
নিজস্ব প্রতিবেদক
মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সাবেক সেনাকর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার জেরা চলাকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হট্টগোল হয়েছে। সাক্ষ্য দেয়ার সময় তদন্ত কর্মকর্তা নিজের ডায়েরিতে গোপনে তারিখ বসিয়েছেন- আসামিপক্ষের আইনজীবীদের এমন দাবির পর আদালত কক্ষে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে আদালতের সরাসরি পরিদর্শনে বিষয়টি ধরা পড়ে।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে বিচারকাজ শুরু হয়। এ সময় মামলার ১৫তম সাক্ষী ও তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) মো: রফিকুল ইসলামকে পঞ্চম দিনের মতো জেরা করছিলেন জিয়াউল আহসানের আইনজীবী মো: সহিদুর রহমান। নিরাপত্তার স্বার্থে সাবেক এই সেনাকর্মকর্তাকে কারাগার থেকে জুম কলের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি এজলাসে যুক্ত রাখা হয়েছিল।
জেরা চলার একপর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তা দাবি করেন, তিনি ঘটনার দিনই ডায়েরিতে নোট নিয়ে তারিখ লিখে রেখেছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আইনজীবী সহিদুর রহমান আদালতকে জানান, সাক্ষী মিথ্যা বলছেন এবং হাত থেকে কলম লুকিয়ে তিনি এখনই ডায়েরিতে তারিখ বসিয়েছেন। এই দাবির পর সাথে সাথে এজলাসে হট্টগোল শুরু হয়ে যায়। জুম স্কিনে যুক্ত থাকা আসামি জিয়াউল আহসানও সরাসরি এতে তীব্র আপত্তি জানান এবং উত্তেজিত হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী তদন্ত কর্মকর্তাকে ডায়েরি ও নোটবুক বিচারকের আসনে এনে দেখাতে নির্দেশ দেন। ট্রাইব্যুনাল নিজ চোখে সূচিপত্র পরীক্ষা করে দেখতে পান, সূচিপত্রে ডায়েরির ওপর সাক্ষী নিজ হাতে ‘১৮-১০-২০২৫’ তারিখটি নতুন করে লিখেছেন। আদালতের এই সরাসরি পরিদর্শনে বিষয়টি ধরা পড়ার পর এজলাসে উপস্থিত রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ ধরে বাকবিতণ্ডা চলে।
এই ঘটনার পর জেরা পুনরায় শুরু হলে তদন্ত কর্মকর্তা স্বীকার করেন যে, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে কোনো ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ তিনি সংগ্রহ করতে পারেননি। তিনি জানান, র্যাব-৮ এর আর্কাইভ থেকে উল্লিখিত অভিযানের সমর্থনে কোনো সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল প্রমাণপত্র এবং জিয়াউল আহসান ও গোয়েন্দা শাখার সদস্যদের চলাচলের কোনো ডেটা বা ডিভাইস পাওয়ার চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।
অভিযানের পর তৈরি করা নির্বাহী তদন্ত প্রতিবেদনে জিয়াউল আহসানের নাম না থাকার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এসব ছিল ‘ফরমায়েশি প্রতিবেদন’। তার দাবি, যেসব অভিযান সঠিকভাবে হতো কেবল সেগুলোর প্রতিবেদনই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হতো। অসফল বা বিতর্কিত অভিযানের রিপোর্ট ওপরে পাঠানো হতো না।
তদন্ত কর্মকর্তা দাবি করেন, তিনি তথ্য সংগ্রহে র্যাব-৮ এ গিয়েছিলেন। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী সহিদুর রহমান সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘আপনি কোনোদিন র্যাব-৮ কিংবা র্যাব সদর দফতরে পা-ই রাখেননি।’ পাল্টা জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা দাবিটি সত্য নয় বলে জানান। তবে তিনি স্বীকার করেন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চাইলেও পুলিশ বা র্যাব সদর দফতরে কোনো লিখিত চাহিদাপত্র তিনি কখনো জমা দেননি।
কল লোকেশন, এলআরএল কিংবা আইপিডিআর না পাওয়ার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে এগুলো ত্রুটিপূর্ণ মনে হওয়ায় নেয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞরা কারা; এমন প্রশ্নে তিনি নির্দিষ্ট নাম বলতে পারেননি। তবে তথ্য পরামর্শের জন্য অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), পুলিশ সদর দফতর ও ট্রাইব্যুনালের বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহার কাছে গিয়েছিলেন বলে আদালতে উল্লেখ করেন।
অভিযানে উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও বিভিন্ন থানার জব্দতালিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, নিজ চোখে তিনি কোনো অস্ত্র দেখেননি। এমনকি শরণখোলা ও দাকোপ থানার মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন এলেও তিনি তা ভালো করে পড়ে দেখেননি।
বেলা প্রায় ১টার দিকে আসামিপক্ষের মূল আইনজীবী মিজানুল ইসলামের শারীরিক অসুস্থতার বিষয় তুলে ধরে দুই দিনের ছুটির পর আগামী রোববার পর্যন্ত জেরা স্থগিতের আবেদন জানানো হয়। বিচারক ‘আজই কেন শেষ করা যাবে না’ জানতে চাইলে আইনজীবীরা তাদের শারীরিক অবস্থা ও সাপ্তাহিক ছুটির মাঝে আইনজীবীর সাথে আসামির আইনি পরামর্শের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। প্রসিকিউশন পক্ষে রোববারই শেষ করার শর্তে সায় দিলে আদালত কার্যক্রম স্থগিত করেন।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পতন হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক গুম-খুনের অভিযোগে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মামলাটি চলছে। ২০১১ সালে গাজীপুরের পুবাইলে হত্যা এবং ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বরগুনার বলেশ্বর নদী ও সুন্দরবন এলাকায় বনদস্যু দমনের নামে শতাধিক মানুষকে হত্যার ঘটনায় গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
অসুস্থ সাবেক আইজিপি শহীদুল : এ দিকে গাজীপুরের পাতারটেকে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে সাতজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানি পেছানো হয়েছে। মামলার অন্যতম আসামি সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক অসুস্থ থাকায় আইনজীবীর সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ১৭ নভেম্বর শুনানির নতুন দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১০ জন আসামি রয়েছেন। তাদের মধ্যে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন শহীদুল হক ও ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া।
এ দিন অসুস্থতার কারণ জানিয়ে শুনানির জন্য সময় চান শহীদুল হকের আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ। তিনি জানান, শারীরিক অসুস্থতার কারণে ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে পারেননি সাবেক আইজিপি শহীদুল হক। এজন্য আদালতের কাছে সময় প্রার্থনা করা হলে ট্রাইব্যুনাল নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। শেখ হাসিনা ছাড়া পলাতক অন্য আসামিরা হলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তৎকালীন এসবি প্রধান ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, তৎকালীন কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম, বগুড়ার তৎকালীন পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, গাজীপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার ও ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, বগুড়ার তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল এবং তৎকালীন সিটিটিসির সহকারী পুলিশ কমিশনার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর গাজীপুরের নোয়াগাঁও পাতারটেক এলাকায় সোলায়মান সরকারের বাড়িতে সাতজনকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তাদের তুলে নিয়ে বগুড়ায় পুলিশের একটি গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়েছিল। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের নেতৃত্বে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে এই সাতজনকে হত্যা করেন সোয়াট সদস্যরা। ওই অভিযানের নাম দেয়া হয়েছিল ‘অপারেশন শরতের তুফান’।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাযজ্ঞ শেষেই ক্ষান্ত হয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাতজনের লাশ নিতে এলে পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও তদন্ত করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। আর এ ভয়ে কেউই সাহস করেননি। এর মধ্যে চারজনের পরিচয় এখনো অজানা। বাকি তিনজন হলেন মো: ইবরাহীম, ফরিদুল ইসলাম আকাশ ও সাইফুর রহমান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনার পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দেন ইবরাহীমের বাবা। চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি ১০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এরপর অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








