নেতানিয়াহুর জোট ৫৪ আসনে আটকে জোরালো হচ্ছে আরব দলগুলোর প্রভাব

আলজাজিরা

Advertisement

ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনে ভোট গণনার সাথে সাথে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৫৮ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোটকেন্দ্রের ব্যালট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিক ফলাফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট ৫৪টি আসনে আটকে রয়েছে। অন্য দিকে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন ‘ইয়াশার’ জোটের ঝুলিতে রয়েছে ৪৭টি আসন।
চলতি ভোট গণনায় সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে আরব দলগুলোর রাজনৈতিক জোট। যৌথভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ‘জয়েন্ট লিস্ট’ ও ‘রা’আম’ জোট তাদের আসনসংখ্যা বাড়িয়ে ১৯টিতে উন্নীত করেছে, যা এর আগে ছিল ১৬টি। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এগুলো এখনো প্রাথমিক ও আংশিক ফলাফল। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ অন্যান্য বিশেষ ভোটারদের ‘ডাবল-এনভেলাপ’ বা দ্বৈত খাম পদ্ধতির ভোটগুলো পরে গণনা করা হবে, যা চূড়ান্ত ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর দল লিকুদ এককভাবে ২৭টি আসন পেয়ে সবচেয়ে বড় দলের অবস্থান ধরে রেখেছে। এ ছাড়া গাদি আইজেনকটের ‘ইয়াশার’ দল ২০টি, আরব জোট ‘জয়েন্ট লিস্ট’ ১৩টি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের ‘বেয়াহাদ’ দল ১১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। এ দিকে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে আসন পাওয়ার জন্য নির্ধারিত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ন্যূনতম ভোটের বাধা অতিক্রম করতে পারেনি রিজার্ভিস্টস, পিপল অব ইসরাইল ও হারেদি পাবলিক- এই তিনটি ছোট দল। নির্বাচনে আরব দলগুলোর নজিরবিহীন এই শক্তিবৃদ্ধি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক তাৎপর্যপূর্ণ মোড় নিয়েছে। আরব জোট জয়েন্ট লিস্টের প্রধান ইউসেফ জাবারিন গণমাধ্যমকে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, পার্লামেন্টে তাদের এই বাড়তি রাজনৈতিক শক্তিকে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার কাজে লাগাতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তার অভিযোগ, নেতানিয়াহু এবং কট্টর ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভিরের প্রশাসন আরব নাগরিকদের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
ইসলামপন্থী দল ‘রা’আম’-এর আসনসংখ্যা চারের থেকে বেড়ে ছয়ে পৌঁছানোর পেছনে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বেদুইনপ্রধান শহর রাহাতের ভোট বড় ভূমিকা রেখেছে। রাহাতের পাশাপাশি কুসেইফ এবং কাফর কাসিম অঞ্চলেও দলটির পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন লক্ষ্য করা গেছে। ইসরাইলের চ্যানেল ১২-এর তথ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরাইলি নাগরিকদের মধ্যে এবারের নির্বাচনে ভোটদানের হার প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ১৯৯৯ সালের অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। রা’আমের প্রধান মনসুর আব্বাস আশা প্রকাশ করেছেন যে, চূড়ান্ত ফলাফলে বিরোধী জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জাদুকরি ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারবে। বিশ্লেষকদের মতে, আইজেনকটের মতো বিরোধী দলগুলোর জন্য সরকার গঠন বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জের হতে পারে, কারণ নির্বাচনী প্রচারের সময় তারা আরব দলগুলোর সাথে কোনো ধরনের জোট সরকার না গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সাবেক ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিঙ্কাস এই বিষয়ে মন্তব্য করেছেন যে, প্রয়োজনের মুহূর্তে কেবল আরব দলগুলোকে জোটে টানার মানসিকতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং আরবদের পাশ কাটিয়ে সরকার পরিচালনা সম্ভব নয়। এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, তার প্রকাশ্য রাজনৈতিক সমর্থনের কারণেই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবারের নির্বাচনে একটি ‘নিশ্চিত পরাজয়’ এড়াতে সক্ষম হয়েছেন। জেরুজালেমে লিকুদ পার্টির প্রধান কার্যালয়ে সমর্থকদের সামনে দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহু অবশ্য এখনই সরকার গঠনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি জানিয়েছেন যে চূড়ান্ত ও প্রকৃত ফলাফল হাতে আসা পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে তিনি এর আগে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন যে আরব দলগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন নিয়ে দেশ পরিচালনা করা হবে না।
স্বাধীন সাংবাদিক ও গবেষক এন্থনি লোয়েনস্টাইন আলজাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন যে, বিগত বছরগুলোতে নিজেদের জনপদ ধ্বংসের মুখে পড়া এবং অপরাধের হার বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা বিপুল সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছেন। নেতানিয়াহুর আরো চার বছরের শাসন এড়াতেই মূলত তারা এই বিকল্প রাজনৈতিক পথ বেছে নিয়েছেন। তবে আইজেনকটের সাথে আরব দলগুলোর শেষ পর্যন্ত কোনো কার্যকর বোঝাপড়া হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।