
শুরুটা ২০১৮ সালে। ছাত্র-ছাত্রীরা কোটা প্রথার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আন্দোলন গড়ে তোলেন। এ জন্য তাদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয় সরকারের পেটোয়াবাহিনীর হাতে। রাজপথে নামে হেলমেটবাহিনী। সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তারা অবর্ণনীয় অত্যাচার চালায় ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর। একপর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রীরা বলতে গেলে গোটা ঢাকা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। সরকার অত্যন্ত কৌশলে এই আন্দোলন সামলাতে সক্ষম হয় এই বলে যে, এটি তো আমাদেরই দাবি, সর্বজনীন দাবি। এটি না করার কি আছে? একটু সময় লাগবে কিছু নিয়ম-কানুন সংস্কারের জন্য। যা করণীয় তা অবশ্যই করা হবে। ছাত্ররা সেদিন সরকারের কথায় বিশ্বাস করেছিল, ছাত্রসুলভ সরলতায়।
পরে সরকার কিছুই না করে নীরব থেকেছে। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো— কোনো রাজনৈতিক দলই সেদিন কোনো এক অজানা কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের দাবির প্রতি সংহতি জানায়নি। জানালে হয়তো দেশের রাজনৈতিক চালচিত্র অন্যরকম হতো।
পাঠ্যক্রম ও শিক্ষানীতি নিয়ে সরকারের টালবাহানা ছাত্র-ছাত্রীদের অসন্তোষ আরো ধূমায়িত করেছিল। বিশেষ করে পারিবারিক ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার সরকারি প্রচেষ্টায় যেমন সবাই একদিকে ভীতসন্ত্রস্ত ছিল, অন্যদিকে এর আড়ালে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অবমাননা দেশপ্রেমিক ছাত্র-জনতা মেনে নিতে পারেনি। ধূমায়িত অসন্তোষ বারুদের আগুনের মতো জ্বলে ওঠে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততিদের ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের হাইকোর্টের ৫ জুন প্রদত্ত রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে। ফুঁসে ওঠে পুরো ছাত্রসমাজ। তাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশ ও সরকারি পেটোয়াবাহিনীর হামলায় শতশত ছাত্র-ছাত্রী হতাহত হওয়ার প্রতিবাদে পুরো জাতি রাজপথে বেরিয়ে আসে। দেশব্যাপী প্রতিবাদ-প্রতিরোধে প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-জনতার জীবনের এবং ১৫ হাজার ছাত্র-জনতার পঙ্গুত্বের দায় কাঁধে নিয়ে পতন ঘটে স্বৈরাচারী সরকারের। গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। জাতির সামনে সুযোগ সৃষ্টি হয় নতুন করে রাষ্ট্র সংস্কারের। রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা সম্বলিত চব্বিশের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। অনেক প্রত্যাশার এই নির্বাচনে দেশবাসী বুকভরা আশা নিয়ে ভোট দেয়। কিন্তু দেশে-বিদেশে দুষ্ট লোকদের ফিসফিসানি, নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারণে ফলাফল এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, যেন সরকার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কী করা যায় তা সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই দেশবাসী দেখছে। দেশবাসী আশা করেছিল, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য। তা হয়নি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগে যৌথ কমিটি গঠনের পরামর্শ ছিল জুলাই ঘোষণায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবাদে তা আলোর মুখ দেখেনি। নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-সরকারি কর্মকমিশন, দুদক-বাংলাদেশ ব্যাংক-সচিবালয়সহ সর্বত্রই মেধাকে উপেক্ষা করে দলীয় ক্যাডারদের পদায়ন আবার আওয়ামী শাসনের দুঃস্বপ্নকেই জাতির ক্যানভাসে প্রতিফলিত করেছে। জুলাই ঘোষণায় গণভোটের যে রূপরেখা এবং ভূমিকার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশায় জাতি বুক বেঁধেছিল— তা হাইকোর্টে রিট দায়ের করার মাধ্যমে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অন্ধকারে ঠেলে দেয়া হয়েছে। দুদককে আওয়ামী স্টাইলে ব্যবহারের আলামতও দেখা যাচ্ছে।
মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ হবে— এ কথা সরকারপ্রধান কতবার উচ্চারণ করেছেন, হিসাব নেই। অথচ গত ছয় মাসে যত নিয়োগ হয়েছে, সবই দলীয় পরিচয়ে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে। যেন দেশের সব মেধাবীই সরকারি দলে একত্রিত হয়েছেন। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে— সুকৌশলে আবারো কোটা প্রথা ফিরিয়ে আনার আয়োজন। সরকারি চাকরিতে ভাইভা পরীক্ষায় ৪০০ নম্বর নিয়ে সমস্ত প্রশাসনে নিজদলীয় লোকদের নিয়োগের নীলনকশা তৈরি করে মেধাকে পেছনে ঠেলে দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যেদিন দেশে ফিরেন, সেদিন ঘোষণা করেছিলেন— আই হ্যাভ অ্যা প্লান। তিনি তার পরিকল্পনা এখনো দেশবাসীর কাছে খোলাসা করেননি। গণতন্ত্রের মোড়কে কোটা ব্যবস্থার পুনর্বাসন সেই পরিকল্পনায় আছে কিনা আজও জানা যায়নি। যে কোটা আন্দোলনের পটভূমিতে দেশে গণবিপ্লব ঘটেছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরা; সেই কোটা ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা কারো জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। যে দেশবাসী বুকভরা প্রত্যাশায় ভোট দিয়ে তাকে এবং তার দলকে ক্ষমতায় বসিয়েছে, তাদেরকে উপক্ষো করার ফল শুভ হতে পারে না। এ ব্যাপারে জনগণের দৃষ্টি ভিন্নদিকে ফেরানোর জন্য সরকার সম্ভবত এরশাদ শাহীর কৌশল অনুসরণ করছেন। তিনি ফ্রিডম পার্টিকে মাঠে নামিয়েছিলেন— প্রথমত জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য; দ্বিতীয়ত বিরোধী দলের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিপ্রায়ে। দেশের বিভিন্ন স্থানে পরাজিত আওয়ামী লীগকে মাঠে নামানোর যে নাটক মনস্থ করা হচ্ছে, তার উদ্দেশ্যও দেশের সার্বিক দুরবস্থা থেকে দেশবাসীর দৃষ্টি ফিরিয়ে দেয়া। এভাবেই জুলাইয়ের প্রত্যাশা এবং স্বপ্ন আজ ছিন্নভিন্ন। জুলাইকে মুছে ফেলে বর্তমান সরকার পূর্বতনের পথে পা ফেলছে। এ এক অশনিসঙ্কেত।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ







