
নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারকে ভুল পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, মাতারবাড়ীসহ জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের ভূমিকা ও দৃষ্টিভঙ্গি জাতির সামনে পরিষ্কার করতে হবে। দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি বা সিদ্ধান্ত জনগণ মেনে নেবে না। বাংলাদেশের জনগণ ও যুবসমাজ আধিপত্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করবে। আধিপত্যবাদের কালো ছায়ামুক্ত স্বাধীন জাতি গঠন, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি নির্মূলের জন্য তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মানবতার মুক্তি এবং প্রকৃত অর্থে স্বাধীন, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক লড়াই অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরো বলেন, ৭ নভেম্বরের চেতনা হচ্ছে অন্যায়-অবিচার, একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনা। এ চেতনা ধারণ করে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জনগণের মনের ভাষা বুঝে দেশ পরিচালনা করতে হবে। যারা জনগণের প্রত্যাশা ও অধিকারকে উপেক্ষা করবেন, ইতিহাস তাদের কাউকে ক্ষমা করবে না।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন- জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
জামায়াত আমির বলেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোটের রায় মেনে নেয়া উচিত; কিন্তু এখন সেই রায় মানা হচ্ছে না। মূলত তারা আবার কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ফিরে যাওয়ার সব আয়োজন পূর্ণ করে ফেলেছে। অন্য দিকে অন্তর্বর্তী সরকার যে ১৩৩টা অধ্যাদেশ জারি করে গিয়েছিল- সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই রেওয়াজ অনুযায়ী তা উত্থাপন হওয়ার কথা, তা হয়েছেও। কিন্তু আলোচনায় সব আসেনি; বরং তা থেকে এমন ২০টা অধ্যাদেশ বাতিল করে দেয়া হলো, যা থাকলে ফ্যাসিবাদ আবার নতুন করে ফিরে আসতে পারত না।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোকজনকে বসিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের পরিবর্তে বিতর্কিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেয়ার মাধ্যমে দুর্নীতি দমন সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা মেধার ভিত্তিতে চাকরি ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করেছিল; কিন্তু এখন সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে এবং আরো সদস্যকে চাপের মুখে বিদায় করার অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের দাবিকে সম্মান না করে তাদের সাথে উপহাস করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন, দীর্ঘদিন তাদের কর্মীরা নির্যাতিত ও বঞ্চিত ছিলেন, এখন তাদের মূল্যায়ন করা হবে। দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ ও সুযোগ-সুবিধা দেয়ার এমন মনোভাব জাতির যুবসমাজের প্রতি অবিচার।
তিনি আরো বলেন, জনগণ গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই সংস্কারের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে সংবিধান সংশোধনের নামে ভিন্ন পথে যাওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের সাথে দেয়া অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে। জনগণ শিশু নয়; তারা অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ভোট দিয়ে দায়িত্ব দিয়েছে। অতএব জনগণের সাথে প্রতারণা না করে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিরোধী দলের দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেগুলোর প্রতিবাদ না করলে বিরোধী দল হিসেবে জনগণের প্রতি অর্পিত দায়িত্বের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। এ কারণেই তারা সাত দফা দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এসব দাবি কোনো দলের একক দাবি নয়; এগুলো জনগণের দাবি। সংস্কার বাস্তবায়ন ছাড়া বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির পথ খোলা নেই। ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট দলের নাম নয়, এটি একটি মানসিকতা ও ভাইরাসের মতো; যে কেউ ক্ষমতায় গিয়ে এই মানসিকতায় আক্রান্ত হতে পারে। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের লক্ষণ দেখা গেলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন সরকার দেশের প্রায় সব ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। অথচ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এসব সংগঠন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। নির্বাচনের আগে কুরআন-সুন্নাহর ওপর কোনো আঘাত করা হবে না বলে আশ্বাস দেয়া হলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত অবস্থান নেয়া হয়। জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরপরই সরকার জনগণের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য বাহিনী থাকা সত্ত্বেও নিজেদের কর্মকাণ্ডের পরিণতি নিয়ে শঙ্কিত হয়ে একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করা হয়। রক্ষীবাহিনীকে সীমাহীন ক্ষমতা দেয়া হয়; তাদের বিরুদ্ধে বিচার ও জবাবদিহির কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এ বাহিনীর হাতে ৩৪ হাজার মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
তিনি আরো বলেন, দেশের সম্পদ লুটপাট, দুর্নীতি, মানুষের অধিকার হরণ এবং বিনা বিচারে হত্যার মধ্য দিয়ে তৎকালীন সরকার একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। সংবিধানে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যাতে শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত থাকা পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে বহাল থাকতে পারেন। বহুদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের কবর রচনা করা হয়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে শুধু একটি সামরিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর পেছনে ছিল একদলীয় শাসন, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনমনের ক্ষোভ। তিনি বলেন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানেও জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে সম্মান করতে হবে। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর জনগণ যে বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল, তা পূরণ হয়নি। ১৯৭৫ সালের একদলীয় শাসন, দমন-পীড়ন ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ছিল শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন। কিন্তু চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, বাজার সিন্ডিকেট, দলীয়করণ ও জনদুর্ভোগ অব্যাহত থাকলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দীন মোল্লার সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মূসা, ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা, সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, ডা. ফখরুদ্দিন মানিক ও ইয়াসিন আরাফাত।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








