
প্রবাসে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর কথা থাকলেও জাপানে দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সফরকে কেন্দ্র করে এই কোন্দল এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। বহিরাগতদের দলের নেতৃত্বে আসা, কমিটি নিয়ে নেতৃত্বের বিরোধ এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বলয় তৈরির কারণে জাপান বিএনপি এখন তিন থেকে চারটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এক পক্ষের সাথে অন্যপক্ষের বিরোধ এতটাই বেড়েছে যে দলীয় কর্মসূচি ও সাংগঠনিক সভাতেও তার প্রভাব পড়ছে।
সূত্র মতে, গত ২৬ অক্টোবর চার দিনের সফরে জাপান যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফর ঘিরে দলীয় প্রস্তুতি সভায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা, হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। জাপান বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল ইসলাম মনি সহ-সভাপতি মাসুম জাকিরকে লাথি মারেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ বিরোধ নতুন করে সামনে এসেছে। পাশাপাশি জাপান বিএনপির পদধারী নেতাদের অতীতে জাতীয়পার্টি ও আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে সখ্যতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দলীয় কর্মসূচিতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় প্রবাসী নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
এছাড়া জাপান সফরের তৃতীয় দিন গত ২৮ অক্টোবর বুধবার টোকিওর নিউ ওতানি হোটেলে বাংলাদেশ কমিউনিটি জাপানের আয়োজনে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে প্রবাসী নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ডোনেশনের নামে টাকা নিয়েও অনেককে প্রবেশপত্র না দেয়ার অভিযোগ উঠেছে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে। এছাড়া অনুষ্ঠানে নেতাদের পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ করা এবং অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে ড. মাসুম জাকিরের কন্যার প্রশ্ন করা নিয়েও নেতাকর্মীদের মাঝে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অনেকেই জাপান সফরকে কেন্দ্র করে সংগ্রহ করা টাকার হিসাব দাবি করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব বিষয়ে একাধিক নেতাকর্মীর খোলামেলা কথা বলেছেন এবং পোস্ট দিয়েছেন। অনেকেই জাপান বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সহ-সভাপতি মাসুম জাকির, নেতা কাজী এনামুল, প্রধান উপদেষ্টা এমডি এস ইসলাম নান্নুসহ একাধিক নেতাদের সাথে অতীতে আওয়ামী লীগের নেতাদের তোলা ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেছেন। অনেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার প্রমাণপত্রও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জাপান বিএনপি বর্তমানে চার-পাঁচটি উপদলে বিভক্ত। সাবেক সভাপতি নূর আলীর অনুসারী, কিরণ কবিরের সমর্থক, খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সময়কার কমিটির নেতাদের একটি অংশ, জসিম ও ফেনী অঞ্চলের নেতাদের অনুসারী এবং বর্তমান সভাপতি মীর রেজার নেতৃত্বাধীন অংশ আলাদাভাবে সক্রিয় রয়েছে। এখানে দলীয় আদর্শের চেয়ে আঞ্চলিক পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে। নোয়াখালী, বিক্রমপুর, সিলেট ও বরিশালকেন্দ্রিক বিভিন্ন বলয় তৈরি হয়েছে।
এর আগেও জাপান বিএনপির কমিটি নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছিল। কমিটি পুনর্গঠন ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবিতে একাংশের নেতাকর্মীরা আপত্তি জানিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হলেও বিরোধের অবসান হয়নি।
জাপান প্রবাসী সাগর সাহা জালাল শিকদার তার ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে বলেন, বিএনপি নাকি চাঁদাবাজি করে না! প্রধানমন্ত্রী জাপান সফর উপলক্ষে দেড় মিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত চাঁদাবাজি হয়েছে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সাক্ষাৎ করিয়ে দেয়ার কথা বলে।
আরেক পোস্টে তিনি লিখেন, নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অনেক বিএনপি নেতা-কর্মীদের ঢুকতে কার্ড দিচ্ছে না। কিন্তু শত শত আওয়ামী লীগ ব্যবসায়ী পরিচয়ে প্রবেশ কার্ড পাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাপান বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা নয়া দিগন্তকে বলেন, বাইরে থেকে প্রধানমন্ত্রীর সফরে দলীয় কর্মসূচি সফল মনে হলেও জাপান বিএনপির অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। নেতাকর্মীদের সাথে কোনো ধরনের গঠনমূলক আলোচনা ছাড়াই একটি পক্ষের নিয়ন্ত্রণে দল পরিচালিত হচ্ছে। এতে সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতামত উপেক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমান কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক শাকিরুল ইসলাম শাকিলের ভূমিকা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। রুহুল কবির রিজভী তাকে কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেয়ায় সেই সুযোগ নিয়ে তিনি পকেট কমিটি গঠন করেছেন। উপহার হিসেবে তাকে দামি গাড়িও গিফট দেয়া হয়। অনেকেই বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে অর্থ দিয়েছেন, এর প্রমাণও রয়েছে। অনুষ্ঠানে স্টেজে তোলার আশ্বাস দিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও অর্থ নেয়া হয়েছে। তবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোনো ব্যবসায়ী সাক্ষাতের সুযোগ পাননি।
জাপান বিএনপির সদস্য শেখ মাকসুদ আলী বলেন, বর্তমান কমিটির নেতৃত্বের আচরণে সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অনেকেই দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। বর্তমান সভাপতি মীর রেজাউল করিম রেজার নেতৃত্ব ও অতীত নিয়েও নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল ইসলাম মনি আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন এবং দলটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাতায়াত করতেন, এমন একাধিক ছবি রয়েছে। সেখানে একটি মারামারির ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই মামলায় তিনি সাত বছর জেলে ছিলেন। বিএনিপর সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. মো: শাকিরুল ইসলাম খান (শাকিল) ১৬ বছর জাপানে অবস্থান করলেও জাপান বিএনপি নেতাদের সাথে তেমন যোগাযোগ রাখেননি। অথচ প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরকে কেন্দ্র করে তিনি হঠাৎ দলীয় কর্মসূচিতে সামনে চলে আসেন।
শেখ মাকসুদ আলী মাসুদ আরো অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে কার কাছ থেকে কত টাকা নেয়া হয়েছে এবং মোট কত টাকা সংগ্রহ হয়েছে, তার কোনো হিসাব কমিটির সদস্যদের কাছে দেয়া হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের কোনো জবাবদিহিও নেই। ফলে অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
জাপান বিএনপির সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ‘সেভেন্থ সামুরাই’ খ্যাত প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মোহাম্মদ নাজিমুদ্দিন (নাজিম) বলেন, জাপান বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতি মোটেও সুন্দর নয়। দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়া এবং ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার মানসিকতায় নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। সামান্য কারণেও এখানে গ্রুপ পরিবর্তন হয়।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত অগোছালো, যা দূরদর্শিতার অভাব স্পষ্ট করে। সহ-সভাপতির মেয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ পেলেও কোনো ব্যবসায়ীকে সুযোগ দেয়া হয়নি। এই অব্যবস্থাপনার দায় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক শাকিল সাহেব ও স্থানীয় নেতৃত্ব এড়াতে পারেন না।
তিনি দাবি করেন, বর্তমান কমিটির অনেকের সাথে আওয়ামী লীগ নেতাদের ছবি আছে, তারা আগে থেকেই মিলেমিশে চলতেন। বর্তমান সভাপতি মীর রেজা তো বাংলাদেশ দূতাবাসে সবার সামনে বলেছিলেন- “আমরা বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একসাথে ওঠবস করি’। এমনকি উনার ফেসবুকে ঢাবি থেকে এসএসসি পাসের ভুল তথ্যও দেয়া ছিল। যা পরে সমালোচনার মুখে মুছে ফেলা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাপান বিএনপির সভাপতি মীর রেজাউল করিম (রেজা) বলেন, তারা ৩৮ বছর ধরে জাপানে বিএনপির রাজনীতি করছেন। ওয়ান-ইলেভেনের কঠিন সময়েও তারেক রহমান ও দলের পক্ষে কাজ করেছেন। চাকরি ও পরিবারকে সময় না দিয়ে সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন। মানুষ হিসেবে ভুলত্রুটি হতে পারে, কেউ ফেরেশতা নয়। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভক্তির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কারো মনে বিভক্তি থাকলে সেটি তার ব্যক্তিগত বিষয়।
আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে তার এবং জাপান বিএনপির কয়েকজন নেতার ছবি থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মানুষের সাথে দেখা হওয়া কিংবা ছবি তোলা স্বাভাবিক বিষয়। তবে আওয়ামী লীগের সাথে তাদের কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক বা আর্থিক লেনদেন নেই।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর উপলক্ষে নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা বা অনুদান নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে রেজা বলেন, নিজেদের অর্থায়নেই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।
প্রস্তুতি সভায় নেতাদের মধ্যে হাতাহাতি ও একজনকে লাথি মারার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত বিরোধ ও কথা কাটাকাটি থেকে ওই ঘটনা ঘটে। পরে বিষয়টি দলের সাথে জড়িয়ে সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময় সভায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রীদের দিয়ে তারেক রহমানকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি সভাপতি ও সেক্রেটারি নিজেরাই প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার ঘোষণায় ক্ষোভ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, পুরো মতবিনিময় সভাটিই যেন দুই তিনটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারাই ফুল দিয়েছে, প্রশ্ন করেছে, স্টেজে উঠে ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছে। হাজার হাজার ইয়েন দিয়েও অনেকেই কার্ড না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অনেক ব্যবসায়ীকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়ার কথা থাকলেও সেটি দেয়া হয়নি। উপস্থিত কয়েকজন প্রশ্ন করতে চাইলে তাদের থামিয়ে দেয়া হয়। সব মিলিয়ে জাপান বিএনপির কোন্দল এখন চরম আকার ধারণ করেছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








