
দিল্লি পুলিশের বাধা এড়িয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আবেদন দাখিল করলেন রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণ, ভোট চুরি রোখা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধ করার দাবিতে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে যাত্রার ডাক দিয়েছিল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ইন্ডিয়া ব্লক।
বিরোধী নেতাদের সেই আবেদনে সাড়া দেননি বিচারপতি সূর্য কান্ত। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া কিছুটা ‘উপেক্ষা’ করেই নিজেদের ঘোষিত কর্মসূচিতে অনড় থেকেছে ইন্ডিয়া জোট।
ওই মিছিল আটকানোর চেষ্টা করেছিল পুলিশ, তবে কিছুক্ষণ ধ্বস্তাধ্বস্তির পরে অন্য একটি রাস্তা দিয়ে বিরোধী নেতারা সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছান।
নির্ধারিত কর্মসূচির আগে সাংবাদিক সম্মেলন করে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন রাহুল গান্ধী, আঙুল তুলতে ছাড়েননি জ্ঞানেশ কুমার এবং মোদি সরকারের দিকে।
নির্বাচন কমিশন এবং এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরোধিতা জানিয়ে সোমবার দুপুরে শুরু হয় ইন্ডিয়া জোটের কর্মসূচি। কনট প্লেস থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত এই অভিযানে যোগ দেন রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, মমতা ব্যানার্জী, আরজেডির তেজস্বী ইয়াদভ, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ ইয়াদভ, তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি-সহ ইন্ডিয়া জোটে সামিল দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বদের মধ্যে অনেকেই। কংগ্রেস এবং অন্যান্য শরিক দলের সদস্যরাও সামিল ছিলেন। ছিলেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেহা বোরাও।
এ সময় পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বলেন, ‘আমরা ন্যায় বিচার চাইছি, অন্য কিছু নয়। এটা মানুষের জন্য, মানবজাতির জন্য এবং ন্যায় বিচারের জন্য।’
সমাজবাদী পার্টির মহিবুল্লাহ নদভী বলেন, ‘এই লড়াই সাধারণ মানুষের এবং এটা চলবে।’
কংগ্রেস নেতা শচীন পাইলট বলেছেন, ‘গোটা দেশ রাস্তায় নেমেছে এবং রাহুল গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খাড়গের নেতৃত্বে ইন্ডিয়া ব্লকের কর্মীরা একটাই দাবি নিয়ে সমবেত হয়েছেন- সুপ্রিম কোর্ট যেন তাদের কথা শোনে।’
ইন্ডিয়া জোটের শরিকদের বহু সমর্থক এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। কংগ্রেসের এক সমর্থক বলেন, সংবিধানকে রক্ষা করার জন্য আমরা সবকিছু করতে রাজি আছি।’
কর্মসূচিতে বহু তরুণ-তরুণীও সামিল ছিলেন। এক তরুণী বলেন, ‘বাড়িতে জানিয়ে এসেছি যে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দেব। তারাও একে সমর্থন করেন।’
কনট প্লেস ও মান্ডি হাউসের মধ্যবর্তী রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের ভিড় ছিল। মাঝ পথে রাহুল গান্ধী ও ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের বাধা দেয় পুলিশ।
প্রধান বিচারপতির ‘না’
ইন্ডিয়া ব্লকের তরফে সোমবার সাক্ষাতের জন্য সময় চাওয়া হলেও তা যে সম্ভব নয় তা জানিয়ে দিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।
তিনি সোমবার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমি গতকাল তাদের (বিরোধীদের) চিঠি পেয়েছি। গতকাল রাতেই আমি তাদের জবাব দিয়েছি। এমন কিছু কারণ জানিয়েছি যার ভিত্তিতে আমি আমার অক্ষমতা (সাক্ষাৎ না করার কথা ইঙ্গিত করে) প্রকাশ করে বলেছি যে আমি দেখা করতে পারব না।’
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে রোববার জানিয়েছিলেন, তিনি এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে চিঠি লিখে তার সাথে দেখা করার জন্য সময় চেয়েছেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) সংক্রান্ত অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতেই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির সাথে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন বিরোধী দলগুলোর নেতারা।
যে কোনো নাগরিক বা নির্বাচিত প্রতিনিধি আদালতের দ্বারস্থ হয়ে আইনি সহায়তা চাইতে পারেন বলে জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি।
তার কথায়, ‘সুপ্রিম কোর্টের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কোনো সাধারণ নাগরিক বা নির্বাচিত সদস্যের কাছ থেকে যে কোনো আবেদনকে স্বাগত জানানো হয়। প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার অধিকার রয়েছে, আমরা তাদের উদ্বেগ শুনব এবং আইনের অধীনে যা প্রাপ্য তা মঞ্জুর করব।’
কংগ্রেস প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের জবাব এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করেছে।
সেখানে প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন যে,, সুপ্রিম কোর্টের কাছে এই ধরনের পদক্ষেপ শিষ্টাচার এবং প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে সংবিধান অনুযায়ী, বিরোধী নেতাদের চিঠিতে যে বিষয়গুলোর উল্লেখ রয়েছে তার উপর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের নেই।
তবে প্রধান বিচারপতি বলেছেন যে, সংবিধানের ৩২ নং অনুচ্ছেদ এবং বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার মতো ক্ষমতার অধীনে সুপ্রিম কোর্ট নাগরিকদের অধিকার-সম্পর্কিত বিষয়গুলো শুনতে ও নিষ্পত্তি করতে বাধ্য।
আর মিছিলের আগে সোমবার দুপুরে রাহুল গান্ধী সংবাদ সম্মেলন করেন। গত কয়েকদিনে পুলিশি ধর-পাকড়, মারধরের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীদের বাধা দেয়া, প্রতিবাদে সামিল হওয়া অবস্থায় আটক করা, দিল্লিগামী ট্রেন বাতিল-সহ একাধিক বিষয় নিয়ে কেন্দ্র সরকারকে কটাক্ষ করেন তিনি।
রাহুল গান্ধী বলেছেন, ভোট চুরির প্রতিবাদে দিল্লিতে অনেক দিন ধরেই বিক্ষোভ চলছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো দিল্লিকে কেন জেলে পরিণত করা হয়েছে? শহরে লোকজনকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না, ট্রেন-বাস আটকে দেয়া হচ্ছে এবং দিল্লিকে দুর্গে পরিণত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার একটা বড় ভুল করছে, কারণ আমরা দেশকে দেখাতে চাই যে মোদি জ্ঞানেশ কুমারকে রক্ষা করছেন। তিনি যত বেশি নিরাপত্তা পাবেন, শেষ পর্যন্ত তার নিয়ন্ত্রকের কাছে পৌঁছানোটা আমাদের জন্য তত সহজ হয়ে যাবে।
‘আমরা খবর পাচ্ছি যে পুলিশকর্মীরা ক্ষুব্ধ, কারণ তাদের যুবকদের মারধর করার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, অথচ আরএসএস সদস্যদের অবাধ স্বাধীনতা দেয়া হচ্ছে।’
জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের প্রসঙ্গেও একাধিক মন্তব্য করেছেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধীকে বলতে শোনা গেছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কেন পদত্যাগ করছেন না? বিরোধী নেতাদের আটক করা হয়েছিল। এমনটা হচ্ছে কারণ আমরা সেই একই প্রশ্ন করছি যা দুজন নির্বাচন কমিশনার করেছিলেন।’
‘আমরা জানি জ্ঞানেশ কুমার রাতে ঘুমাতে পারেননি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আপনি রেহাই পাবেন না। এই লাখ লাখ মানুষ আপনাকে প্রশ্ন করছে এবং তারা থামবে না।’
শনিবার থেকে যে বিক্ষোভ দেখা গেছে তার উদ্দেশ্য একটাই একথা জানিয়ে তিনি বলেছেন, এখানে কোনো সমান্তরাল বিক্ষোভ হচ্ছে না।
তার কথায়, আপনি কোন দল বা জোটের (অংশ) তা আমরা দেখি না, এটা একটাই প্রতিবাদ। এখানে কোনো সমান্তরাল প্রতিবাদ নেই।
সম্মেলন চলাকালীন রাহুল গান্ধী ভিন্নমতাবলম্বী বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের কথিত বল প্রয়োগের কয়েকটা ভিডিও দেখান। সূত্র : বিবিসি
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








