানে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা বজায় থাকে কিন্তু তার মর্মবস্তু থাকে অনুপস্থিত। এই পটভূমিতেই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান ঘটে, যা ছিল জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে সংস্কার কমিশন গঠন, ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব, জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একযোগে সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠান, এগুলো ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ। গণভোটে প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোটার সনদের পক্ষে রায় দেন এবং নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে।
বর্তমান সরকারের সাত মাসের মূল্যায়নে দু’টি দৃষ্টিভঙ্গি পাশাপাশি বিরাজ করছে। সরকারপক্ষের ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্র দিবসে দেয়া বাণীতে বলেছেন, কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্যে গণতন্ত্র সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না— জনগণের প্রকৃত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন অপরিহার্য। তিনি ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’ প্রত্যয়ে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। সংসদে বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ— এক হাজার ৩৪৩টি প্রশ্ন উত্থাপন, প্রস্তাব উপস্থাপন, বাজেট বিতর্কে অংশগ্রহণ, আগের দেড় দশকে যা কল্পনাতীত ছিল, তা এই সরকারের আমলে বাস্তবে পরিণত হয়েছে। দল-সরকার পৃথকীকরণের নির্দেশনা, প্রেস ক্লাব ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠনের উদ্যোগ, এগুলো সরকারের গণতান্ত্রিক সদিচ্ছার প্রমাণ। সাম্প্রতিক জাতীয় জনমত জরিপে ৬৬.৩ শতাংশ উত্তরদাতা প্রধানমন্ত্রীর কর্মদক্ষতাকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।
অন্যদিকে বিরোধী মহলের সমালোচনাও উপেক্ষণীয় নয়। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, গণভোটের রায় সত্ত্বেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার অনীহা দেখাচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আমরা কোনো আপস করব না।’ জ্বালানি-বিদ্যুৎ সঙ্কট, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ধীরগতি, পাচারকৃত অর্থ ফেরতে দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব এবং সনদ বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক চলমান। ৫ সেপ্টেম্বর ১১-দলীয় জোটের ছয় দফা দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ ছিল এই অসন্তোষের একটি সুসংগঠিত প্রকাশ। সংসদের ভেতরে ও বাইরে দুই পক্ষের তীব্র বাগি¦তণ্ডা গণতান্ত্রিক চর্চারই অংশ; কিন্তু একই সাথে সরকারের জন্য সতর্কবার্তাও বটে। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সংসদে যথার্থই বলেছেন, ‘বিরোধী দল সরকারের ভুল তুলে ধরবে, আর সরকার তা সংশোধনের চেষ্টা করবে, এই পারস্পরিক সম্পর্কই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।’ এই উপলব্ধি গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার পরিচায়ক।
বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক চর্চার কিছু মৌলিক শর্ত পূরণ করেছে— কার্যকর সংসদ, সরব বিরোধী দল, মুক্ত গণমাধ্যম, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের প্রতি আনুষ্ঠানিক সম্মান। কিন্তু গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে আরো অনেক পথ বাকি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা, সংবিধান সংশোধন কমিটির কাজে গতি আনা, বিচারব্যবস্থার প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা— এগুলো আগামী মাসগুলোতে সরকারের সামনে প্রধান পরীক্ষা।
বিএনপি তার রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার প্রমাণ করেছে, দলটি গণতন্ত্রের সংগ্রামে সামনে থাকে— ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধী দলে। জিয়াউর রহমান একদলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের দুয়ার খুলেছিলেন। খালেদা জিয়া এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছিলেন এবং অবিরাম নিপীড়নেও মাথা নত করেননি। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন, গ্রেফতার, রাজনৈতিক মামলা, সামাজিক নিগ্রহ সহ্য করে তারেক রহমান আজ একটি জনরায়ের ভিত্তিতে সরকার পরিচালনা করছেন, এটি তার ও দলের গণতান্ত্রিক প্রত্যয়ের জীবন্ত প্রমাণ। গণতন্ত্র দিবসের বাণীতে তার বক্তব্য— ‘বিএনপি সব অবস্থান থেকেই গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে’ এটি কেবল দলীয় দাবি নয়, ইতিহাসের সাক্ষ্যও বটে। কিন্তু ইতিহাস শেখায়, গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা আর গণতন্ত্র চর্চা করা সমার্থক নয়। সংগ্রামের নৈতিক শক্তি ক্ষমতায় গিয়ে ধরে রাখাটাই আসল পরীক্ষা।
ফরাসি চিন্তক আলেক্সিস দ্য তকভিল তার ‘Democracy in America’ গ্রন্থে একটি অমূল্য পর্যবেক্ষণ রেখে গেছেন : গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিপদ আসে বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকে— যখন নাগরিকরা রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে বিরত হয়, যখন ক্ষমতাসীনরা জনগণকে কেবল ভোটদাতা হিসেবে দেখেন, অংশীদার হিসেবে নয়। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এই বিপদ বারবার ফিরে এসেছে। বাকশাল থেকে একাদশ সংসদ পর্যন্ত প্রতিটি গণতান্ত্রিক পশ্চাৎপসরণের মূলে ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এবং জনগণের প্রান্তিকীকরণ। বর্তমান সরকারের সামনে সুযোগ আছে সেই চক্র ভাঙার— জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তমূল্যে অর্জিত এই সুযোগ হাতছাড়া হলে ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করবে না। গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনপদ্ধতি নয়, এটি একটি জীবনদর্শন, একটি সভ্যতার মানদণ্ড, একটি জাতির আত্মমর্যাদার প্রকাশ। সেই মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব সরকারের, বিরোধী দলের, নাগরিক সমাজের এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের। 


লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 

Mal55ju@yahoo.com